শরীরের কোনো জায়গায় পুড়ে যাওয়া এমন একটি দুর্ঘটনা যা হঠাৎ ঘটে যায় কিন্তু এর যন্ত্রণা ও প্রভাব অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়।সঠিক চিকিৎসা না করলে অনেক সময়েই ব্যথা কিংবা জ্বালা দীর্ঘস্থায়ী হয়।এবং অনেকদিন ভুগতে হয়। রান্নাঘরে গরম তেল ছিটকে পড়া, ফুটন্ত পানি, আগুন, বৈদ্যুতিক শক কিংবা রাসায়নিক পদার্থ সব ক্ষেত্রেই পোড়ার ধরন ও গভীরতা ভিন্ন হতে পারে। পুড়ে যাওয়ার পর অনেকেই আতঙ্কে ভুল সিদ্ধান্ত নেন আবার কেউ কেউ অবহেলা করেন।এতে করে সে স্থানে ইনফেকশন হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা থাকে।এমনকি ইনফেকশন এর কারণে কোনো অঙ্গ অকার্যকর পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। অথচ পোড়ার ডিগ্রি অনুযায়ী সঠিক করণীয় জানলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।এই পোড়ার ডিগ্রি আবার কি আমরা হাসপাতালে প্রায়ই শুনে থাকি ফার্স্ট ডিগ্রি বার্ন কিংবা সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন চলুন আজকের এই আর্টিকেলে সব সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক:
পোড়ার ডিগ্রি মূলত নির্ধারিত হয় ত্বকের কতটা গভীর পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। এই অনুযায়ী পোড়া মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
ফার্স্ট ডিগ্রি, সেকেন্ড ডিগ্রি এবং থার্ড ডিগ্রি বার্ন।
ফার্স্ট ডিগ্রি বার্ন (First Degree Burn)
ফার্স্ট ডিগ্রি বার্ন হলো সবচেয়ে হালকা ধরনের পোড়া। এতে ত্বকের কেবল ওপরের স্তর, অর্থাৎ এপিডার্মিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
লক্ষণ:
এই ধরনের পোড়ায় ত্বক লাল হয়ে যায়, জ্বালাপোড়া ও হালকা ব্যথা থাকে। কখনো সামান্য ফোলা দেখা যেতে পারে, তবে সাধারণত ফোস্কা পড়ে না। রোদে পুড়ে যাওয়া (sunburn),গরম পাতিল কিংবা আয়রন দিয়ে হালকা ছ্যাকা লাগা কিংবা গরম চা কফি হাতে পড়া অনেক সময় ফার্স্ট ডিগ্রি বার্নের মধ্যেই পড়ে।
করণীয়:
পোড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোড়া অংশটি ১০–২০ মিনিট ঠাণ্ডা প্রবাহমান পানির নিচে রাখতে হবে। এতে ত্বকের ভেতরে জমে থাকা তাপ বেরিয়ে যায় এবং পোড়া আর গভীর হয় না। এরপর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে শুকিয়ে হালকা বার্ন অয়েন্টমেন্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা যায়। সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই ফার্স্ট ডিগ্রি বার্ন ভালো হয়ে যায় এবং স্থায়ী দাগ পড়ে না।
সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন (Second Degree Burn)
সেকেন্ড ডিগ্রি বার্নে ত্বকের ওপরের স্তরের পাশাপাশি ভেতরের স্তর (ডার্মিস) পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি ফার্স্ট ডিগ্রির তুলনায় অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।
লক্ষণ:
এই ধরনের পোড়ায় তীব্র ব্যথা হয়, ত্বক লাল ও ফোলা থাকে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফোস্কা পড়ে। ফোস্কার ভেতরে স্বচ্ছ তরল থাকতে পারে এবং পোড়া স্থান ভেজা বা চকচকে দেখায়।
করণীয়:
প্রথমে ঠাণ্ডা পানি দিতে হবে, তবে ফোস্কাযুক্ত স্থানে জোরে পানি ঢালা বা ঘষাঘষি করা যাবে না। ফোস্কা কখনোই ফাটানো উচিত নয়, কারণ এতে জীবাণু ঢুকে সংক্রমণ হতে পারে।সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে ফোস্কা যেনো না ফেটে যায়।তবে ফেটে গেলে পোড়া স্থান পরিষ্কার রেখে জীবাণুমুক্ত গজ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। ব্যথা বেশি হলে বা ফোস্কা বড় হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন ভালো হতে সাধারণত ২–৩ সপ্তাহ সময় লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে হালকা দাগ থেকে যেতে পারে।
থার্ড ডিগ্রি বার্ন (Third Degree Burn)
থার্ড ডিগ্রি বার্ন সবচেয়ে গুরুতর ও বিপজ্জনক। এতে ত্বকের সব স্তর সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায় এবং কখনো কখনো নিচের মাংসপেশি, চর্বি এমনকি স্নায়ু পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
লক্ষণ:
এই ধরনের পোড়ায় ত্বক সাদা, কালচে বা বাদামি হয়ে যেতে পারে এবং পুড়ে শক্ত হয়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো অনেক সময় তীব্র ব্যথা নাও থাকতে পারে কারণ স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। তবে এটি অত্যন্ত মারাত্মক অবস্থা।
করণীয়:
থার্ড ডিগ্রি বার্নের ক্ষেত্রে এক মুহূর্তও কোনোভাবেই দেরি করা যাবে না। পোড়া স্থানে কোনো কিছু লাগানো বা ফোস্কা নিয়ে কিছু করার চেষ্টা না করে, পোড়া অংশ পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এই ধরনের পোড়ায় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, স্কিন গ্রাফট এবং নিয়মিত ড্রেসিং প্রয়োজন হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন কোন অবস্থায় অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?
১.সেকেন্ড বা থার্ড ডিগ্রি বার্ন হলে
২.পোড়া বড় এলাকা জুড়ে হলে
৩.মুখ, চোখ, হাত, পা বা যৌনাঙ্গে পোড়া লাগলে
৪.শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ কেউ পুড়ে গেলে
৫.পোড়ার পর জ্বর, পুঁজ বা তীব্র ব্যথা দেখা দিলে
সেরে ওঠার সময় বাড়তি কিছু যত্ন নিলেই অনেক সময় পোড়া স্থান দ্রুত সেরে উঠতে পারে।এক্ষেত্রে কিছু কিছু সতর্কতা অবশ্যই আপনাকে অবলম্বন করতে হবে যেমন:
পোড়া ভালো হওয়ার সময় চুলকানি হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু খোঁচানো যাবে না। রোদ থেকে পোড়া স্থান বাঁচিয়ে রাখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মলম বা ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত। এতে দাগ পড়ার ঝুঁকি কমে।ডাক্তার অনেক সময় সিলভার সালফাডায়াজিন ১% থাকা ক্রিম গুলো দিয়ে থাকে যা নিয়মিত ক্ষত স্থানে ব্যবহার করতে হয়।ক্ষত স্থানে ভায়াডিন কিংবা আলকোহল বারবার ব্যবহার থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে নাহয় স্থায়ী দাগ পড়ে যেতে পারে এবং ক্ষত শুকাতেও দেরি লাগতে পারে।
পরিশেষে পোড়া ছোট হোক বা বড় একে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। ফার্স্ট ডিগ্রি, সেকেন্ড ডিগ্রি ও থার্ড ডিগ্রি বার্নের পার্থক্য বুঝে সঠিক পদক্ষেপ নিলে অনেক বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। আতঙ্ক নয়, সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসাই পোড়া থেকে দ্রুত ও নিরাপদে সেরে ওঠার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
