প্রতিদিন চলাচলের সময় মনের অজান্তে কত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী কে আমরা পায়ের নিচে পিষে ফেলি। তবে এসব প্রাণীর মাঝেই এমন একটি প্রাণী আছে যাদের রয়েছে একটি বিশাল সম্রাজ্য, সুগঠিত সমাজব্যবস্থা, যুদ্ধনীতি, চাষাবাদ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। উন্নত বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত দেখে মানুষ চমকে যায় কিন্তু এই প্রাণীর যোগাযোগ ব্যবস্থা এই আধুনিক সভ্যতাকেও হার মানায়। বলছি ছোট্ট প্রাণী পিঁপড়ার কথা।
পিঁপড়াদের মহাজগত
পিঁপড়াদের স্বাধীন কোন অস্তিত্ব নেই। তারা সবাই মিলে একটি বড় গাছের শাখা প্রশাখার মত কাজ করে তাই বিজ্ঞানীরা একে বলে সুপার অর্গানিজম। পিঁপড়াদের কলোনিতে সাধারণত তিন ধরনের পিঁপড়া দেখা যায়। প্রথমেই রানী পিপড়া, এদের কাজ হলো বংশবৃদ্ধি করে কলোনিকে টিকিয়ে রাখা। এরপরে শ্রমিক পিঁপড়া, এরা কলোনির ভিতরের সব কাজ করে। বাসা বানানো থেকে খাবার আনা, কলোনির যত্ন নেয়া সব কাজ। এরপরে সৈনিক পিঁপড়া, এদের শক্তিশালী চোয়াল শত্রুর আক্রমণ থেকে কলোনিকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
সাধারণত রাস্তায় আমরা জ্যাম দেখে থাকি। কিন্তু পিঁপড়াদের ট্রাফিক সিস্টেম এতটাই উন্নত যে এদের কোন ট্র্যাফিক জ্যামের সৃষ্টি হয় না। এদের কলোনিতে প্রতিদিন লাখ লাখ পিঁপড়া যাতায়াত করে কিন্তু কোন জ্যামের সৃষ্টি হয় না। পিঁপড়েরা মূলত তিনটি লেনে চলাচল করে। মাঝখানের লেন দিয়ে পিঁপড়ারা খাবার নিয়ে ঘরে ফেরে আর দুই পাশের লেন দিয়ে পিঁপড়ারা খাবার খুঁজতে বাইরে যায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত নেটওয়ার্ক
মানুষ যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে কিন্তু লাখ লাখ পিঁপড়ারা নিজেদের মাঝে যোগাযোগের জন্য ফেরোমন নামের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে। যখন কোন পিঁপড়া দূরে কোথাও খাবারের সন্ধান পায় তখন সে খাবার নিয়ে আসার সময় মাটিতে ফেরোমন দিয়ে রাস্তা তৈরি করে। ফলে অন্য পিঁপড়ারা সেই পথ অনুসরণ করে খাবারের উৎসে পৌঁছে যায়। এছাড়া কোন পিঁপড়া মারা গেলে তার শরীর থেকে এক ধরনের বিশেষ এসিড নিঃসৃত হয়। বাকি পিঁপড়ারা সেই গন্ধ পাওয়া মাত্রই বুঝা যায় যে তাদের সাথী আর বেঁচে নেই। তখন তারা সেই মৃতদেহটি কলোনির বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যায় যাকে পিঁপড়াদের কবরস্থান বলা চলে।

পৃথিবীর প্রথম ডেইরি ফার্মার
আমরা অনেকেই ভেবে থাকি চাষাবাদ বা কৃষিকাজ শুধু মানুষই করে থাকে। মানুষ আজ থেকে ১০ বা ১২ হাজার বছর আগে কৃষিকাজ শিখেছে কিন্তু পিঁপড়ারা আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে থেকেই কৃষিকাজ করে আসছে। ফলে এটিকে ডাইনোসরের সময়ের প্রাণী বলা চলে। লিফকাটার পিঁপড়ারা গাছের পাতা চিবিয়ে মাটির নিচে নিয়ে গিয়ে বিশেষ ধরনের মণ্ড তৈরি করে যার উপর মাশরুমের চাষ করে। এছাড়াও এদের কলোনিতে গবাদিপশু লালন পালনের ব্যবস্থা আছে। অ্যাফিড নামক এক ধরনের পোকা লালন পালন করে এর থেকে মিষ্টি মধু সংগ্রহ করে যা এদের পুষ্টির চাহিদা মেটায়।
ক্ষুদে বাহিনীর যুদ্ধ কৌশল ও নির্মম দাস প্রথা
ক্ষমতার জন্য পৃথিবীতে অনেক যুদ্ধ নিয়মিত হচ্ছে এবং হয়েছে। ঠিক তেমনি পিঁপড়াদের মাঝেও সাম্রাজ্য বিস্তার এবং সম্পদের জন্যও যুদ্ধ হয়ে থাকে। যুদ্ধে যাওয়ার আগে তাদের একটি দল শত্রুর কলোনিতে গিয়ে গুপ্তচরের মতো রেকি করে আসে। যুদ্ধের সময় তারা অস্ত্র হিসেবে তীব্র ফরমিক এসিড ব্যবহার করে। এছাড়া কিছু প্রজাতির পিঁপড়া কলোনিকে রক্ষা করতে সুইসাইড বোম্বার হিসেবে কাজ করে। ফলে চারিদিকে বিষাক্ত তরল ছড়িয়ে শত্রু বাহিনীকে অবশ করে দেয়।
প্রাচীন যুগে যে দাস প্রথা ছিল সেই দাসপ্রথা এখনো পিঁপড়াদের মাঝে বিদ্যমান। শক্তিশালী পিঁপড়ারা দুর্বল পিঁপড়াদের কলোনিতে আক্রমণ করে তাদের সৈনিকদের হত্যা করে সেখান থেকে দুর্বল পিঁপড়াদের ডিম ও লার্ভা চুরি করে নিয়ে আসে। ফলে এই ডিম থেকে যে নতুন পিঁপড়া বের হয় তারা নিজেদের এই কলোনির অংশই মনে করে। ফলে নিজেদের বংশের কথা না জেনেই শত্রুদের কলোনিতে দাসত্ব করে যায়।
প্রকৃতির হরর মুভি: জম্বি পিঁপড়া
এত শক্তিশালী কলোনি, শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং নিখুঁত সমাজব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রকৃতির কাছে অসহায় হয়ে যায় পিঁপড়ারা। প্রকৃতির এই ভয়ানক শত্রুর নাম ওর্ফিওকর্ডিসেপস যা এক ধরণের পরজীবি ছত্রাক। এই ছত্রাকের রেনু পিঁপড়ার শরীরে প্রবেশ করে পিঁপড়ার স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে পিঁপড়াটি নিজের কলোনির কথা ভুলে এই ছত্রাকের ইশারায় জম্বির মতো আচরণ করে। আক্রান্ত পিঁপড়াটি নিজের কলোনি ছেড়ে কোন একটি গাছের মগডালে গিয়ে চড়ে বসে। ছত্রাকের ইশারায় এটি নিজের চোয়াল দিয়ে পাতাকে আঁকড়ে ধরে ঝুলে থাকে। এরপর পিপড়াটি সেখানে মারা যায় এবং এর মাথার পিছন দিক থেকে ছত্রাকের একটি লম্বা ডাটা বের হয়। সেই ডাটা থেকে লাখ লাখ নতুন রেণু বাতাসে ভেসে নিচে থাকা সুস্থ পিঁপড়াদের আক্রান্ত করে এবং এদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

ডাইনোসরের যুগ থেকে টিকে থাকা এই ক্ষুদ্র প্রাণী মানবজাতিকে একটি বড় বার্তা দেয়। ছোট বলে কাউকে হেয় করা করা যাবে না তাদের মাঝেও লুকিয়ে থাকে বিস্ময়কর ও রোমাঞ্চকর কিছু জিনিস। এই প্রাণীটি আমাদের শিক্ষা দেয় সুশৃঙ্খলতা,নিয়মানুবর্তিতা ও তীব্র ইচ্ছাশক্তি সম্পর্কে। প্রকৃতির এই ছোট ছোট বিস্ময়কর জিনিসগুলোই প্রমাণ করে যে, স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতিটি প্রাণীরই এই পৃথিবীতে এক অপরিহার্য রহস্যময় ভূমিকা রয়েছে।
