দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রতিনিয়ত কত কিছু ছুঁয়ে দেখি! সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়ানো, চেয়ারে বসা, কিংবা প্রিয় কোনো মানুষের হাত ধরা—আমাদের কাছে এগুলো খুবই স্বাভাবিক এবং বাস্তব ঘটনা। কিন্তু যদি বলা হয়, আক্ষরিক অর্থে আপনি আপনার পুরো জীবনে কখনোই কোনো বস্তুকে বাস্তবে ‘স্পর্শ’ করতে পারেননি? শুনতে একদম অবাস্তব বা কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার গল্পের মতো মনে হলেও, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কিন্তু এই দাবিকেই শতভাগ সত্যি বলে প্রমাণ করে।
আমাদের চারপাশের চেনা জগতের আড়ালে যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণুর জগৎ রয়েছে, সেখানে স্পর্শের সংজ্ঞাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের চোখ রাখতে হবে পদার্থের একদম গভীরে, তার পরমাণুর অন্দরমহলে।
মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু এবং আমাদের মানবশরীর অসংখ্য ক্ষুদ্র পরমাণু দিয়ে তৈরি। প্রতিটি পরমাণুর একদম কেন্দ্রে থাকে পজিটিভ চার্জযুক্ত নিউক্লিয়াস, আর তাকে কেন্দ্র করে বাইরের কক্ষপথে মেঘের মতো অবিরাম ঘুরতে থাকে নেগেটিভ চার্জযুক্ত ইলেকট্রন। এখন, পদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক নিয়ম হলো—সমধর্মী চার্জ সবসময় একে অপরকে বিকর্ষণ করে। ঠিক যেমন দুটি চৌম্বকের উত্তর মেরুকে কাছাকাছি আনলে তারা একে অপরকে তীব্রভাবে দূরে ঠেলে দেয়।

আপনি যখন কোনো টেবিল, বই কিংবা অন্য কোনো বস্তুর ওপর হাত রাখেন, তখন আপনার হাতের পরমাণুর বাইরের স্তরে থাকা ইলেকট্রনগুলো এবং ওই বস্তুর পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো পরস্পরের খুব কাছাকাছি চলে আসে। অত্যন্ত কাছাকাছি আসায় তাদের মধ্যকার নেগেটিভ চার্জ একে অপরকে প্রচণ্ড শক্তিতে বিকর্ষণ করতে শুরু করে। এই বিকর্ষণ বল এতটাই শক্তিশালী যে দুই মাধ্যমের পরমাণু কখনোই একে অপরকে সরাসরি ছুঁতে পারে না। তাদের মধ্যে সবসময়ই একটি অতি ক্ষুদ্র, ন্যানোমিটার স্কেলের খালি জায়গা বা গ্যাপ থেকে যায়। অর্থাৎ, আপনি যখন কোনো চেয়ারে বসেন, তখন আক্ষরিক অর্থে আপনি চেয়ারের ওপর বসেন না, বরং চেয়ারের পরমাণু থেকে এক ন্যানোমিটারের ভগ্নাংশ দূরত্বে শূন্যে ভেসে থাকেন!
পরমাণুর এই বিকর্ষণের পাশাপাশি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আরেকটি বিখ্যাত নিয়ম এখানে কাজ করে, যার নাম ‘পাউলির বর্জন নীতি’ (Pauli Exclusion Principle)। এই নীতি অনুযায়ী, দুটি সমধর্মী কণা (যেমন দুটি ইলেকট্রন) কখনো মহাবিশ্বের একই স্থানে এবং একই শক্তিস্তরে একসাথে অবস্থান করতে পারে না। ফলে যখন আপনি কোনো বস্তুর ওপর চাপ প্রয়োগ করেন, তখন দুই মাধ্যমের ইলেকট্রনের শক্তির স্তরগুলো একে অপরের ভেতর ঢুকে যেতে বাধা দেয় এবং পরস্পরকে দূরে ঠেলে দেয়।

তাহলে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—আমরা যে শক্ত, নরম, ঠাণ্ডা কিংবা গরমের মতো ‘স্পর্শের অনুভূতি’ পাই, সেটা কীভাবে সম্ভব হয়?
আসলে এটি আমাদের শরীরের স্নায়ুতন্ত্র এবং মস্তিষ্কের তৈরি করা একটি চমৎকার ইলিউশন বা অনুভূতির অনুবাদ মাত্র। আপনি যখন কোনো বস্তুকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন, তখন ইলেকট্রনগুলোর মধ্যকার সেই তীব্র বিকর্ষণ বলের কারণে আপনার আঙুলের ত্বকের স্নায়ুকোষগুলোতে একটি যান্ত্রিক চাপ বা বলের সৃষ্টি হয়। এই চাপটি তৈরি হওয়া মাত্রই আমাদের স্নায়ু সেই সংকেতটিকে একটি বৈদ্যুতিক তরঙ্গে রূপান্তর করে মেরুদণ্ড হয়ে সরাসরি মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেয়। আমাদের মস্তিষ্ক তখন সেই বৈদ্যুতিক সিগন্যালটিকে প্রসেস করে মুহূর্তের মধ্যে আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে, “আমরা শক্ত বা নরম কিছু একটা ছুঁয়েছি।”
পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান থেকে শুরু করে আধুনিক কোয়ান্টাম গবেষকদের বিভিন্ন তাত্ত্বিক কাজ ও গবেষণায় পরমাণুর এই বিকর্ষণ বলের বিষয়টি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। আমরা যাকে ‘স্পর্শ’ বলে আনন্দ পাই, তা আসলে দুটি ভিন্ন বস্তুর ইলেকট্রন মেঘের মধ্যকার তীব্র একটি বলের যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রকৃতির এই অদ্ভুত নিয়মের কারণে বলা যায়, আমরা প্রত্যেকেই এই মহাবিশ্বের কোনো কিছুকে সরাসরি না ছুঁয়েও এক অদৃশ্য দূরত্বের আড়ালে থেকে পুরো জীবন পার করে দিচ্ছি!
