রাতের আকাশে আমরা যখন ঝলমলে তারাগুলো দেখি তখন ভাবতেও পারি না এই নক্ষত্রদের জীবনও একসময় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সেই মৃত্যু কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়। এক বিশাল তারার জীবনাবসান যখন সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটে, তখন তার কেন্দ্রে ঘটে যায় এক মহাজাগতিক রূপান্তর। মাধ্যাকর্ষণের প্রচণ্ড চাপে নক্ষত্রের কেন্দ্রীয় অংশ এতটাই সংকুচিত হয় যে পরমাণুর ভেতরের ইলেকট্রন ও প্রোটন মিলিত হয়ে গঠন করে নিউট্রন। ফলাফল হয় একটি অতি ক্ষুদ্র কিন্তু অবিশ্বাস্য ঘন বস্তু, যার নাম নিউট্রন স্টার।

নিউট্রন স্টার কী

নিউট্রন স্টার হলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে ঘন এবং অদ্ভুত বস্তুগুলোর একটি। এটি সাধারণত সূর্যের প্রায় দেড় থেকে দুই-দুই-দশমিক তিন গুণ বেশি ভরের হলেও ব্যাসমাত্র ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে থাকে। অর্থাৎ পুরো সূর্যের সমান ভর একটি ছোটখাটো শহরের আকারে গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। এই তারার ভেতরে পদার্থ এত ঘন যে এক চামচ পরিমাণ নিউট্রন স্টারের পদার্থ পৃথিবীতে আনলে তার ওজন হবে কয়েকশো কোটি টন (প্রায় ৯০০ কোটি)। এখানে পদার্থ পরমাণু অবস্থায় থাকে না; প্রায় সম্পূর্ণ নিউট্রনের সাগরে রূপান্তরিত হয়।

গঠন ও ভৌত বৈশিষ্ট্য

একটি নিউট্রন স্টারের গঠন অত্যন্ত জটিল। এর বাইরের অংশে থাকে শক্তিশালী ক্রাস্ট যা স্ফটিকসদৃশ পরমাণবিক নিউক্লিয়াসে গঠিত। তার নিচে ঘন হয়ে ওঠে নিউট্রন সমৃদ্ধ স্তর, যেখানে নিউট্রন, প্রোটন ও ইলেকট্রনের মিশ্রণ বিদ্যমান। আর সবচেয়ে গভীরে থাকতে পারে এমন এক অঞ্চল, যেখানে পদার্থের অবস্থা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন সেখানে থাকতে পারে deconfined quark matter  এমন এক অবস্থা যেখানে নিউট্রনের ভেতরের কুয়ার্কগুলো মুক্ত অবস্থায় থাকে। এই deconfined quark matter থাকার ধারণা আধুনিক গবেষণায় অমীমাংসিত; এটি সম্ভাব্য কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

এই তারাগুলোর মাধ্যাকর্ষণ এত প্রবল যে তাদের পৃষ্ঠ থেকে আলোকরশ্মিও প্রায় পালাতে পারে না। নিউট্রন স্টারের ঘূর্ণন অত্যন্ত দ্রুত যা কখনো এক সেকেন্ডে শত শত বার ঘুরতে পারে। সবচেয়ে দ্রুত ঘূর্ণনশীল নিউট্রন স্টার (পালসার PSR J1748-2446ad) প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৭১৬ বার ঘুরে। আর এই দ্রুত ঘূর্ণন ও শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মিলিত প্রভাবে নিউট্রন স্টার থেকে নির্দিষ্ট ব্যবধানে রেডিও বা এক্স-রে তরঙ্গ নির্গত হয়, যাকে আমরা বলি পালসার

নিউট্রন স্টারের চৌম্বক ক্ষেত্র ও পালসার

নিউট্রন স্টারগুলো সাধারণত অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র বহন করে যা প্রতি গস এককে এর মান ১০⁸ থেকে ১০¹² পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু কিছু নিউট্রন স্টার আছে যাদের ক্ষেত্র আরও ভয়ংকর, ১০¹⁵ গস পর্যন্ত পৌঁছে। এগুলোকে বলা হয় ম্যাগনটার। ম্যাগনটার থেকে মাঝে মাঝে প্রবল এক্স-রে বা গামা-রে বিস্ফোরণ দেখা যায়। এই বিস্ফোরণই অনেক সময় ফাস্ট রেডিও বার্স্ট (FRB)-এর কারণ বলে ধারণা করা হয় অর্থাৎ এমন আকস্মিক ও অত্যন্ত তীব্র রেডিও তরঙ্গ, যা কয়েক মিলিসেকেন্ড স্থায়ী হয় কিন্তু সারা গ্যালাক্সি জুড়ে শনাক্ত করা যায়।

২০২০ সালে গ্যালাক্সির ভেতরে অবস্থিত SGR 1935+2154 নামের এক ম্যাগনটার থেকে এমন একটি FRB-সদৃশ সিগন্যাল পাওয়া যায়, যা এই সংযোগকে আরও জোরালো প্রমাণ দিয়েছে। যদিও এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে সব FRB-ই ম্যাগনটার থেকে আসে, তবে এটি বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যা।

ঘনত্ব ও Equation of State (EoS) রহস্য

নিউট্রন স্টারের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক রহস্য হলো এর অভ্যন্তরীণ পদার্থের আচরণ বা Equation of State। এটি আসলে নির্ধারণ করে দেয় কত চাপ দিলে কত ঘনত্বে পদার্থ থাকবে। পৃথিবীতে এমন ঘনত্বের পদার্থ তৈরি করা সম্ভব নয়, তাই নিউট্রন স্টারই হলো একমাত্র প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের চূড়ান্ত সীমা যাচাই করা যায়।

সাম্প্রতিক কালে NASA-এর NICER টেলিস্কোপ এক্স-রে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কয়েকটি নিউট্রন স্টারের ভর ও ব্যাসার্ধ অত্যন্ত নির্ভুলভাবে মাপতে পেরেছে। এই তথ্যগুলো থেকে বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে EoS-এর সীমা নির্ধারণ করতে পারছেন। দেখা গেছে, বেশিরভাগ নিউট্রন স্টারের ব্যাস প্রায় ১২ কিলোমিটার, যা পূর্বানুমানের সঙ্গে মিল রেখেছে। কিন্তু অভ্যন্তরে আসলে কী আছে—নিউট্রন, হাইপেরন না মুক্ত কুয়ার্ক তা এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন।

নিউট্রন স্টার জোড়ার সংঘর্ষ ও গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ

২০১৭ সালে মহাকাশবিজ্ঞান এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। LIGO ও Virgo ডিটেক্টর প্রথমবারের মতো দুইটি নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ থেকে আসা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ শনাক্ত করে, যাকে বলা হয় GW170817। সেই একই ঘটনার পরে পৃথিবীর অসংখ্য টেলিস্কোপ অপটিক্যাল, এক্স-রে ও গামা-রে আলো পর্যবেক্ষণ করে, যার ফলে এই ঘটনা এক ঐতিহাসিক মাল্টিমেসেঞ্জার পর্যবেক্ষণে রূপ নেয়।

এই সংঘর্ষে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের ফলে উৎপন্ন হয় স্বর্ণ, প্লাটিনামসহ নানা ভারী মৌল। অর্থাৎ আমাদের গয়নায় থাকা সোনা একসময় এমন কোনো নিউট্রন স্টার মের্জারের ভেতরেই জন্ম নিয়েছিল! একইসঙ্গে এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে নিউট্রন স্টার কেবল তাত্ত্বিক জটিল বস্তু নয়, এরা মহাবিশ্বের মৌল গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পর্যবেক্ষণ ও সাম্প্রতিক অগ্রগতি

আজকের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা রেডিও টেলিস্কোপ, এক্স-রে অবজারভেটরি এবং গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ডিটেক্টর একত্রে ব্যবহার করে নিউট্রন স্টার নিয়ে গবেষণা করছেন। NICER টেলিস্কোপের তথ্য থেকে জানা গেছে, PSR J0740+6620 নামের একটি পালসারের ভর সূর্যের প্রায় ২.০৮ গুণ, যা এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে ভারী নিউট্রন স্টার। এর ফলে EoS-এর অনেক soft মডেল বাদ পড়ে গেছে, কারণ তারা এত ভারী নিউট্রন স্টার ধারণ করতে পারে না।

অন্যদিকে, Fast Radio Burst পর্যবেক্ষণেও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন রেডিও টেলিস্কোপ (যেমন CHIME ও ASKAP) শত শত FRB শনাক্ত করছে, যাদের কিছু পুনরাবৃত্তি হয়। এসব তথ্য নিউট্রন স্টারের চৌম্বকীয় শক্তি ও বিস্ফোরণ প্রক্রিয়া বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিতর্ক ও খোলা প্রশ্ন

তবুও কিছু প্রশ্ন আজও অনুত্তরিত। নিউট্রন স্টারের কেন্দ্রে আসলে কী ধরনের পদার্থ আছে তা এখনো বিজ্ঞানীদের মাথাব্যথা। কেউ বলেন সেখানে হাইপেরন বা বোজন কনডেনসেট থাকতে পারে, কেউ আবার বলেন নিউট্রনগুলো ভেঙে গিয়ে মুক্ত কুয়ার্কে পরিণত হয়। আবার, নিউট্রন স্টারের সর্বোচ্চ স্থিতিশীল ভর বা TOV সীমা কত তাও পুরোপুরি জানা যায়নি।

এছাড়া মের্জারের পর অবশিষ্ট অবজেক্ট তাৎক্ষণিকভাবে ব্ল্যাক হোল হয় কিনা, নাকি সাময়িকভাবে হাইপারম্যাসিভ নিউট্রন স্টার থেকে ধীরে ধীরে পতিত হয় এ নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতের LIGO, Virgo ও KAGRA পর্যবেক্ষণগুলো হয়তো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারবে।

ভবিষ্যতের গবেষণার দিগন্ত

আগামী দশকে নিউট্রন স্টার গবেষণায় বড় ধরনের অগ্রগতি আশা করা হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের টেলিস্কোপ ও ডিটেক্টর, যেমন LISA (space-based gravitational wave observatory) এবং আরও উন্নত NICER-মিশন, নিউট্রন স্টারের গঠন ও আচরণ সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করবে। একইসঙ্গে রেডিও জ্যোতির্বিদ্যার উন্নতির ফলে আরও বেশি FRB উৎস শনাক্ত করা যাবে, যা এই রহস্যময় সিগন্যালগুলোর প্রকৃতি বোঝাতে সহায়তা করবে।

সর্বশেষ

নিউট্রন স্টার শুধু মহাবিশ্বের এক বিস্ময়কর বস্তু নয়, এটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষাগার। এখানে পদার্থের আচরণ, মাধ্যাকর্ষণের সীমা, এমনকি মৌল গঠনের রহস্যও লুকিয়ে আছে। একদিকে এটি আমাদের শেখায় কীভাবে তারারা জন্ম নেয়, বাঁচে ও মৃত্যুবরণ করে; অন্যদিকে এটি দেখায় মহাবিশ্বের সবচেয়ে চরম অবস্থাতেও পদার্থ কীভাবে টিকে থাকতে পারে।

আজ আমরা জানি, আকাশে ঝলমলে প্রতিটি তারা একদিন হয়তো এমন নিউট্রন স্টারে পরিণত হবে, আর সেই ক্ষুদ্র অথচ অসীম শক্তিশালী অবশেষই হয়তো ভবিষ্যতের জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি হয়ে উঠবে।

তথ্যসূত্র 🙂

তথ্যসুত্রঃ NASA NICER Mission, LIGO-Virgo Collaboration, CHIME/FRB Project, Physical Review D Journal, Astrophysical Journal Letters, Haensel–Potekhin–Yakovlev “Neutron Stars” Monograph, E. Petroff et al. “Fast Radio Bursts at the Dawn of the 2020s”, MDPI Astrophysics Reviews, HEASARC (NASA High Energy Astrophysics Science Archive Research Center

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply