গ্রীষ্ম বা বর্ষার কোনো শান্ত নিঝুম রাতে ঘরের জানালায় বসে একঘেয়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। অনেকেই এই অবিরাম ডাককে শুধুই প্রকৃতির এক বিরক্তিকর আওয়াজ বলে ধরে নেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই ছোট্ট পোকাটি আসলে প্রকৃতির এক নিখুঁত জীবন্ত থার্মোমিটার?
হ্যাঁ, কোনো ডিজিটাল ডিভাইস বা পারদ থার্মোমিটার ছাড়াই শুধুমাত্র ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের গতি গুনেই আপনি নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারবেন বাইরের তাপমাত্রা কত ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ফারেনহাইট!
বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই চমৎকার বিষয়টিকে বলা হয় ডলবেয়ারের সূত্র। বাস্তব কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই প্রকৃতির এক অতি সাধারণ পোকা কীভাবে আবহাওয়ার খবর নিখুঁতভাবে প্রকাশ করে, তা সত্যিই এক অদ্ভুত বিস্ময়। ল্যাবরেটরির জটিল যন্ত্রপাতির বাইরেও যে প্রকৃতি নিজের ভেতর গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানকে লুকিয়ে রেখেছে, এই ছোট্ট পোকাটি তার এক অনন্য উদাহরণ।

ডলবেয়ারের সূত্র কী এবং কীভাবে এলো?
১৮৯৭ সালে মার্কিন পদার্থবিদ এবং উদ্ভাবক অ্যামোস ডলবেয়ার প্রথম এই অদ্ভুত বিষয়টি আবিষ্কার করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়া বা কমার সাথে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকার গতির একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক রেকর্ড করেন এবং সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে একটি নিখুঁত গাণিতিক ফর্মুলা দাঁড় করান। তিনি তাঁর এই পর্যবেক্ষণকে দ্য আমেরিকান ন্যাচারালিস্ট জার্নালে একটি নিবন্ধ আকারে প্রকাশ করেন, যা পরবর্তীতে বিজ্ঞানের জগতে ‘ডলবেয়ারের সূত্র’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
আমোস ডলবেয়ার যে সূত্রটি দিয়েছিলেন, তা মূলত ফারেনহাইট স্কেলে তাপমাত্রা মাপার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। সূত্রটি দেখতে এমন (ছবিতে দেখুন)

এখানে TF হলো ফারেনহাইট স্কেলে তাপমাত্রা এবং N হলো প্রতি মিনিটে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ করার বা ডাকার সংখ্যা।
ফর্মুলাটি যদি আরেকটু সহজ করে দেই, তাহলে দাঁড়ায়—একটি ঝিঁঝিঁ পোকা ১৫ সেকেন্ডে যতবার ডাকবে, সেই সংখ্যার সাথে ৪০ যোগ করলেই তখনকার বাইরের তাপমাত্রা ফারেনহাইট স্কেলে পেয়ে যাবেন!
উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি ১৫ সেকেন্ডে ঝিঁঝিঁ পোকার ৩০টি ডাক শোনেন, তবে ৩০-এর সাথে ৪০ যোগ করলে হবে ৭০। অর্থাৎ বাইরের তাপমাত্রা তখন ৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
পোকারা কেন এমন করে?
কোনো অলৌকিক ক্ষমতা, জাদু বা ভবিষ্যৎবাণী করার ক্ষমতা থেকে ঝিঁঝিঁ পোকারা এই কাজ করে না। এর পেছনে রয়েছে জীববিজ্ঞানের এক চমৎকার বাস্তব কারণ। ঝিঁঝিঁ পোকা হলো শীতল রক্তের প্রাণী বা Ectothermic জীব। এর মানে হলো, মানুষের মতো এরা নিজেদের শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এদের শরীরের তাপমাত্রা পুরোপুরি নির্ভর করে চারপাশের আবহাওয়ার ওপর।
ঝিঁঝিঁ পোকার শরীরের ভেতরে ঘটা সমস্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়া তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে দ্রুততর হয়। এই পোকাদের নড়াচড়া এবং ডানা ঝাপটানোর জন্য শরীরের কোষে যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, তা সম্পূর্ণ এনজাইমের ওপর নির্ভরশীল। আর এনজাইমগুলো গরমের দিনে খুব দ্রুত কাজ করে।
যখন চারপাশের আবহাওয়া গরম থাকে, তখন এদের পেশীগুলো অনেক বেশি সচল, নমনীয় ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে এরা খুব দ্রুত ডানা ঝাপটে ডাকতে পারে। এখানে একটি মজার তথ্য দেই।
ঝিঁঝিঁ পোকা কিন্তু আমাদের মতো মুখ বা গলা দিয়ে ডাকে না। পুরুষ ঝিঁঝিঁ পোকার ডানার একটি অংশে চিরুনির মতো সূক্ষ্ম খাঁজ থাকে, যা তারা অন্য ডানার শক্ত অংশের সাথে খুব দ্রুত ঘষে এই তীক্ষ্ণ শব্দ তৈরি করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই শব্দ তৈরির প্রক্রিয়াকে বলা হয় Stridulation।
পক্ষান্তরে, বাইরের আবহাওয়া যখন ঠান্ডা হয়ে আসে, তখন তাদের শরীরের ভেতরের রাসায়নিক গতি ধীর হয়ে যায়। পেশীগুলো আড়ষ্ট হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিকভাবেই তাদের ডানা ঘষার গতিও কমে আসে এবং তাপমাত্রা অতিরিক্ত কমে গেলে তারা পুরোপুরি নীরব হয়ে যায়।
সেলসিয়াস স্কেলে হিসাব করার সহজ নিয়ম
আমেরিকা বা ইউরোপে ফারেনহাইট স্কেল জনপ্রিয় হলেও আমাদের বাংলাদেশ বা সাবকন্টিনেন্টে আমরা সাধারণত সেলসিয়াস স্কেলে তাপমাত্রা পরিমাপ করতে অভ্যস্ত। তাই ডলবেয়ারের এই সূত্রটিকে আধুনিক বিজ্ঞানীরা সেলসিয়াসের জন্যও একটি সহজ রূপে রূপান্তর করেছেন। সেলসিয়াসের গাণিতিক সমীকরণটি হল:

অর্থাৎ, একটি ঝিঁঝিঁ পোকা ৮ সেকেন্ডে যতবার ডাকবে, সেই সংখ্যার সাথে ৫ যোগ করলেই বাইরের তাপমাত্রা সেলসিয়াসে পাওয়া যাবে।
চলুন একটি বাস্তব উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বোঝা যাক। মনে করুন, আপনি গ্রীষ্মের এক রাতে স্টপওয়াচ অন করে ঠিক ৮ সেকেন্ড গুনলেন। দেখলেন এই ৮ সেকেন্ড সময়ে একটি নির্দিষ্ট ঝিঁঝিঁ পোকা মোট ২৫ বার ডেকেছে। এবার ডলবেয়ারের সহজ নিয়ম অনুযায়ী: ২৫ + ৫ = ৩০। এর অর্থ হলো, আপনার বাইরের বর্তমান তাপমাত্রা আনুমানিক ৩০°C।
ডিজিটাল থার্মোমিটার দিয়ে মেলালে দেখা যাবে এই হিসাবটি অবিশ্বাস্য রকমের। নিখুঁত অথবা তার খুব কাছাকাছি হবে।
পপ কালচার ও বিগ ব্যাং থিওরি
ডলবেয়ারের এই সূত্রটি শুধুমাত্র বিজ্ঞানের বইয়েই আটকে থাকেনি, এটি বিশ্বজুড়ে পপ কালচার এবং বিখ্যাত সব টিভি শো-তেও জায়গা করে নিয়েছে। আপনারা যারা বিখ্যাত আমেরিকান সিটকম “The Big Bang Theory” দেখেছেন, তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে, তৃতীয় সিজনের একটি এপিসোডে কেন্দ্রীয় চরিত্র ডেল রবার্টসন এবং শেলডন কুপারের মধ্যে একটি ঝিঁঝিঁ পোকার প্রজাতির ডাক এবং ডলবেয়ারের সূত্র নিয়ে তুমুল তর্ক হয়েছিল।
শেলডন কুপার ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের ফ্রিকোয়েন্সি শুনে ডলবেয়ারের সূত্র ব্যবহার করে ঘরের তাপমাত্রা নিখুঁতভাবে বলে দিয়েছিলেন। এই এপিসোডের পর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ প্রথম জানতে পারে যে ঝিঁঝিঁ পোকা আসলেই আবহাওয়ার খবর দিতে পারে।
সূত্রের কিছু সীমাবদ্ধতা
ডলবেয়ারের সূত্রটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও বিজ্ঞানের আর সব সূত্রের মতোই এর কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সব পরিস্থিতিতে এই থার্মোমিটার সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে।
কারণ গুলো হচ্ছে —
১. ডলবেয়ার মূলত উত্তর আমেরিকার তুষারময় গাছের ঝিঁঝিঁ পোকা
নিয়ে গবেষণা করে এই সূত্র দিয়েছিলেন।
আমাদের দেশে বা অন্যান্য অঞ্চলে যে সাধারণ মাঠের ঝিঁঝিঁ পোকা দেখা যায়, তাদের ডাকার গতি প্রজাতিভেদে সামান্য কম-বেশি হতে পারে।
২. আবহাওয়া যদি খুব বেশি ঠান্ডা হয়ে যায়, অর্থাৎ ১০°C-এর নিচে নেমে যায়, তবে ঝিঁঝিঁ পোকারা ঠান্ডায় জমে যায় এবং ডাকাই বন্ধ করে দেয়। আবার তাপমাত্রা যদি ৩8°C-এর উপরে চলে যায়, তখন অতিরিক্ত গরমে ক্লান্ত হয়ে তারা শব্দ করা থামিয়ে দেয়। তাই চরম আবহাওয়ায় এই সূত্র কাজ করে না।
৩. একটি নির্দিষ্ট পোকা যদি অসুস্থ থাকে, কোনো কারণে তার ডানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিংবা আসেপাশের কোনো শিকারী প্রাণীর ভয়ে সে সতর্ক থাকে, তবে তার ডাকার স্বাভাবিক ছন্দ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। তাই সঠিক রেজাল্ট পেতে সাধারণত একটি পোকার বদলে ২-৩টি পোকার ডাকের গড় হিসাব করা ভালো।
