আমরা প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যেখানে একটি সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে আরেকটি শর্ত পূরণ করতে হয়। অথচ সেই শর্ত পূরণ করতেও আবার প্রথম সমস্যাটির কাছে ফিরে আসার প্রয়োজন পড়ে। অর্থাৎ দুই দিক থেকেই পথ বন্ধ। ধরুন, আপনি একটি চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছেন। এখন প্রশ্নকর্তা বলল, “চাকরি পেতে হলে অভিজ্ঞতা লাগবে।” কিন্তু কথা হলো, “চাকরি করা ছাড়া আপনি অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন কীভাবে?“ এই ধরনের অদ্ভুত এবং স্ববিরোধী অবস্থাকেই আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় Catch-22 বলা হয়।
Catch-22 শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত মার্কিন লেখক Joseph Heller-এর বিখ্যাত উপন্যাস Catch-22 থেকে। উপন্যাসটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একজন যুদ্ধবিমান চালকের গল্প বলা হয়েছে। তাকে যুদ্ধ থেকে ছুটি পেতে হলে একটি শর্ত পূরণ করতে হবে। শর্তটি হচ্ছে তাকে অবশ্যই মানসিকভাবে অসুস্থ হতে হবে। যদি কোনো ভাবে প্রমাণিত সে সুস্থ তাহলে ছুটি মিলবে না। এক্ষেত্রে ধরি, সে নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা ভেবে যুদ্ধে যেতে চাইলো না এবং ছুটির আবেদন করল। তাহলে এখন এটিই প্রমাণিত হবে, সে মানসিকভাবে সুস্থ। কারণ মানসিকভাবে সুস্থ না হলে কেউ নিজের ভালোটা বুঝবে না—এটাই সত্য। তাই ছুটি সে পাবে না। আবার সে যদি সত্যিই মানসিকভাবে অসুস্থ হওয়ার পরও আবেদন না করে তাহলেও সে ছুটি পাবে না। কারণ ছুটি পেতে হলে তো সেই আবেদনই করতে হবে। ফলে সে যেভাবেই চেষ্টা করুক না কেন, যুদ্ধ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় নেই। আর এই স্ববিরোধী নিয়মই তখন Catch-22 নামে পরিচিত ছিল।
যুক্তিবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে Catch-22 একটি আত্মনির্ভর স্ববিরোধী নিয়মের উদাহরণ। এটি সাধারণ প্যারাডক্সের মতো শুধু চিন্তার খেলা নয়। বিপরীতে এটি এমন একটি কাঠামো, যেখানে শর্তগুলো এমনভাবে সাজানো থাকে যেন মানুষ কোনো অবস্থাতেই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে না পারে। এ কারণে অনেক গবেষক একে প্রশাসনিক জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক নিয়ম এবং সামাজিক ব্যবস্থার একটি বাস্তব সমস্যা হিসেবেও দেখেন।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও Catch-22 পরিস্থিতির অনেক উদাহরণ দেখা যায়। যেমন: আর্টিকেলের প্রথমেই অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি নেই, আবার চাকরি ছাড়া অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব নয়—এমন একটি সমস্যার উল্লেখ রয়েছে। একইভাবে অনেক দেশে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জন্য ভালো আর্থিক অবস্থার একটি শর্ত দেওয়া থাকে। কিন্তু সেই ভালো আর্থিক অবস্থা গড়ে তুলতেও অনেক সময় ঋণের প্রয়োজন হয়। ধরুন, একটি ক্লাবে ঢুকতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি ওই ক্লাবের সদস্য। কিন্তু সদস্য হতে গেলেও আগে ক্লাবে ঢুকতে হবে। ফলে আপনি না সদস্য হতে পারছেন, না ক্লাবে ঢুকতে পারছেন। এগুলো Catch-22 পরিস্থিতির কাঠামোগত সমস্যার উদাহরণ।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই ধরনের পরিস্থিতি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। যখন কেউ অনুভব করে সে যেদিকেই এগোবে সেদিকেই বাধা, তখন তার মধ্যে হতাশা, মানসিক চাপ এবং সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করে। তবে বাস্তবে অনেক Catch-22 পরিস্থিতি মীমাংসা করা সম্ভব। নতুন দক্ষতা অর্জন, বিকল্প পথ খোঁজা, সামাজিক সহায়তা বা নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক সময় এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে Catch-22 একটি বিশেষ ধরনের কাঠামোগত সমস্যার প্রতীক। এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে মানুষ একটি স্ববিরোধী নিয়মের চক্রে আটকে যায়। শিক্ষা, চাকরি, অর্থনীতি, প্রশাসন এমনকি দৈনন্দিন সামাজিক সম্পর্কেও এই ধরনের পরিস্থিতির উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। তাই Catch-22 আজ হয়ে উঠেছে মানুষের তৈরি সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিগুলোর একটি।
