মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো যৌনতা। এটি শরীরের মতোই মনেরও একটি স্বাভাবিক প্রয়োজন। কিন্তু কখনও কখনও মানুষ এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যার ফলে তা এক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কেউ কেউ অনুভব করেন যে তারা স্বমেহনের অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে পারছেন না, যদিও মনের গভীরে তাঁরা তা কমাতে বা বন্ধ করতে চান। এই অবস্থার পেছনে কারণ থাকতে পারে মানসিক চাপ, একাকিত্ব, অবসাদ কিংবা অতিরিক্ত পর্নোগ্রাফির দেখার ফল। আজকের লেখায় আলোচনা করা হবে, কীভাবে একজন মানুষ বৈজ্ঞানিকভাবে, ধীরে ধীরে, কিন্তু বাস্তবসম্মত উপায়ে এই অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন।

স্বমেহন নিজে কোনো অপরাধ বা শারীরিক ক্ষতির কারণ নয়, যদি তা সীমিত থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি স্বাভাবিক যৌন আচরণ। তবে যখন এটি এত ঘন ঘন হয় যে কারও দৈনন্দিন জীবন, কাজ, পড়াশোনা বা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে, তখনই বিষয়টি সমস্যাজনক হয়ে ওঠে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Compulsive Sexual Behaviour Disorder বা সংক্ষেপে CSBD, অর্থাৎ বাধ্যতামূলক যৌন আচরণজনিত ব্যাধি। আইসিডি-১১ (ICD-11)-এ এটি একটি স্বীকৃত মানসিক অবস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

প্রথমেই জানতে হবে স্বমেহনের সমস্যা আসলে স্বমেহন করা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ হারানো আচরণ। এই অভ্যাসটি সাধারণত নির্দিষ্ট ট্রিগার বা উদ্দীপনার মাধ্যমে সক্রিয় হয়। যেমন পর্ন দেখা, অবসর সময়, একাকিত্ব, মানসিক স্ট্রেস কিংবা মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্নোগ্রাফির অতিরিক্ত ব্যবহার স্বমেহনের প্রবণতা বাড়ায়। একে স্টিমুলাস কন্ট্রোল বা উদ্দীপনা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামলানো যায়। সহজভাবে বললে, যেসব পরিবেশ বা জিনিস অভ্যাসটিকে উদ্দীপিত করে, সেগুলো থেকে দূরে থাকা বা পরিবেশ পরিবর্তন করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মোবাইল বা কম্পিউটারে পর্ন সাইট ব্লকার ব্যবহার করা, ঘরে একা থাকার সময় কমানো, কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে ফোন না ব্যবহার করা। এসব পদক্ষেপ মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে নতুন অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তোলে।

এমন আচরণ পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মনস্তাত্ত্বিক হস্তক্ষেপ, যার মধ্যে সবচেয়ে প্রমাণভিত্তিক হলো Cognitive Behavioral Therapy (CBT)। এতে মানুষকে শেখানো হয় নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও কাজের মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে। উদাহরণস্বরূপ, অনেকেই যখন একাকিত্ব বা চাপ অনুভব করেন, তখন তা লাঘব করতে স্বমেহনের দিকে ঝোঁকেন। CBT এই চিন্তাগুলোকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে, যেন মানুষ বিকল্প ও স্বাস্থ্যকর উপায়ে মানসিক চাপ সামলাতে শেখেন।

একইসঙ্গে কার্যকর একটি পদ্ধতি হলো Acceptance and Commitment Therapy (ACT) এবং Mindfulness। এই দুই থেরাপি থেকে শেখা যায়, আকাঙ্ক্ষাকে দমন নয়, বরং পর্যবেক্ষণ করো। মানে, যখন স্বমেহনের তীব্র ইচ্ছা জাগে, তখন নিজেকে বলা “এই ইচ্ছা এখন আছে, কিন্তু এটি আমার নির্দেশ নয়।” ১০–২০ মিনিট অপেক্ষা করলে দেখা যায়, সেই তীব্র ইচ্ছা নিজে থেকেই হ্রাস পেতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় urge surfing অর্থাৎ তীব্র আকাঙ্ক্ষার ঢেউয়ের ওপরে চড়ে সেটিকে পার হয়ে যাওয়া।

যদি সমস্যাটি দীর্ঘদিনের হয় এবং একাধিকবার চেষ্টা করেও নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে সেটি হতে পারে ক্লিনিকাল পর্যায়ের Compulsive Sexual Behaviour Disorder। এই ক্ষেত্রে ডাক্তারের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। মনোবিশেষজ্ঞ বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা CBT, ACT, ওষুধ বা গ্রুপ থেরাপির মাধ্যমে সহায়তা দিতে পারেন। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নালট্রেক্সন নামের একটি ওষুধ মস্তিষ্কের পুরস্কার কেন্দ্রের ক্রিয়াশীলতা কমিয়ে এই ধরনের আচরণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এসএসআরআই (SSRI) শ্রেণির ওষুধও প্রয়োগ করা হয়। তবে এগুলো শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শেই গ্রহণ করা উচিত, কারণ প্রতিটি শরীরের মানসিক ও জৈবিক প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হয়।

যাঁরা নিজের চেষ্টায় অভ্যাসটি কমাতে চান, তাঁদের জন্য কিছু কার্যকর কৌশল আছে। প্রথমত, পরিবেশ বদলানো—যেসব জিনিস বা পরিস্থিতি অভ্যাসটিকে উত্তেজিত করে সেগুলো থেকে নিজেকে দূরে রাখা। দ্বিতীয়ত, বিকল্প কর্মকাণ্ড—যখন ইচ্ছা হয়, তখন সেই সময়টায় অন্য কিছু করা, যেমন ব্যায়াম, বই পড়া বা কোনো সৃজনশীল কাজ। তৃতীয়ত, সমাজ ও জবাবদিহিতা তৈরি করা—বিশ্বাসযোগ্য বন্ধুর সঙ্গে নিজের লক্ষ্য ভাগ করা, যাতে নিজেকে accountable রাখা যায়। চতুর্থত, সময়সূচি তৈরি করা—অবসর সময় যত কম থাকবে, অভ্যাস ফিরে আসার সুযোগও তত কমবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্ম-সমালোচনার পরিবর্তে আত্ম-সহানুভূতি। অনেকেই স্বমেহনের পর অপরাধবোধে ভোগেন, যা মানসিক চাপ বাড়িয়ে আবার সেই আচরণের দিকেই ঠেলে দেয়। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজেকে দোষী না ভেবে বোঝা, কেন এমন হচ্ছে। শরীরের চাহিদাকে দমন নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করা।

গবেষণা বলছে, পৃথিবীর প্রায় ৯৫ শতাংশ পুরুষ ও ৭০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় স্বমেহন করেছেন। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু যখন এটি দৈনন্দিন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে, তখনই তা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে। বিশ্বব্যাপী ১–৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই সমস্যার ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে ভুগছেন বলে ধারণা করা হয়। অর্থাৎ এটি বিরল নয়, বরং চিকিৎসাযোগ্য।

স্বমেহনের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে একে যুদ্ধ হিসেবে নয়, শেখার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। মস্তিষ্কের পুরনো অভ্যাসকে ভাঙতে সময় লাগে গড়ে ৬০ থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত। এই সময় নিজের অগ্রগতি লিখে রাখা, ব্যর্থতার পর হতাশ না হয়ে আবার চেষ্টা করা এগুলোই সফলতার চাবিকাঠি।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারসাম্য। যৌনতা মানুষের অস্তিত্বের অংশ; একে ঘৃণা নয়, বরং বোঝাপড়ার মাধ্যমে সামঞ্জস্য রাখা দরকার। কেউ যদি মনে করেন তাঁর আচরণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে, তবে সেটি মানসিক রোগ নয়, বরং সাহায্যের প্রয়োজনের সংকেত। আধুনিক মনোবিজ্ঞান, থেরাপি এবং প্রযুক্তির যুগে এই সমস্যার সমাধান পুরোপুরি সম্ভব।

স্বমেহন থেকে বিরত থাকার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিজেকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক ভারসাম্য অর্জন করা। এটি একদিনে সম্ভব নয়, কিন্তু ধৈর্য ও সচেতন প্রয়াসে মস্তিষ্কের পুরনো অভ্যাস বদলানো যায়। পরিবেশ পরিবর্তন, সচেতনতা, আত্ম-সহানুভূতি, থেরাপি এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা এই পাঁচ ধাপে যে কেউ ধীরে ধীরে নিজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। তাই এই বিষয়ে লজ্জা নয়, সচেতনতাই হোক প্রথম পদক্ষেপ।

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply