বিজ্ঞান কল্পকাহিনি বা সায়েন্স ফিকশন সিনেমার পর্দায় আমরা প্রায়ই দেখি যে নায়ক তার মস্তিষ্কের সমস্ত স্মৃতি, আবেগ এবং বুদ্ধিমত্তা একটি তারের মাধ্যমে কম্পিউটারে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। দেহ নশ্বর, কিন্তু তার স্মৃতি, আবেগ, চেতনা এবং বুদ্ধিমত্তা হয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল এবং অমর। ‘ব্ল্যাক মিরর’ থেকে শুরু করে ‘অল্টারড কার্বন’, এই ধারণাটি আমাদের বহুদিন ধরেই রোমাঞ্চিত করে আসছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Mind Uploadingবা Whole Brain Emulation। তাত্ত্বিকভাবে, মস্তিষ্কের এই ডিজিটাল রূপান্তর পদার্থবিজ্ঞানের নীতিবিরোধী নয়, কিন্তু প্রশ্ন হলো: বাস্তবে এটি কতটা সম্ভব? আমরা কি সত্যিই কোনো একদিন আমাদের চেতনাকে কোনো পেনড্রাইভ বা ক্লাউডে সংরক্ষণ করতে পারব?

মস্তিষ্ক যখন হার্ডওয়্যার, মন যখন সফটওয়্যার

মাইন্ড আপলোডিংয়ের মূল ভিত্তিটি দাঁড়িয়ে আছে একটি যান্ত্রিক উপমার ওপর। এখানে মানুষের মস্তিষ্ককে একটি অবিশ্বাস্য জটিল ‘বায়োলজিক্যাল হার্ডওয়্যার’ এবং আমাদের মন বা চেতনাকে ‘সফটওয়্যার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। যদি আমরা মস্তিষ্কের এই সফটওয়্যার বা কোড হুবহু কপি করে কোনো সিলিকন চিপ বা শক্তিশালী কম্পিউটারে রান করাতে পারি, তবে সেই যন্ত্রটি ঠিক আপনার মতোই চিন্তা করবে এবং অনুভব করবে।

শুনতে সহজ মনে হলেও, এটি মহাবিশ্বের অন্যতম কঠিন বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ। মানুষের মস্তিষ্ক প্রায় ৮৬ বিলিয়ন (৮,৬০০ কোটি) নিউরন এবং ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন সিন্যাপস- এর এক বিশাল জটিল জাল। এই সংযোগগুলোর মাধ্যমেই বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেত আদান-প্রদান হয়, যা আমাদের স্মৃতি, ব্যক্তিত্ব ও চেতনার জন্ম দেয়। কোনো মানুষের মনকে কম্পিউটারে আপলোড করতে হলে বিজ্ঞানীদের প্রথমে এই পুরো সংযোগের একটি নিখুঁত ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করতে হবে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Connectome।

ডেটার বিশালতা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা

বর্তমানে আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এই স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত কেবল C. elegans নামক একটি ক্ষুদ্র সুতোকৃমির সম্পূর্ণ কানেক্টম ম্যাপ করতে পেরেছেন, যার মস্তিষ্কে মাত্র ৩০২টি নিউরন এবং প্রায় ৭০০০ সিন্যাপস রয়েছে। অথচ মানুষের মস্তিষ্কের জটিলতা এর চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশি।

হার্ভার্ড ও গুগলের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, মানব-মস্তিষ্কের মাত্র ১ ঘনমিলিমিটার স্নায়ুটিস্যুর (যা একটি পিনহেডের চেয়েও ছোট) ম্যাপ তৈরি করতে প্রায় ১,৪০০ টেরাবাইট বা ১.৪ পেটাবাইট ডেটা স্টোরেজ প্রয়োজন হয়। এই ১ ঘনমিলিমিটার জায়গাতেই ৫৭,০০০ কোষ এবং ১.৫ কোটি সিন্যাপস থাকে। পুরো মস্তিষ্কের ম্যাপ তৈরি করতে যে পরিমাণ ডেটা প্রসেসিং ও স্টোরেজ প্রয়োজন, তা বর্তমানে পৃথিবীর সমস্ত সুপারকম্পিউটারের সম্মিলিত ক্ষমতার চাইতেও বেশি হতে পারে। জর্জিয়া টেকের স্নায়ুবিজ্ঞানী Dr. Dobromir Rahnev– এর মতে,

তাত্ত্বিকভাবে মাইন্ড আপলোডিং সম্ভব হলেও বর্তমান প্রযুক্তিতে আমরা এর ধারে-কাছেও নেই।


কেবল ম্যাপই যথেষ্ট নয়: ইন্দ্রিয় এবং অনুভূতির চ্যালেঞ্জ

মস্তিষ্কের গঠন হুবহু কপি করলেই কাজ শেষ হয় না। মস্তিষ্ক কোনো স্থির বস্তু নয়, এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। নিউরনগুলো কীভাবে বৈদ্যুতিক সংকেত বিনিময় করছে এবং রাসায়নিক উপাদান বা নিউরোট্রান্সমিটারের অবস্থা কী, সেগুলো রিয়েল-টাইমে সিমুলেট করতে হবে। মস্তিষ্কের এই প্রকৃতিকে বলা হয় Dynamicity বা গতিশীলতা। বর্তমানে আমাদের কাছে এমন কোনো স্ক্যানিং প্রযুক্তি নেই যা জীবিত মানুষের মস্তিষ্কের গভীরে গিয়ে প্রতিটি সিন্যাপসের কেমিক্যাল অবস্থা স্ক্যান করতে পারে, তাও আবার মস্তিষ্ককে কোনো ক্ষতি না করে। বর্তমানের MRI স্ক্যানারগুলো মস্তিষ্কের গঠনের ছবি তুলতে পারে, কিন্তু প্রতিটি নিউরনের সূক্ষ্ম কার্যকলাপ বোঝার ক্ষমতা এদের নেই।

এর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো পারিপার্শ্বিকতা। আমাদের মস্তিষ্ক শূন্যে ভাসে না; এটি দেখার, শোনার, ঘ্রাণের ও স্পর্শের মাধ্যমে পরিবেশের সাথে রিস্পন্ড করে। গবেষকরা বলছেন, একটি আপলোড করা মস্তিষ্ককে যদি সঠিক ভার্চুয়াল দেহে (যথাযথ ইন্দ্রিয় সংযোগ সম্পন্ন দেহে), ইনপুট না দেওয়া হয়, তবে সেটি চরম Sensory Deprivation ভুগবে। অর্থাৎ, চেতনা স্থানান্তরের জন্য কেবল মস্তিষ্ক কপি করলেই হবে না, সেই ডিজিটাল সত্তার বসবাসের জন্য একটি নিখুঁত কৃত্রিম জগতও নির্মাণ করতে হবে।

Image Credit: Shuttlestock

দার্শনিক সংকট: আমি কি ‘আমি’ই থাকব?

প্রযুক্তিগত বাধার বাইরেও রয়েছে গভীর দার্শনিক ও তাত্ত্বিক সমস্যা। ধরে নিলাম, ভবিষ্যতে আমরা আপনার মস্তিষ্কের প্রতিটি অণু-পরমাণু স্ক্যান করে কম্পিউটারে হুবহু কপি করে ফেললাম। কিন্তু সেই ডিজিটাল সত্তাটি কি সত্যিই ‘আপনি’ হবেন, নাকি এটি কেবল আপনার স্মৃতি ও আচরণের একটি ‘নিখুঁত কপি’ বা ক্লোন হবে?

এই প্রশ্নটি Ship of Theseus প্যারাডক্সের আধুনিক সংস্করণ। যদি আপলোডিং প্রক্রিয়ার পরেও আপনার জৈবিক শরীর জীবিত থাকে, তবে পৃথিবীতে আপনার দুটি সত্তা থাকবে। এমতাবস্থায় মূল শরীর মারা গেলে, আপনি কি সত্যিই কম্পিউটারে বেঁচে রইলেন, নাকি আপনি মারা গেলেন এবং একটি ডিজিটাল কপি আপনার অভিনয় চালিয়ে গেল? চেতনা কি কেবল তথ্যের সমষ্টি, নাকি এর সাথে আমাদের জৈবিক অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে? বিজ্ঞান এখনো এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।

ভবিষ্যৎ কতটা দূরে?

মাইন্ড আপলোডিং নিয়ে বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণীতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। Ray Kurzweil– এর মতো ফিউচারিস্টরা আশাবাদী যে,

২০৪৫ সালের মধ্যে ন্যানোটেকনোলজি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অভাবনীয় উন্নতির ফলে এটি সম্ভব হতে পারে।

তাদের ধারণা, ভবিষ্যতে ন্যানোবট রক্তনালীর মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে ভেতর থেকে নিউরনের তথ্য স্ক্যান করতে পারবে।

অন্যদিকে, Dr. Dobromir এবং অন্যান্য রক্ষণশীল গবেষকরা মনে করেন, এই প্রযুক্তির জন্য আমাদের হয়তো কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (EU) ‘Human Brain Project’ এবং USA-এর ‘Brain Initiative’-এর মতো প্রজেক্টগুলো মস্তিষ্কের রহস্য উন্মোচনে কাজ করে যাচ্ছে। যদিও তাদের মূল লক্ষ্য মাইন্ড আপলোডিং নয়, বরং মস্তিষ্কের রোগ নিরাময়, তবুও এই গবেষণাগুলোই ভবিষ্যতে ডিজিটাল চেতনার পথ প্রশস্ত করতে পারে।

সর্বশেষ:

তাই বলা যায়, আমাদের চেতনাকে কম্পিউটারে আপলোড করার স্বপ্নটি বর্তমানে বিজ্ঞান ও কল্পকাহিনীর মাঝামাঝি কোনো এক ধূসর এলাকায় অবস্থান করছে। এটি তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব নয়, কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে আমরা এখনো অনেক অনেক দূরে। মস্তিষ্কের জটিলতা, বিশাল ডেটা প্রসেসিংয়ের চ্যালেঞ্জ এবং চেতনার স্বরূপ নিয়ে দার্শনিক ধোঁয়াশা- সব মিলিয়ে এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন। হয়তো কোনো একদিন আমরা শরীরহীন ডিজিটাল সত্তা হিসেবে মহাকাশ ভ্রমণ করব, অথবা হয়তো আমরা আবিষ্কার করব যে মানুষের চেতনাকে কখনোই যন্ত্রে বন্দি করা সম্ভব নয়। তবে সেই দিনটি দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরো অনেকগুলো বছর।

তথ্যসুত্রঃ Georgia Tech Research, Harvard Gazette, The Guardian, Psychology Today.

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply