মানুষের ব্যক্তিত্বের ভেতরে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য কাজ করে। কেউ নিজের সাফল্য নিয়ে গর্ব করতে ভালোবাসে, কেউ আবার চায় সবার প্রশংসার কেন্দ্রবিন্দু হতে। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছে যাদের এই প্রবণতা সাধারণ আত্মবিশ্বাসের সীমা ছাড়িয়ে যায়৷ যারা নিজেকে সব সময় অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে ভালোবাসে, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে রাখে গভীর অনিশ্চয়তা ও ভয়ের অনুভূতি। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকেই বলা হয় নার্সিসিজম। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন এক নতুন সূত্র খুঁজে পেয়েছেন যা হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারে কেন কিছু মানুষ নার্সিসিস্ট হয়ে ওঠে।
আজকের পৃথিবীতে নার্সিসিস্ট শব্দটি প্রায়ই ব্যবহার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা দৈনন্দিন কথায় অনেকেই কাউকে সমালোচনা করতে গিয়ে বলে বসেন “সে তো নার্সিসিস্ট!” কিন্তু আসলে এই বৈশিষ্ট্যের পেছনে রয়েছে জটিল মনস্তাত্ত্বিক কারণ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে বাবা-মা বা যত্নদাতার সঙ্গে সম্পর্কের ধরণ অর্থাৎ সংযুক্তি বা এটাচমেন্ট স্টাইল এই নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নার্সিসিজম মূলত দুই রকমের হয়। প্রথমটি হলো গ্র্যান্ডিওস নার্সিসিজম, যেখানে ব্যক্তি নিজের প্রতি অগাধ আত্মবিশ্বাস দেখায়, সব সময় প্রশংসা চায় এবং অন্যদের থেকে নিজেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এই ধরনের মানুষ সাধারণত আত্মপ্রচারমূলক, নেতৃত্বপ্রবণ, এবং কখনও কখনও আক্রমণাত্মক স্বভাবের হয়। দ্বিতীয়টি হলো ভালনারেবল নার্সিসিজম যেখানে বাহ্যিকভাবে ব্যক্তি অহংকারী বা গর্বিত মনে হলেও, ভেতরে থাকে আত্মসম্মানের অভাব, সেন্সিটিভিটি এবং প্রত্যাখ্যানের ভয়। এরা বাহিরে শক্ত মুখোশ পরে থাকলেও ভিতরে থাকে আত্মবিশ্বাসের ভীষণ ঘাটতি।
গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে যাদের বাবা-মা বা অভিভাবকের কাছ থেকে পর্যাপ্ত ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সঙ্গতিপূর্ণ যত্ন মেলে না তাদের মধ্যে ভবিষ্যতে নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অনিরাপদ সংযুক্তি। এই ধরনের সংযুক্তির মধ্যে তিনটি প্রধান রূপ দেখা যায়। প্রথমটি হলো Preoccupied attachment, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক ভাবলেও অন্যদের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়টি Dismissive attachment, যেখানে নিজেকে ভালো মনে করলেও অন্যদের প্রতি অবিশ্বাস জন্মায়, ফলে আবেগগত দূরত্ব তৈরি হয়। তৃতীয়টি Fearful attachment, যেখানে ব্যক্তি নিজের ও অন্যদের প্রতি দুটোই নেতিবাচক ধারণা রাখে ফলে সম্পর্ক চায়ও আবার ভয়ও পায়।
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা ৩৩টি ভিন্ন গবেষণা বিশ্লেষণ করে একটি মেটা-স্টাডি করেছেন, যেখানে ১০,০০০-এরও বেশি মানুষের তথ্য নেওয়া হয়। ফলাফল আশ্চর্যজনক। দেখা গেছে, যাদের মধ্যে অনিরাপদ সংযুক্তির অভিজ্ঞতা আছে, বিশেষ করে যাদের শৈশবে ভালোবাসা বা মনোযোগের অভাব ছিল, তাদের মধ্যে ভালনারেবল নার্সিসিজম বেশি দেখা যায়। অর্থাৎ, শৈশবে যদি কেউ অনুভব করে যে সে যথেষ্ট মূল্যবান নয়, অথবা তার যত্ন নেওয়া হচ্ছে না, তবে বড় হয়ে সে নিজের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে লুকাতে “আমি সেরা” এই ভাবনা গড়ে তোলে। এটি এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন এই সম্পর্ক শুধুই একটি সংযোগ, কারণ নয়। অর্থাৎ, অনিরাপদ সংযুক্তি আছে বলেই সবাই নার্সিসিস্ট হয়ে উঠবে এমন নয়। তবে এতে বোঝা যায়, শৈশবের সম্পর্কীয় অভিজ্ঞতা ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। যাদের শৈশবে স্থায়ী ভালোবাসা, সাপোর্ট ও নিরাপত্তা পাওয়া যায় তারা নিজেদের ও অন্যদের নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। আর যাদের সেই নিরাপত্তা থাকে না, তারা হয়তো নিজের দুর্বল আত্মসম্মান আড়াল করতে অহংকারের মুখোশ পরে নেয়।
গ্র্যান্ডিওস নার্সিসিজমের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। এই ধরনের নার্সিসিজমের সঙ্গে শৈশবের অনিরাপদ সংযুক্তির সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, গ্র্যান্ডিওস নার্সিসিজমের পেছনে থাকতে পারে সামাজিক প্রভাব, ক্ষমতার অনুভূতি বা অতিরিক্ত প্রশংসায় গড়ে ওঠা আত্মবিশ্বাস। ফলে এটি এক ধরনের বাহ্যিকভাবে শেখা আচরণও হতে পারে।
গবেষকরা বলেন,
ব্যক্তিত্বের এই প্রবণতাগুলো যদিও গভীরে প্রোথিত, তবুও পরিবর্তন সম্ভব।
মনোচিকিৎসার মাধ্যমে বিশেষত সংযুক্তি-ভিত্তিক থেরাপি যেমন Schema Therapy বা Emotionally Focused Therapy একজন মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের অনিরাপত্তা চিনতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এর পাশাপাশি, শিশুদের যত্ন ও ভালোবাসার পরিবেশে বড় করা গেলে ভবিষ্যতের নার্সিসিস্টিক প্রবণতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা যায়।
এই পুরো গবেষণার মূল বার্তা খুব স্পষ্ট: নার্সিসিজম শুধু অতিরিক্ত আত্মপ্রেম নয়, বরং তা গভীরে থাকা ভয়ের ও অভাবের প্রতিফলন। যে শিশুটি একসময় অনুভব করেছিল তার ভালোবাসা শর্তসাপেক্ষ, সে বড় হয়ে নিজের মূল্য প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার নিজেকে সেরা মনে করা আসলে একটা রক্ষাকবচ যেটা নিজেকে ছোট মনে করার ভয় থেকে বাঁচার একটি কৌশল।
নার্সিসিজম নিয়ে আমাদের ধারণা অনেক সময় একপেশে হয়। আমরা ভাবি, তারা অহংকারী বা আত্মমগ্ন। কিন্তু বাস্তবে, এই বৈশিষ্ট্যের পেছনে থাকে মানুষের মনের জটিল ইতিহাস, শৈশবের নিরাপত্তাহীনতা এবং ভালোবাসার অভাব। বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, মানুষ জন্মগতভাবে নার্সিসিস্ট হয় না; বরং তার বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাই তাকে এমন করে তোলে। তাই সমাজ ও পরিবার উভয় পর্যায়ে শিশুর মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ ভালোবাসা ও নিরাপত্তা যে শুধু সুখী শৈশবের ভিত্তি নয়, তা এক পরিণত, সহানুভূতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিত্ব গঠনেরও মূল চাবিকাঠি।

