সিনেমা, অ্যাকশন মুভি কিংবা টিভি নাটকে আমরা প্রায়ই এমন দৃশ্য দেখি যেখানে কেউ মাথায় গুলি খেয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, গুলি খাওয়ার পর তার কিছু স্মৃতি মুছে গেলেও সে দিব্যি হাঁটাচলা করছে! বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের কাছে এসব ব্যাপার একটু হাস্যকরই মনে হয় কারণ মাথায় গুলি খেয়ে কেউ বেঁচে থাকতে পারে, এটা কি আদৌ সম্ভব? আশ্চর্য হলেও সত্যি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই—মানে প্রায় ৯৫% সময়ই মাথায় গুলি খেলে মানুষ মারা যায়। তবে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ভাগ্যবান ৫% মানুষ এমনও আছে যারা সত্যিকার অর্থেই এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা থেকে বেঁচে ফিরেছেন।
এমন ঘটনা কেন ঘটে?
এর পেছনে রয়েছে গুলির পদার্থবিজ্ঞান এবং মানবদেহের জৈবিক গঠন। গুলি কোন দিক থেকে এসেছে, কী ধরনের বন্দুক থেকে এসেছে, বুলেটটি কত বড়, কত গতিতে এসেছে, মস্তিষ্কের কোন অংশে লেগেছে—এসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে একজন মানুষ বেঁচে থাকবে, না মারা যাবে। এবার চলুন, বিজ্ঞান দিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি।
কোন জায়গায় গুলি লাগল, সেটাই বাঁচা-মরার বড় ফ্যাক্টর। জীববিজ্ঞানের দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মাথার কোন অংশে গুলি লেগেছে। আমাদের মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর একটি অঙ্গ। এর প্রতিটি ছোট ছোট অঞ্চল আমাদের দেহের নির্দিষ্ট কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণস্বরূপ, মাথার পেছনে থাকা ব্রেইন স্টেম আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দনের মতো অত্যাবশ্যক কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। এই অংশে গুলি লাগলে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু ঘটে।
অন্যদিকে, যদি গুলি আমিগডালা বা হাইপোথ্যালামাস নামক অংশে লাগে, তাহলে স্মৃতিভ্রংশ বা মেমোরি লসের সমস্যা হতে পারে। এটাই সেই স্মৃতিভ্রষ্টতার গল্প যেটা আমাদের টিভি সিরিয়ালে দেখা যায়!

আবার, ফ্রন্টাল লোব যেটা কপালের পেছনে থাকে, এই অংশে গুলি লাগলে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বেশি থাকে। এছাড়া, যদি গুলি সামনে থেকে পিছনে যায়, তাহলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা পাশ থেকে আসা গুলির তুলনায় অনেক বেশি। কারণ সামনের দিক থেকে আসা গুলিতে একটা হেমিস্ফিয়ার (অর্ধাংশ) ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যটা সুরক্ষিত থাকতে পারে।
আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা যমজ ইঞ্জিনের বিমানের মতো—একটা ইঞ্জিন নষ্ট হলেও অন্যটা দিয়ে চালাতে পারে। কাজেই, যদি একটা দিক অক্ষত থাকে, তবে মানুষ কিছুটা ভিন্নভাবে হলেও বেঁচে থাকতে পারে। তবে মানসিক ও শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে যায়।
মাথায় গুলি লাগার পর মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে রক্তক্ষরণ, মস্তিষ্কের ক্ষত নয়। শরীরের অন্য জায়গায় গুলি লাগলে, পাশের টিস্যু গুলি ধাক্কা সামলে কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু খুলি বা স্কাল হলো একধরনের শক্ত, বন্ধ গঠন। গুলি যদি খুব বেশি গতিতে মাথায় লাগে, তাহলে খুলি ভেঙে যায় এবং খণ্ড খণ্ড হাড় ভেতরের দিকে ঢুকে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে।
যদি গুলিটি খুব ছোট এবং উচ্চগতির হয়, তাহলে সেটি মাথার খুলির মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং সোজা না গিয়ে মস্তিষ্কের ভিতরে লাফাতে লাফাতে বা দিক বদল করে ঘুরতে থাকে। এতে একাধিক অংশে ক্ষতি হয়, যার ফলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।
এটা এমন যেন আপনি একটা ছোট্ট বল ছুড়ে মারলেন একটা বন্ধ ঘরের ভেতর, আর সেটা চারপাশের দেয়ালে আছড়ে বারবার দিক বদল করে ঘুরতে থাকলো — ঠিক সেভাবে গুলিটাও খুলির মধ্যে Ricochet করতে পারে।। সুতরাং, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তখনই যখন গুলি ছোট, ধীরগতি সম্পন্ন এবং দূর থেকে ছোঁড়া হয়েছে—সাধারণত লো-ক্যালিবার বন্দুক থেকে।
পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, গুলির গতিশক্তিই মূল ধ্বংসাত্মক উপাদান। আর গতিশক্তি (Kinetic Energy) নির্ণয় করার সূত্র হলো:
KE = ½ × m × v²
এখানে,
KE = গতিশক্তি (Kinetic Energy)
m = গুলির ভর
v = গুলির বেগ
এই সূত্র থেকে দেখা যায়, গুলির ভর দ্বিগুণ হলে শক্তিও দ্বিগুণ হয়। কিন্তু গুলির বেগ দ্বিগুণ হলে শক্তি চারগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, গুলির বেগ ভরের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ধরুন, একটি ভারী গুলি ধীরগতিতে ছোড়া হলো, আর একটি হালকা গুলি খুব দ্রুত ছোড়া হলো। তাহলে দ্বিতীয় গুলির ক্ষতিসাধনের সম্ভাবনা বেশি। উদাহরণ হিসেবে, AK-47 রাইফেলের গুলি অনেক দ্রুত চলে এবং মারাত্মক ক্ষতি করে। আর মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত 5.56 মিমি গুলি তুলনামূলকভাবে হালকা হলেও এত দ্রুত চলে যে মস্তিষ্কের টিস্যু ছিঁড়ে ফেলে।

এখন বেঁচে থাকা সম্ভব কি?
যদিও গুলির আঘাতে বেঁচে থাকা কঠিন, তবুও দ্রুত চিকিৎসা পেলে বেঁচে যেতে পারে। নিউরোসার্জনদের মতে, যদি শ্বাসপ্রশ্বাস চালু থাকে এবং রক্তচাপ হঠাৎ না কমে যায়, তাহলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন গেলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। চিকিৎসকরা দ্রুত মৃত টিস্যু সরিয়ে মস্তিষ্কের ফুলে ওঠা রোধ করার চেষ্টা করেন। অনেক সময় সেই ফুলে ওঠা বাইরে বেরোনোর সুযোগ না পেলে তা নিচের দিকে চাপ সৃষ্টি করে, যার পরিণাম হয় মর্মান্তিক মৃত্যু। একারণে মস্তিষ্ক থেকে তরল বের করে দেওয়ার জন্য ড্রেন বসানো হয়।
একটি বাস্তব কেস স্টাডি: ক্রিস্টেন ম্যাকগিনেস
২০১৬ সালে ‘The Trace’ নামের একটি সংস্থা ক্রিস্টেন ম্যাকগিনেস নামের এক নারীর গল্প প্রকাশ করে, যিনি নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন। ঘটনাটি ঘটে ২০০৯ সালে। সে সময় অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে তিনি চাকরি হারান, প্রিয়জন মারা যান, এমনকি তার পোষা কুকুরটিও মারা যায়। সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছিল, আর মানসিকভাবে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন।

এক রাতে তিনি একটি 0.357 ক্যালিবার রিভলভার নিয়ে নিজের থুতনির নিচে রেখে গুলি চালান। Hollow-point গুলি দিয়ে এমনভাবে গুলি চালানো হয়েছিল যে তা সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর কারণ হওয়ার কথা। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। তার মুখের অনেকটা উড়ে যায়, দাঁত ভেঙে যায়, জিহ্বার এক তৃতীয়াংশ পুড়ে যায় এবং একটি চোখ হারান।
তৎক্ষণাৎ প্রতিবেশীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাকে বহু অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তিনি কয়েক সপ্তাহ অচেতন ছিলেন। মুখের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে তিনি খেতে বা কথা বলতে পারতেন না। কয়েক বছর পর তিনি আবার কথা বলতে পারেন এবং নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, মাথায় গুলি লাগলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, সেটি খুব ভয়ানক অভিজ্ঞতা। তিনি তাঁর দাঁতের অর্ধেক, জিহ্বার এক তৃতীয়াংশ এবং একটি চোখ হারিয়েছেন। তাই গুলি থেকে বাঁচলেও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া কঠিন। এই ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়—আত্মহত্যা নয়, জীবন যত কঠিনই হোক না কেন, সহায়তা নেওয়া ও মনোবল ধরে রাখাই শ্রেয়। একইসঙ্গে, আগ্নেয়াস্ত্রের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ এবং সচেতনতা সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : Science ABC
