বিজ্ঞানজগতে এমন কিছু ভাইরাস আছে যা নিঃশব্দে শরীরে প্রবেশ করে এবং চোখের পলকে মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। এমনই এক রহস্যময় ও প্রাণঘাতী ভাইরাসের নাম হান্টাবাইরাস। অতি সম্প্রতি Andes hantavirus এর প্রাদুর্ভাবে বেশ কিছু মানুষের কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার ঘটনা বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা বা করোনাভাইরাসের চেয়ে এই ভাইরাসের আক্রমণ পদ্ধতি এতটাই আলাদা যে এর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলে ভবিষ্যতে এর কার্যকরী চিকিৎসা খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

হান্টাবাইরাসের গঠন এবং অণুবীক্ষণ যন্ত্রে এর দৃশ্য রূপ. Source: ResearchGate
ফুসফুস নয় ভাইরাসের আসল লক্ষ্য রক্তনালী
সাধারণ শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসগুলো যেমন Influenza RSV বা Covid-19 সরাসরি ফুসফুসের কোষগুলোকে আক্রমণ করে। কিন্তু হান্টাভাইরাস ফুসফুসের কোষের কোনো ক্ষতিই করে না। এই ভাইরাসের মূল লক্ষ্য হলো আমাদের সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকা সূক্ষ্ম রক্তনালী, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ক্যাপিলারি বা কৈশিক জালিকা বলা হয়। ভাইরাসটি এই রক্তনালীর ভেতরের দেয়ালে থাকা কোষগুলোকে সংক্রমিত করে। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, কোষগুলো সংক্রমিত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায় না এবং ভাইরাসটি অত্যন্ত ধীরগতিতে নিজের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। এর ফলে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকে এবং সংক্রমিত হওয়ার পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে প্রায় ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

মাত্র চারটি প্রোটিনের তান্ডব
সাধারণত অন্যান্য ভাইরাসের শরীরে ডজনখানেক বা তার বেশি প্রোটিন থাকে যা দিয়ে তারা মানবদেহে আক্রমণ চালায়। কিন্তু Andes hantavirus এর অস্ত্রাগারে রয়েছে মাত্র চারটি প্রোটিন। এই ক্ষুদ্র ও সাধারণ গঠন নিয়েই সে কোষের ভেতর প্রবেশ করা, নিজের আরএনএ তৈরি করা এবং ভাইরাসের বাইরের আবরণ তৈরি করার মতো জটিল কাজগুলো নিখুঁতভাবে করে ফেলে। এই স্বল্প সরঞ্জাম নিয়েই হান্টাভাইরাস শরীরের ভেতর এমন এক লুকিয়ে থাকার কৌশল অবলম্বন করে যে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বুঝতেই পারে না ভেতরে কোনো শত্রু বাসা বেঁধেছে। আর যখন শরীর টের পায়, ততক্ষণে শরীরের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যায়।

যেভাবে ফুসফুসে তরল জমে বিপর্যয় ঘটে
আক্রমণের প্রথম দিকে রোগী একদম স্বাভাবিক থাকলেও হঠাৎ করেই শরীরের ভেতরের পরিস্থিতি বদলে যায়। রক্তনালীর কোষগুলো যে শক্তিশালী বন্ধন দিয়ে একে অপরের সাথে লেগে থাকে, ভাইরাসের প্রভাবে সেই বাঁধন আলগা হয়ে যায়। এর ফলে শুরু হয় মারাত্মক এক বিপর্যয়, যেখানে রক্তনালীর ভেতরের তরল অংশ বা রক্তরস ফুটো দিয়ে বাইরে চুইয়ে পড়তে শুরু করে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই চুইয়ে পড়া তরল রোগীর ফুসফুসে জমা হতে থাকে এবং শ্বাসকষ্ট তীব্র আকার ধারণ করে। একই সাথে রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং হার্ট ফেইলরের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এত দ্রুত ঘটে যে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

আকস্মিক সুস্থতার রহস্য ও চিকিৎসার ভবিষ্যৎ
হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ফুসফুস যখন তরলে ভরে যায়, তখন সাধারণ ভেন্টিলেটর অনেক সময় কাজ করে না এবং চিকিৎসকদের একমো যন্ত্রের সাহায্য নিতে হয় যা কৃত্রিমভাবে রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ করে। তবে এই ভাইরাসের আরেকটি বড় বিস্ময় হলো এর আকস্মিক ফিরে আসা। তীব্র আক্রমণের দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে রক্তনালীর এই ফুটো হওয়ার প্রক্রিয়াটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায় এবং রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। যেখানে কোভিড বা তীব্র ফ্লু থেকে সেরে ওঠার পর ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষত থেকে যায়, সেখানে হান্টভাইরাস থেকে বেঁচে ফেরা মানুষের ফুসফুসে কোনো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির চিনহই খুঁজে পাওয়া যায় না। বর্তমানে এই ভাইরাসের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন না থাকলেও বিজ্ঞানীদের গবেষণায় নতুন কিছু পথ উন্মোচিত হচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পর তার শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তা নিয়ে গবেষণা চলছে এবং রক্তনালী আলগা করার পেছনে দায়ী নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন সংকেত বন্ধ করার ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
