আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত এমন কিছু বৈজ্ঞানিক ঘটনা ঘটে যা হয়তো আমরা খেয়াল করি না। জন্মের পর থেকে এসব ঘটনা দেখে অভ্যস্ত বলে হয়তো আমরা এসবের কারণ খুঁজি না। যেমন: পানি কেন পদার্থকে ভেজাতে পারে, কিংবা মাধ্যাকর্ষণ কেন সবকিছুকে ভরযুক্ত বস্তুর কেন্দ্রের দিকে টানে। এমনই একটি ঘটনা ঘটে যখন আঠালো টেপ ছাড়ানোর সময় তীক্ষ্ণ ও কর্কশ শব্দ হয়। কিন্তু কেন হয় এই শব্দ?
এবার আঠালো টেপের এই অদ্ভুত শব্দের কারণ খুঁজে বের করেছেন বিজ্ঞানীরা। এটি করেছে চীনের University of Science and Technology of China-এর পদার্থবিদ Er Qiang Li-এর নেতৃত্বে একদল গবেষক। অতিদ্রুতগতির ক্যামেরা ও অত্যন্ত সংবেদনশীল মাইক্রোফোন ব্যবহার করে তারা দেখতে চেয়েছেন একটি সাধারণ আঠালো টেপ কাচের পৃষ্ঠ থেকে ছাড়ানোর সময় এতে কী ঘটে। তারা লক্ষ্য করে টেপের সেই তীক্ষ্ণ ও কর্কশ শব্দ আসলে অসংখ্য ক্ষুদ্র শকওয়েভের সমষ্টি। টেপের আঠার ভেতরে ছোট ছোট ফাটল খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই ফাটলগুলো আল্ট্রাসনিক গতিতে টেপের কিনারায় পৌঁছালে তখন শকওয়েভ তৈরি হয়।

অবশ্য টেপের এই শব্দ নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে। ২০১০ সালে একদল গবেষক লক্ষ্য করেছিলেন যে, আঠালো টেপের আলাদা হয়ে যাওয়া অংশে স্থিতিস্থাপক তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। তারা ভেবেছিল শব্দটি হয়তো সেখান থেকেই আসে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের একটি গবেষণায় শব্দটির সঙ্গে ক্ষুদ্র ফাটলের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও প্রকৃত কারণ পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। এই ধাঁধা সমাধান করতে লি ও তাঁর সহকর্মীরা ১৯ মিলিমিটার চওড়া একটি আঠালো টেপ কাচের পৃষ্ঠ থেকে ছাড়ানোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
বাইরে থেকে আঠালো টেপ ছাড়ানো স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে টেপটি বারবার আটকে যাওয়া ও ছুটে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় Stick-Slip বলা হয়। এক্ষেত্রে আঠা অল্প সময়ের জন্য পৃষ্ঠকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকাকে Stick এবং টান বাড়তে বাড়তে আঠার বন্ধন ভেঙে গিয়ে টেপ খুলে আসাকে Slip পর্যায় বলে। এটি বারবার ঘটতে থাকে। Slip পর্যায়ে টেপ ছাড়ানোর সময় ছোট ছোট ফাটল তৈরি হয়, যা Transverse Fracture নামে পরিচিত। এই ফাটলগুলো এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে দ্রুত ছুটে যায়। গবেষকরা ধারণা করছেন টেপের শব্দের মূল রহস্য এখানেই লুকিয়ে রয়েছে।

পরবর্তীতে দুটি মাইক্রোফোন এবং দুটি হাই-স্পিড ক্যামেরা ব্যবহার করে আঠালো টেপ খোলার প্রক্রিয়াটি রেকর্ড করে গবেষণা চালানো হয়। গবেষণাটিতে দেখা যায়, আঠালো টেপ ছাড়ানোর সময় তৈরি হওয়া ফাটল খুবই উচ্চ গতিতে ছুটে যায়। এর ফলে টেপ ও কাচের মাঝে ক্ষণস্থায়ী শূন্যস্থান তৈরি হয়। অবাক করা বিষয়, অনেক সময় এই গতি শব্দের গতির কাছাকাছি বা কখনও তার চেয়েও বেশি হয়। এরপর এই ফাটল কাঁচের কিনারায় পৌঁছালে বাতাস দ্রুত ঢুকে সেই ফাঁপা অংশ ধসে পড়ে এবং ছোট ছোট শকওয়েভ তৈরি হয়। এটিই মূলত আঠালো টেপ ছাড়ানোর সময় শোনা শব্দের প্রধান উৎস।
তাই, আপনার সাথে ঘটে চলা প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করুন। খুঁজে দেখুন ক্ষুদ্র কোনো ঘটনার মাঝেও বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে কি-না!
