আপনি কি কখনো এমন ভিডিও দেখেছেন যেখানে কেউ একটি ধাতব গম্বুজের ওপর বা গোলকের মত দেখতে তার উপর হাত রাখে, আর তার মাথার চুলগুলো এক এক করে দাঁড়িয়ে যায় আকাশের দিকে? দেখে মনে হয় যেন কোনও যাদুকরী ঘটনা ঘটছে। কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং এই চুল খাড়া হয়ে যাওয়ার রহস্যের পিছনে দায়ী Van de Graaff Generator।

কী এই ভ্যান ডে গ্রাফ জেনারেটর?

Van de Graaff Generator একটি ইলেকট্রোস্ট্যাটিক যন্ত্র, যা একটি ধাতব গম্বুজে বিপুল পরিমাণে চার্জ সঞ্চয় করতে সক্ষম। ১৯৩০-এর দশকে মার্কিন বিজ্ঞানী রবার্ট জেমস ভ্যান ডে গ্রাফ এটি উদ্ভাবন করেন উচ্চভোল্টেজের প্রয়োজনীয়তা মেটানোর জন্য। যন্ত্রটির মধ্যে একটি চলমান রাবারের বেল্ট থাকে, যা ঘর্ষণের মাধ্যমে চার্জ তৈরি করে এবং তা উপরের একটি বড় গম্বুজে জমা করে।

এই যন্ত্র দিয়ে কয়েক লক্ষ ভোল্ট পর্যন্ত বৈদ্যুতিক বিভব তৈরি করা যায়, যদিও তাতে বিদ্যুৎপ্রবাহের পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য থাকে ফলে এটি সাধারণত মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়। তাই কোনো বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে এটি শিক্ষার্থীদের সামনে ব্যবহার করা হয় নিরাপদ ও আকর্ষণীয়ভাবে।

Mr. Bean এর একটি এপিসোডে এই জেনারেটর দেখানো হয়েছিল।

কীভাবে এই যন্ত্র চুল খাড়া করে?

আপনি যখন Van de Graaff Generator-এর গম্বুজে হাত রাখেন, তখন সেই গম্বুজে জমে থাকা চার্জ আপনার শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু আপনি মাটির সংস্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকেন (সাধারণত ইন্সুলেটিং প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে), তাই সেই চার্জ আপনার শরীরের ওপর জমে যায় এবং নিষ্কাশনের সুযোগ পায় না।

চুল হলো ত্বক থেকে আলাদা কিছু সরু ও হালকা স্ট্র্যান্ড, যেগুলোও এই চার্জ শোষণ করে। এবং এখানেই ঘটে সেই মজার ঘটনা—একই ধরনের বৈদ্যুতিক চার্জ একে অপরকে বিকর্ষণ করে। ফলে আপনার প্রতিটি চুল যখন সমান চার্জে পূর্ণ হয়ে যায়, তখন তারা একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে যতদূর সম্ভব সরে যেতে চায়। এই পরস্পর বিকর্ষণের কারণে চুলগুলো মাথা থেকে খাড়া হয়ে আকাশের দিকে ওঠে, যেন আকাশের দিকে হাত বাড়িয়েছে।

এই পুরো ঘটনাটি শুধুমাত্র যে একটি মজার অভিজ্ঞতা তা কিন্তু নয়, এটি বিদ্যুতের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো শেখার এক বাস্তব ও জীবন্ত উপায়। এতে আমরা যা শিখতে পারি:

• ইলেকট্রোস্ট্যাটিক চার্জ কীভাবে কাজ করে
• Like charges repel, অর্থাৎ এক ধরনের চার্জ একে অপরকে বিকর্ষণ করে
• নিরোধক পদার্থেও কীভাবে চার্জ জমতে পারে

এছাড়া Gauss’s Law-এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় কেন গম্বুজের চার্জ শুধু বাইরের পৃষ্ঠে জমে এবং কীভাবে তা শরীরের বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক

আমরা অনেক সময়ই বেলুনকে চুলে ঘষে সেটা দেয়ালে আটকে দিতে পারি। অথবা ছোটবেলায় সবারই এমন একটা স্মৃতি আছে যেখানে আমরা মাথায় কলম ঘষে ছোট ছোট কাগজের টুকরাকে কলমের সাথে টেনে লাগিয়ে ফেলতে পারতাম। আবার উলের কম্বলের সাথে হাত ঘষাঘষি করে শরীরের লোমগুলোকে খাড়া করে ফেলতাম। এটিও ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রক্রিয়ার একটি সাধারণ উদাহরণ। কিন্তু Van de Graaff Generator এই প্রক্রিয়াকে অনেক বড় স্কেলে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে করে, ফলে আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পারি ইলেকট্রিক চার্জের সরাসরি প্রভাব।

শুধু তাই নয়, উচ্চভোল্টেজ প্রয়োগের এই কৌশলটি পার্টিকল অ্যাকসেলারেটর, নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এবং ইলেকট্রন বিম প্রযুক্তির মতো অনেক গবেষণামূলক ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

কিছু ভুল ধারণা ও সতর্কতা

এমন অনেকেই ভাবেন যে এই যন্ত্রটি বিপজ্জনক, কারণ এতে লক্ষ লক্ষ ভোল্ট আছে। কিন্তু বাস্তবে এর কারেন্ট এত কম যে তা শুধুমাত্র একটি হালকা চিমটি লাগার মতো অনুভূতি দিতে পারে। তবে যন্ত্রের ব্যবহার অবশ্যই নিরাপদ পরিবেশে, অভিজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে করতে হয়।

যন্ত্রটি ব্যবহার করার সময় ইলেকট্রনিক ডিভাইসের কাছাকাছি যাওয়া উচিত নয়, কারণ হঠাৎ নির্গত চার্জ তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাছাড়া কেউ যদি পেসমেকার ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে তাদের এই যন্ত্রের কাছ থেকে দূরে থাকাই ভালো।

Van de Graaff Generator বিজ্ঞানের এক অসাধারণ উদাহরণ, যেখানে একটি মজার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একটি গভীর শারীরিক সত্য চোখের সামনে ফুটে ওঠে। এটি শুধু শিশুদের নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও যখন তাদের চুলগুলো আকাশের দিকে উঠে যেতে দেখে, তখন মুহূর্তেই তারা বিদ্যুতের রহস্যময় ও মজার জগতে প্রবেশ করে।

চুল খাড়া হওয়ার এই ছোট্ট ঘটনাটি আমরা বুঝতে পারি, বিজ্ঞান শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় নয়—আমাদের শরীর, পরিবেশ ও দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এর প্রতিটি ধারা। আর সেই বিজ্ঞানকেই আমরা ছুঁয়ে দেখতে পারি, যখন হাতে রাখি একটি Van de Graaff Generator।

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply