স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কথা। দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটো দেশই ভয়ে ভয়ে থাকত, কে কখন আগে পারমাণবিক হামলা করে বসে। এই ভয় থেকেই রাশিয়া তথা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বানায় ডুমসডে মেশিন(Dooms Day Machine) বা কেয়ামতের অস্ত্র যার নাম ডেড হ্যান্ড। “Dead Hand ” নামটি পশ্চিমাদের দেওয়া। রুশদের দেওয়া নাম হলো পেরিমিটার সিস্টেম । এটা অন্যসব সাধারণ অস্ত্র থেকে আলাদা এবং ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী। এটি ছিল এক স্বয়ংক্রিয় পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ।
কোনো যুদ্ধে যদি আমেরিকা রাশিয়ার নেতৃত্বস্থানীয় সবাইকে সম্পূর্ণভেবে নিশ্চিহ্ন করে দেয় এবং রাশিয়ার হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কোনো কমান্ডারই বেঁচে থাকবে যে পাল্টা আক্রমণ করবে। তখনই ডেড হ্যান্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো দেশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পারমাণবিক অস্ত্র গুলো তার শত্রু দেশ গুলোর ওপর ছুঁড়ে দিয়ে ভয়াবহ প্রতিশোধ নিশ্চিত করবে।এই অস্ত্রটি মিউচুয়াল অ্যাসিউরড ডেসট্রাকশন (MAD) নামের সামরিক কৌশলের অন্তর্ভুক্ত।
কৌশলটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুটি দেশের মধ্যে প্রযোজ্য। এর ভিত্তি হলো: যদি একটি দেশ অন্য দেশে পারমাণবিক হামলা চালায়, তবে অন্য পক্ষও পাল্টা হামলা চলবে। মানে, “যদি তুমি আমাকে মারো ,তাহলে তুমিও বাঁচতে পারবে না”।ফলাফল উভয় পক্ষ সম্পূর্ণভাবে নিচিহ্ন হবে।একারণে উভয় পক্ষই হামলা চালানোর সাহস পায় না, কারণ সিদ্ধান্ত টা আত্মঘাতি হবে। ধারণাটি স্নায়ু যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের পারমাণবিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে ছিলো।

ছবি রয়টার্স
কীভাবে কাজ করে এই ডেড হ্যান্ড?
এই ডেড হ্যান্ড সিস্টেমটা ঠিক কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। কারণ পুরো বিষয়টা খুবই গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা।ডেড হ্যান্ড নিয়ে রাশিয়া অফিসিয়ালি এখনো মুখ খুলে নাই ।যতটুকু জানা যায়, ডেড হ্যান্ড একটা ‘স্লিপিং জায়ান্ট’ বা ঘুমন্ত দৈত্যের মতো। অর্থাৎ সেমি অটোমেটিক – স্বাভাবিক অবস্থায় এটা বন্ধ থাকে ।
যখন কোনো আন্তর্জাতিক সংকট চরমে উঠত এবং পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা তীব্র হয়, তখন রাশিয়ার সর্বোচ্চ নেতা, যেমন জেনারেল সেক্রেটারি বা প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়ালি ডেড হ্যান্ড কে এক্টিভেট করবে ।একে এক্টিভেট করা মানেই যে সাথে সাথে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে দিবে এমনটা না।এটি কেবল সিস্টেমটিকে সতর্ক অবস্থায় নিয়ে যায় যাতে যুদ্ধ এর প্রস্তুত থাকতে পারে আর এটি তার সেন্সর নেটওয়ার্ক দিয়ে পারমাণবিক হামলার লক্ষণ খুঁজতে শুরু করে ।
ডেড হ্যান্ড সিস্টেমের মূল অংশগুলোর মধ্যে আছে সেন্সর, কমান্ড সেন্টার, এবং একটি কম্পিউটারাইজড কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক। সেন্সরগুলো পুরো রাশিয়া জুড়ে স্থল এবং আকাশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা আছে। এটি সক্রিয় হওয়ার পর সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা এই বিভিন্ন সেন্সরের মাধ্যমে এটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের লক্ষণ খুঁজবে যেমন, মাটিতে অস্বাভাবিক কম্পন, তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বেড়ে যাওয়া, বায়ুচাপের আকস্মিক পরিবর্তন ইত্যাদি। এইসব লক্ষণ একসাথে পাওয়া গেলে সিস্টেমটা ধরে নিবে যে দেশের উপর পারমাণবিক হামলা হয়েছে। এরপর সিস্টেমটা পরের ধাপগুলোতে চলে যেতো।
প্রথমে এটি দেশের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে। যদি ক্রেমলিন বা জেনারেল স্টাফদের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়া যায়, সেন্সর এবং কম্পিউটার সিস্টেম ধরে নেয় যে শত্রুর হামলা হয়েছে এবং মস্কোর কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হয়ে গেছে । এই পরিস্থিতিতেই আসল খেলা শুরু হয়। ডেড হ্যান্ড সিস্টেম তখন নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়া নেওয়া শুরু করবে।তখন আর সেমি অটোমেটিক সিস্টেম থাকবেনা। সম্পূর্ণ মানব নিয়ন্ত্রণহীন একটা অস্ত্রে পরিণত হয়ে যাবে।
এই সিস্টেমের একটা বিশেষ অংশ আছে যাকে ‘কমান্ড রকেট’ বলে। সাধারণ মিসাইলের মতো এর মাথায় পারমাণবিক বোমা থাকে না,এর পরিবর্তে থাকে একটা শক্তিশালী রেডিও ট্রান্সমিটার। মস্কোর কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হওয়ার পর সিস্টেমটা এই রকেট আকাশে উৎক্ষেপণ করা করবে। এই রকেট উড়ে যাওয়ার সময় সারা দেশের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে থাকা পারমাণবিক মিসাইল সাইলো, সাবমেরিন আর বোমারু বিমানগুলোতে পাল্টা হামলা চালানোর সংকেত পাঠিয়ে দেয়। এই বার্তাটি থাকে চূড়ান্ত কমান্ড। কমান্ড পাওয়ার সাথে সাথেই রাশিয়ার সমস্ত পারমাণবিক অস্ত্র শত্রুপক্ষের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য ধেয়ে যাবে। ফলে রাশিয়া পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরেও তার শত্রুকে একই পরিণতি ভোগ করতে হতো। ঠিক যেন এক মৃত মানুষের হাত, যা মৃত্যুর পরেও ভয়ঙ্করভাবে প্রতিশোধ নিতে পারে।
এটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়। কেননা কোনো মানুষের সরাসরি নির্দেশ ছাড়াই, অস্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলতে পারত। যন্ত্রের হাতে এমন ক্ষমতা তুলে দেওয়া মানে হলো, কোনো ভুলের কারণেও পুরো মানব সভ্যতা শেষ হয়ে যেতে পারে।
কেন তৈরি করা হয়েছিল এই বিধ্বংসী অস্ত্র?
স্নায়ু যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৮০-র দশকে আমেরিকা Trident D5-এর মতো অত্যন্ত নির্ভুল সাবমেরিন-নির্ভর পারমাণবিক মিসাইল তৈরি করেছিল।তখন সোভিয়েত নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এই মিসাইলগুলি এতটাই দ্রুতগামী ও নিখুঁত ছিল যে মস্কোতে হামলার পূর্বে সতর্ক হওয়ার জন্য হাতে সময় থাকতো মাত্র কয়েক মিনিট ! সাধারণ পারমাণবিক কমান্ড সিস্টেম এত দ্রুত সাড়া দিতে পারত না। তাদের ভয় ছিলো আমেরিকা হয়তো আকস্মিক ‘ডিক্যাপিটেটিং স্ট্রাইক’ বা রাশিয়ার মূল কমান্ড প্যানেল এ হামলা চালিয়ে তাদের রাজনৈতিক এবং সামরিক কমান্ড কাঠামোকে পঙ্গু করে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পাল্টা আঘাত হানার নির্দেশ দেওয়ার মতো কেউ হয়তো বেঁচে থাকবে না। এরই জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি করে দুনিয়া বিধ্বংসী সিস্টেম ‘ডেড হ্যান্ড’ । এর মাধ্যমে রাশিয়া নিশ্চিত করে তার শত্রুর কৃতকর্মের ফল ভোগ করবেই।
ডেড হ্যান্ড সিস্টেমের অস্তিত্ব রাশিয়া কখনো সরাসরি স্বীকার করেনি। যুক্তরাষ্ট্র এই অস্ত্রের সম্পর্কে প্রায় ৭-৮ বছর পর জানতে পারে। এছাড়াও, ২০১১ সালে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক মিসাইল ফোর্সের একজন জেনারেল এক সাক্ষাৎকারে এই অস্ত্রের অস্তিত্বের কথা আবারো জানান দেয় ।তিনি বলেন এই ধরনের একটি ব্যবস্থা তাদের আছে এবং এটি এখনো কার্যকর। আমেরিকা যদি হামলা করার কথা ভাবে, তাহলে তাদের জেনে রাখা উচিত যে পাল্টা জবাবটা আসবেই।এমনকি যদি জবাব দেওয়ার জন্য কোনো মানুষ বেঁচে নাও থাকে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মিডিয়াগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে বর্তমানে হাইপারসনিক মিসাইল ও আধুনিক রাডার সিস্টেম দিয়ে এটি আরও আপগ্রেড করা হয়েছে ।এছাড়া, AI এর যুগের সাথে তাল মেলানোর জন্য ডেড হ্যান্ড কে AI এর সাথে মাইগ্রেট করার সম্ভাবনা থাকবেই।যদি AI-এর সাথে সংযুক্ত করা হয় তবে এটি হয়তো আরও দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারবে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বাগাড়ম্বর বাড়ছে। এ অবস্থায় ডেড হ্যান্ডের মতো ‘ফেইল-ডেডলি’ ব্যবস্থা উদ্বেগজনক। কারণ সামান্য ভুল হলেই পুরো পৃথিবী ধ্বংসের মুখে পড়বে। আর AI এর যুগে এই ব্যবস্থার ঝুঁকি বেড়েছে। তাছাড়া সাইবার আক্রমণে এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা হ্যাকারদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। কোনো শত্রু রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যদি এই সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে ভুল সংকেত দেয়, তার পরিণতি ভয়াবহ হবে।
