আমরা প্রায় সবাই শুনেছি যে, এই মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল বিগ ব্যাং দিয়ে। কিন্তু যদি কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয়— শুরুর দিকে কী ছিল? তখন অনেকে বলে, একটা সিঙ্গুলারিটি। অর্থাৎ এক বিন্দুতে মহাবিশ্বের সব পদার্থ আর শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল। তখন মহাবিশ্ব এত গরম, এত ঘন আর এত শক্তিশালী হতো যে তাপমাত্রা, ঘনত্ব আর শক্তি অসীমের মতো বেড়ে যেত। এমনকি সেই সময়টিকেই সময় আর স্থানের জন্ম বলা হতো। কিন্তু বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণার ফলে জানা সম্ভব হয়েছে, এই ধারণাটা সঠিক না আর এই ধারণাটাই প্রায় ৪০ বছর আগের। বিজ্ঞানীরা একদম নিশ্চিত যে বিগ ব্যাং-এর সাথে কোনো সিঙ্গুলারিটি ছিল না এমনকি হতে পারে সময় আর স্থানও হঠাৎ করে কোনো এক বিন্দু থেকে শুরু হয়নি।
তাহলে আমরা কীভাবে জানি?

যখন আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকাই তখন খালি আকাশে তাকালে দেখি চারপাশের সব দিকেই শত শত গ্যালাক্সি ছড়িয়ে আছে। আর যত দূরের কোনো গ্যালাক্সি দেখি তত বেশি মনে হয় যে সে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তবে গ্যালাক্সিগুলো নিজেরা এত দ্রুত ছুটছে না। বরং আসলে মহাবিশ্বের স্থান বা “space” নিজেই প্রসারিত হচ্ছে। এই ধারণা প্রথম পাওয়া যায় ১৯২২ সালে, যখন বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্রিডম্যান আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকে এই ব্যাপারটা অনুমান করেছিলেন। পরে ১৯২০ এর দশকে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই অনুমান প্রমাণ করেছিলেন। এর মানে হলো, সময়ের সাথে সাথে মহাবিশ্বের আকার বড় হচ্ছে আর পদার্থগুলো৷ অর্থাৎ গ্যালাক্সিগুলো আরও দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে মহাবিশ্বের ঘনত্ব কমছে। আর যদি আমরা পেছনে সময়ের দিকে তাকাই তখন দেখা যাবে মহাবিশ্ব ছোট ছিল, পদার্থগুলো কাছাকাছি ছিল এবং সবকিছু অনেক বেশি গরম আর একরকম ছিল। যত পেছনে যাওয়া যাবে মহাবিশ্বের পরিস্থিতি আরো বেশি বদলাবে। যেতে যেতে দেখা যাবে একটা সময় আসবে, যখন মহাকর্ষ শক্তি পদার্থগুলোকে একসাথে জড়ো করে তারকা বা গ্যালাক্সি বানানোর মতো সময় পায়নি। তারপর এমন সময় আসবে, যখন মহাবিশ্ব এত গরম যে কোনো নিউট্রাল (বিদ্যুৎ-নিরপেক্ষ) অ্যাটম তৈরি হবে না। তারও পেছনে গেলে, দেখা যাবে যে অ্যাটমিক নিউক্লিয়াস পর্যন্ত ভেঙে যাচ্ছে। তারপর?

তারপর এমন অবস্থা আসবে, যেখানে পদার্থ-অ্যান্টিম্যাটার জোড়া আপনা-আপনি তৈরি হচ্ছে আর নষ্টও হচ্ছে। আরও পেছনে গেলে দেখা যাবে, যেখানে প্রোটন আর নিউট্রনও ভেঙে গিয়ে কোয়ার্ক আর গ্লুয়নের মধ্যে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ধাপে মহাবিশ্ব ছোট হচ্ছে, ঘন হচ্ছে, আর গরম হচ্ছে। অবশেষে, যদি আরও পেছনে extrapolate করি, অর্থাৎ পেছনের কথা কল্পনা করতে থাকি, তাহলে দেখা যাবে ঘনত্ব আর তাপমাত্রা অসীমের দিকে যাচ্ছে। তখন সব পদার্থ আর শক্তি এক বিন্দুতে ছিল, যাকে সিঙ্গুলারিটি বলে।

প্রথম যখন বিগ ব্যাং-এর ধারণা দেওয়া হয়েছিল, তখন মনে করা হতো এটা শুধু এক গরম, ঘন, আর প্রসারিত অবস্থাই নয়, বরং এমন এক মুহূর্ত ছিলো যেখানে পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলোও ভেঙে গিয়েছিল। বলা হতো, তখনই সময় আর স্থান তৈরি হয়েছিল, হঠাৎ করেই পুরো মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল। এটা ছিল এক ধরণের অলৌকিক সৃষ্টি, যাকে বলা হতো বিগ ব্যাং-এর সিঙ্গুলারিটি। তাহলে, মহাবিশ্বের তাপমাত্রা কি একসময় অসীম হয়েছিল? যদি সত্যিই মহাবিশ্ব একসময় অসীম তাপমাত্রা আর শক্তি অর্জন করত, তাহলে আজ আমরা তার স্পষ্ট চিহ্নগুলো দেখতে পেতাম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিগ ব্যাং-এর অবশিষ্ট আলো (যা আমরা “Cosmic Microwave Background” বা CMB বলি)-তে তাপমাত্রার তারতম্য (fluctuation) অনেক বেশি হতো।

যা আমরা দেখি তা হলো, এই তাপমাত্রার পার্থক্য ৩০ হাজার ভাগের এক ভাগের মতো যা একটানা অসীম তাপমাত্রা বা সিঙ্গুলারিটি থেকে আশা করা পরিবর্তনের চেয়ে হাজার গুণ ছোট। আর এই পার্থক্যগুলো এমন স্কেলে সীমাবদ্ধ যেখানে আলো পৌঁছাতে পারে—অর্থাৎ, কসমিক হরাইজন বা তার চেয়ে ছোট আকারে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এমন ফ্লাকচুয়েশনও দেখি, যা এই সীমার বাইরেও আছে—যাকে বলে সুপার-হরাইজন ফ্লাকচুয়েশন। WMAP আর Planck স্যাটেলাইট এই ব্যাপারটা অনেক শক্তভাবে প্রমাণ করেছে। আরও আছে, যদি অতীতে মহাবিশ্ব অসীম তাপমাত্রায় বৃদ্ধি পেত, তাহলে আজ আমরা “ম্যাগনেটিক মনোপোল” (একধরনের উচ্চ-শক্তির মহাজাগতিক অবশিষ্টাংশ) এর মতো চিহ্ন পেতাম। কিন্তু বাস্তবে এদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা এই ধরণের চিহ্নের খোঁজ খুব সতর্কভাবে করেছে, কিন্তু কোনো প্রমাণ মেলেনি।
এই তথ্যগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি মহাবিশ্ব কখনো অসীম তাপমাত্রা অর্জন করেনি। অর্থাৎ, এক বিন্দুতে সবকিছু কেন্দ্রীভূত হয়ে অসীম শক্তি আর তাপমাত্রা হয়েছিল—এই ধারণা ভুল।
তাহলে আসলে কী হয়েছিল?
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমরা পেছনের দিকে যতই যাই না কেন, একটা সময় আসবে যখন আর পেছনে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের ইতিহাসকে অসীম পেছনের দিকে extrapolate করা যাবে না। একটা সীমা আছে, যেখানে আমরা মহাবিশ্বের বাস্তব ইতিহাসের কথা বলতে পারি। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে বিজ্ঞানীরা এমন একটা ধারণা দিয়েছেন, যেটা হলো “কসমিক ইনফ্লেশন”। ইনফ্লেশন বলতে বোঝায়, বিগ ব্যাং-এর আগে মহাবিশ্বের একদম প্রথম পর্যায়ে, মহাবিশ্বে পদার্থ বা বিকিরণ কিছুই ছিল না, বরং space বা স্থান নিজেই একধরনের শক্তিতে পূর্ণ ছিল। এই শক্তি মহাবিশ্বকে খুব দ্রুত, অতি-বিস্ফারণের মধ্যে নিয়ে যায়। এই ইনফ্লেশন মহাবিশ্বকে সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়, অর্থাৎ সব জায়গায় একই বৈশিষ্ট্য তৈরি করে। তখন ছোট আকারের কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন (ছোট ছোট এলোমেলো পরিবর্তন) এই প্রসারণের কারণে বড় হয়ে মহাবিশ্বের সব কোণে ছড়িয়ে পড়ে এমনকি সুপার-হরাইজন স্কেল পর্যন্ত।

ইনফ্লেশন যখন শেষ হয়, তখন সেই শক্তি পদার্থ আর বিকিরণে রূপান্তরিত হয়। আর তখনই গরম বিগ ব্যাং শুরু হয়। কিন্তু এই বিগ ব্যাং কখনো অসীম তাপমাত্রায় পৌঁছায়নি। এর তাপমাত্রা সিঙ্গুলারিটি-ধারণার তুলনায় শত শত গুণ কম। অর্থাৎ, আমাদের এই মহাবিশ্ব কোনো সিঙ্গুলারিটি থেকে আসেনি, বরং এক ইনফ্লেশন ধাপ থেকে এসেছে, যা একদম অন্যরকম এক অবস্থা ছিল। আমরা আজ যে তথ্যগুলো (যেমন CMB, ফ্লাকচুয়েশন, রেডিয়েশন) দেখতে পাই, তা ইনফ্লেশনের শেষ অংশের—প্রায় 10^-33 সেকেন্ড সময়ের পরের। ইনফ্লেশন কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল, তা আমাদের জানা নেই। হয়তো 10^-33 সেকেন্ডের চেয়ে একটু বেশি সময়, হয়তো অনেক বেশি, এমনকি অসীম সময়ও হতে পারে। এই প্রশ্নের উত্তর আমরা কোনোভাবে বের করতে পারি না। তাহলে ইনফ্লেশন শুরু হলো কীভাবে? এই বিষয়ে অনেক গবেষণা আর তর্ক-বিতর্ক চলেছে, কিন্তু এখনো এর উত্তর কারো জানা নেই। কোনো পর্যবেক্ষণ, কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমাদের এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। কিছু মানুষ (ভুলভাবে) বলেন: “প্রথমে সিঙ্গুলারিটি থেকে মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল, তারপর ইনফ্লেশন হলো, তারপর বিগ ব্যাং। এমনকি অনেক নামী বিজ্ঞানীর করা চিত্রও এই ধারাটি দেখায়। কিন্তু আসলে এই ব্যাখ্যা সঠিক নয়।
সত্যিই কি মহাবিশ্বের শুরুতে একটি সিঙ্গুলারিটি ছিল?
আসলে, খুব ভালো কিছু কারণ আছে, যা থেকে বোঝা যায় এই ধারণা সঠিক নয়! এমনকি আমরা গাণিতিকভাবে প্রমাণও করতে পারি যে, একটি ইনফ্লেশন (Cosmic Inflation) অবস্থা কোনো সিঙ্গুলারিটি থেকে শুরু হতে পারে না। কেন? কারণ ইনফ্লেশনের সময় মহাবিশ্বের আকার এক্সপোনেনশিয়াল হারে (অর্থাৎ খুব দ্রুত) বাড়ে। এক্সপোনেনশিয়াল বৃদ্ধি মানে হলো, একটা নির্দিষ্ট সময় পর মহাবিশ্বের আকার দ্বিগুণ হয়। সময়ের দ্বিগুণ সময় গেলে, মহাবিশ্ব চার গুণ বড় হয়। সময়ের তিনগুণ সময় গেলে, আট গুণ বড় হয়। সময়ের ১০ গুণ বা ১০০ গুণ গেলে, মহাবিশ্বের আকার ২^১০ অথবা ২^১০০ গুণ বড় হয়ে যাবে!

এখন যদি আমরা সময়কে পেছনের দিকে ফিরিয়ে দেই একবার, দুইবার, তিনবার, বা ১০০ গুণ তাহলে মহাবিশ্ব ছোট হতে থাকবে, কিন্তু কখনোই শূন্য আকার (০) এ পৌঁছাবে না। সে সময়ে মহাবিশ্বের আকার অর্ধেক, এক-চতুর্থাংশ, এক-অষ্টমাংশ, ২^-১০ বা ২^-১০০ ঘাত হবে, কিন্তু কখনোই শূন্য হবে না। অর্থাৎ, যত পেছনেই যাই না কেন, মহাবিশ্ব কখনো এক বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হয়ে শূন্য আকারে পৌঁছাবে না।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে খুব পরিচিত একটি থিওরেম আছে যা মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে খুব পরিচিত যা বলে যে, “একটি ইনফ্লেশন অবস্থা” বা past-timelike-incomplete। এর মানে হলো, যদি ইনফ্লেশনের মধ্যে কোনো কণা বা particle থাকে এবং আমরা সময়কে পেছনে extrapolate করি, তবে এই কণাগুলো একসময়ে একসাথে মিলিত হবে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, এই মিলন কোনো সিঙ্গুলারিটি নির্দেশ করে। বরং, এর অর্থ হলো ইনফ্লেশন আমাদের মহাবিশ্বের পুরো ইতিহাসের (যেমন এর জন্ম) বর্ণনা দেয় না। আরও জানা যায়, ইনফ্লেশন কখনোই এক বিন্দু থেকে (যেমন সিঙ্গুলারিটি) শুরু হতে পারে না, কারণ ইনফ্লেশনের জন্য শুরুতে একটি সসীম আকার প্রয়োজন।

যখনই আপনি কোনো ডায়াগ্রাম, প্রবন্ধ, বা গল্প দেখেন যেখানে বিগ ব্যাং সিঙ্গুলারিটি বা ইনফ্লেশনের আগে সিঙ্গুলারিটি নিয়ে কথা বলা হয়েছে, তখন বুঝবেন এটি পুরনো চিন্তার ধারা। কারণ, বিগ ব্যাং সিঙ্গুলারিটির ধারণা সেই সময়েই বাদ হয়ে গেছে যখন আমরা বুঝতে পারি যে বিগ ব্যাং-এর আগে একটি ভিন্ন অবস্থা (ইনফ্লেশন) ছিল, যা মহাবিশ্বকে সেই প্রাথমিক গরম আর ঘন অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্য, মহাবিশ্বের একেবারে শুরুতে—অর্থাৎ সময় আর স্থানের জন্মের সময় একটি সিঙ্গুলারিটি থাকতে পারে, আর ইনফ্লেশন তার পর শুরু হতে পারে। কিন্তু এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বিজ্ঞান মানে হলো এমন কিছু, যা আমরা পরীক্ষা করতে পারি, মাপতে পারি, ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি এবং যেটা আমরা প্রমাণ করতে পারি বা ভুল প্রমাণ করতে পারি। উদাহরণ হিসেবে, ইনফ্লেশন থেকে বিগ ব্যাং শুরু হওয়া আমরা প্রমাণ করতে পারি। কিন্তু তার বাইরে? সবই এখনো কেবল অনুমান আর কল্পনা।
