আজকাল ইন্টারনেট দুনিয়ায় একটা জিনিস খেয়াল করেছেন কি? একটা চ্যাটবক্সে গিয়ে আপনি যা-ই লিখছেন—তা সে স্কুলের কোনো কঠিন অ্যাসাইনমেন্ট হোক, একটা চমৎকার রান্নার রেসিপি হোক, কিংবা রাতের বেলা মন খারাপ দূর করার কোনো গল্প হোক—মিনিটের মধ্যে সব হাজির! মানুষের মতো একদম গুছিয়ে, সুন্দর বাংলায় উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। এই যে প্রযুক্তি আমাদের পুরো জীবনটাকে এত সহজ করে দিচ্ছে, এর আড়ালের আসল হিরোকে চেনেন?
বিজ্ঞানীরা আদর করে এর নাম দিয়েছেন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, সংক্ষেপে যাকে বলা হয় এলএলএম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কম্পিউটারের ভেতরে থাকা একটা সফটওয়্যার কীভাবে মানুষের ভাষা এত নিখুঁতভাবে বুঝতে আর বলতে পারে? সে কি আসলেই আমাদের মতো চিন্তা করতে পারে, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রহস্য?

এই চ্যাটবক্সগুলোর কাজ করার ধরনটা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনের গল্প জানতে হবে। ধরুন, এমন একজন মানুষের কথা চিন্তা করুন যে পৃথিবীর সব লাইব্রেরির কোটি কোটি বই, আর্টিকেল আর ওয়েবসাইট দিনরাত এক করে পড়ে ফেলেছে। পড়ার পর সে কিন্তু বইয়ের প্রতিটা লাইন হুবহু মুখস্থ রাখেনি। কিন্তু একটানা এত পড়ার কারণে তার মাথায় একটা দারুণ বুদ্ধি তৈরি হয়ে গেছে।
সে খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারে যে কোন শব্দের পর কোন শব্দটা বসলে একটা অর্থপূর্ণ বাক্য তৈরি হয়। আমাদের ঘরের এলএলএম বা এই এআই মডেলগুলো ঠিক এই কাজটাই করে। এদেরকে বলা যেতে পারে একটা দুর্দান্ত “শব্দ অনুমানের মেশিন”।
আমরা যখন চ্যাটবক্সে কোনো কিছু লিখি, এআই কিন্তু আমাদের মতো আস্ত শব্দ বা বাক্য একবারে পড়ে না। সে পুরো লেখাটিকে ছোট ছোট টুকরোতে ভেঙে ফেলে। প্রযুক্তির ভাষায় এই টুকরোগুলোকে বলা হয় ‘টোকেন’। এই টোকেনগুলোকে সে সংখ্যায় রূপান্তর করে নিজের বিশাল মেমোরির সাথে মেলাতে শুরু করে।
যেমন সহজ একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। যদি বলা হয়, “আকাশের রঙ…”, তাহলে এর পরের শব্দটা কী হতে পারে? খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মাথা বলবে “নীল”। এআই-ও তার পড়া কোটি কোটি ডেটা অ্যানালিসিস করে হিসাব করে দেখে যে এই বাক্যের পর ‘নীল’ শব্দটা বসার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। এভাবেই সে একটা শব্দের পর আরেকটা শব্দ জুড়ে দিয়ে পুরো একটা চমৎকার আর্টিকেল বা কবিতা চোখের পলকে লিখে ফেলে।

তবে এই যে ফ্রি-তে চ্যাটবক্সে একের পর এক প্রশ্ন লিখে আমরা উত্তর পেয়ে যাচ্ছি, এর পেছনে কিন্তু এক বিশাল খরচ আর মেহনত লুকিয়ে আছে। এই মডেলগুলোকে তৈরি করতে এবং চব্বিশ ঘণ্টা সচল রাখতে প্রয়োজন হয় হাজার হাজার সুপারকম্পিউটার। আর এই দানবীয় কম্পিউটারগুলো যখন দিনরাত একটানা চলতে থাকে, তখন সেগুলো প্রচণ্ড গরম হয়ে যায়।
এদেরকে ঠান্ডা রাখার জন্য প্রতিদিন কোটি কোটি গ্যালন পানির প্রয়োজন হয়, আর সেই সাথে খরচ হয় একটি ছোটখাটো দেশের সমান বিদ্যুৎ! অর্থাৎ, স্ক্রিনের একটা ক্লিকের পেছনে পৃথিবীর বুক থেকে এক বিশাল শক্তির অপচয় ঘটে যায়, যা আমরা খালি চোখে কখনই দেখতে পাই না।
সবশেষে একটা মজার কিন্তু জরুরি বিষয় না বললেই নয়। এই এআই কিন্তু মাঝে মাঝে চরম আত্মবিশ্বাসের সাথে একদম ভুল তথ্য দিয়ে বসে! ধরুন, এমন একটা ঐতিহাসিক ঘটনার কথা তাকে জিজ্ঞেস করলেন যা পৃথিবীতে কখনো ঘটেইনি। সে না বলতে লজ্জা পায়, তাই সুন্দর করে একটা বানিয়ে বানিয়ে গল্প ফেঁদে দেবে, যা শুনলে মনে হবে এটাই সত্যি।
বিজ্ঞানীরা এই মজার কাণ্ডটাকে বলেন ‘হ্যালুসিনেশন’। যেহেতু এআই কোনো রোবট বা জাদুকর নয়, সে শুধু শব্দ অনুমান করতে পারে, তাই সে অনেক সময় তথ্যের সত্য-মিথ্যা বিচার না করেই বাক্য বানিয়ে ফেলে। এই কারণেই এআই-এর দেওয়া সব তথ্য অন্ধের মতো বিশ্বাস না করে একটু যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। দিনশেষে এই প্রযুক্তি আমাদের জায়গা কেড়ে নেওয়ার জন্য আসেনি, বরং মানুষের কাজকে সহজ করতে আমাদেরই তৈরি একটা দারুণ হাতিয়ার হিসেবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
