শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ স্বপ্নের মানে নিয়ে ভাবছে। প্রাচীন সভ্যতাগুলো বিশ্বাস করত, স্বপ্ন হচ্ছে আমাদের এই পৃথিবীর সঙ্গে দেবতাদের জগতের মাঝে এক ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম। গ্রিক ও রোমানরা তো সরাসরি বিশ্বাস করত, স্বপ্ন আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে, অর্থাৎ স্বপ্নের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
যদিও মানুষের স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা বহু আগ থেকেই ছিল, তবে উনিশ শতকের শেষ দিকেই স্বপ্ন নিয়ে আধুনিক তত্ত্বগুলোর জন্ম হয়, যার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও কার্ল ইয়ুং-এর। ফ্রয়েডের তত্ত্বটি মূলত “repressed longing” বা “চাপা পড়ে থাকা আকাঙ্ক্ষা” ধারণার ওপর ভিত্তি করে গঠিত। তার মতে, আমাদের অবচেতন মনে যে অপূর্ণ বাসনা বা ইচ্ছা থাকে, তা স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কার্ল ইয়ুং, যিনি পড়াশোনা করেছিলেন ফ্রয়েডের অধীনে , তিনিও স্বপ্নের মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্বে বিশ্বাস করতেন, তবে তার ব্যাখ্যা ছিল একেবারে আলাদা ও নিজস্ব।
পরবর্তী সময়ে, বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্ন সম্পর্কে আরও নানা তত্ত্ব গড়ে উঠেছে। একটি উল্লেখযোগ্য নিউরোবায়োলজিকাল তত্ত্ব হলো “activation-synthesis hypothesis”। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, স্বপ্নের আদতে কোনও অর্থ নেই। আমাদের মস্তিষ্ক ঘুমের মধ্যে কিছু বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে, যা আমাদের স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে এলোমেলো ছবি আর চিন্তা টেনে আনে, আর আমরা ঘুম থেকে ওঠার পর নিজেরাই সেই এলোমেলো চিত্রগুলোর মধ্যে গল্প তৈরি করে নিই। অর্থাৎ স্বপ্নটা হয় এলোমেলো, কিন্তু আমরা তাকে অর্থপূর্ণ করে তুলি।
তবে শুধু এটুকু বলেই থেমে থাকেননি গবেষকরা। যেহেতু স্বপ্নে আমরা অনেক সময় খুব বাস্তব অভিজ্ঞতার মতো কিছু দেখি, আর যেহেতু অন্য প্রাণী যেমন বিড়ালদের ঘুমের সময় স্বপ্ন দেখার প্রমাণও পাওয়া গেছে, তাই বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন স্বপ্নের একটি প্রকৃত উপকারিতা আছে। উদাহরণস্বরূপ, “threat simulation theory” নামের একটি তত্ত্ব বলছে, স্বপ্ন আসলে আমাদের মস্তিষ্কের এমন একটি পুরনো প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আমরা বারবার বিভিন্ন বিপজ্জনক পরিস্থিতির অনুশীলন করি, যাতে জেগে থাকাকালীন সময়ে সত্যিকারের বিপদ মোকাবিলায় আমরা আরও দক্ষ হতে পারি।
এইভাবে, বহু বছর ধরে মানুষ স্বপ্নের রহস্য ভেদ করার জন্য বিভিন্ন তত্ত্ব প্রস্তাব করেছে, তবে বাস্তব ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বরাবরই খুব সীমিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা, বিশেষ করে Journal of Neuroscience-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা, স্বপ্ন ও স্মৃতির সম্পর্ক নিয়ে অনেক নতুন তথ্য সামনে এনেছে। রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিস্টিনা মারজানো ও তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করেছেন—আমরা কীভাবে আমাদের স্বপ্নগুলো মনে রাখি।
এই গবেষণার জন্য ৬৫ জন ছাত্রকে দুই রাত গবেষণাগারে ঘুমাতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রথম রাতে, তাদের কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ঘুমোতে দেওয়া হয়, যাতে তারা নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। দ্বিতীয় রাতে, বিজ্ঞানীরা ছাত্রদের ঘুমের সময় তাদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ পরিমাপ করেন। আমাদের মস্তিষ্কে মোট চার ধরনের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ থাকে—ডেল্টা, থিটা, আলফা ও বিটা। এগুলো একসঙ্গে EEG (Electroencephalography) তৈরি করে, যার মাধ্যমে মস্তিষ্কের কাজ পরিমাপ করা হয়।
বিজ্ঞানীরা দেখেন, যেসব ছাত্রদের মস্তিষ্কের সামনের অংশে কম ফ্রিকোয়েন্সির থিটা তরঙ্গ বেশি ছিল, তারাই বেশি স্বপ্ন মনে রাখতে পারছিল। আগেও জানা ছিল, কেউ যদি REM ঘুম (যেখানে সবচেয়ে বেশি স্বপ্ন দেখা হয়) থেকে ঠিক তখনই জাগানো হয়, তবে সে স্বপ্নটা বেশি মনে রাখতে পারে। তবে এই গবেষণাই প্রথম ব্যাখ্যা করে, কেন এমনটা হয়।
এই আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এই থিটা তরঙ্গগুলোর আচরণ আমাদের জেগে থাকা অবস্থায় ব্যক্তিগত স্মৃতি মনে করার সময় যে মস্তিষ্ক তরঙ্গ দেখা যায়, তার মতোই। মানে, আমরা যেমন জেগে থেকে কোনও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা স্মরণ করি, স্বপ্ন মনে রাখার সময়ও আমাদের মস্তিষ্ক একই রকম কাজ করে। এটি প্রমাণ করে যে, স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্ন মনে রাখা, দুটোই আসলে সেই একই নিউরোলজিক্যাল পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল যেটা দিয়ে আমরা স্বাভাবিক অবস্থায় স্মৃতি তৈরি ও মনে করি।
এই একই গবেষণা দল আরেকটি গবেষণায় আধুনিক MRI প্রযুক্তি ব্যবহার করে মস্তিষ্কের গভীর অংশ আর স্বপ্নের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, যে স্বপ্নগুলো সবচেয়ে উজ্জ্বল, অদ্ভুত বা আবেগপূর্ণ হয় (এবং যেগুলো সাধারণত মনে থাকে), সেগুলো মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা ও হিপোক্যাম্পাস নামক অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। অ্যামিগডালা আমাদের আবেগ সংক্রান্ত স্মৃতি প্রক্রিয়াজাত করে, আর হিপোক্যাম্পাস স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি থেকে দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি তৈরিতে কাজ করে। এর মানে দাঁড়ায়, স্বপ্ন শুধু আবেগ প্রকাশ করে না, বরং আবেগযুক্ত অভিজ্ঞতাগুলোর স্মৃতি তৈরি করতেও সহায়তা করে।
অন্য একটি গবেষণায়, ইউসি বার্কলির ম্যাথিউ ওয়াকার দেখান, যদি কারো REM ঘুম কম হয়, তাহলে সে জেগে থাকা অবস্থায় জটিল আবেগ বুঝতে সমস্যা অনুভব করে। অর্থাৎ, স্বপ্ন দেখার অভাব সামাজিক জীবনে আবেগ-সংক্রান্ত দক্ষতা কমিয়ে দিতে পারে।
আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা এখন জানতে পেরেছেন স্বপ্ন আমাদের মস্তিষ্কের কোথা থেকে উৎপন্ন হয়। “Charcot-Wilbrand Syndrome” নামের এক বিরল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বপ্ন দেখতে পারে না। কয়েক বছর আগে, এক রোগী তার স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা হারিয়েছিলেন কিন্তু অন্য কোনও বড় স্নায়ুবিক সমস্যা ছিল না। দেখা গেছে, তার মস্তিষ্কের “right inferior lingual gyrus” অংশে একটি ক্ষত ছিল। এই অংশটি আমাদের মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সে থাকে এবং ছবি দেখা, অনুভূতি আর দৃষ্টিনির্ভর স্মৃতি তৈরিতে সাহায্য করে। এই আবিষ্কার স্বপ্নের উৎপত্তি ও পথ নির্ধারণে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, সাম্প্রতিক এই গবেষণাগুলো আমাদের সামনে স্বপ্নের পেছনের আসল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা দিচ্ছে। স্বপ্ন আমাদের আবেগকে প্রক্রিয়াজাত করে, তার স্মৃতি তৈরি করে এবং সেই স্মৃতিকে মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে বসিয়ে দেয়। স্বপ্নে আমরা যা দেখি, তা বাস্তব নাও হতে পারে, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত আবেগগুলো পুরোপুরি সত্যিকারের। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের মস্তিষ্ক যেন সেই আবেগকে ঘটনাটি থেকে আলাদা করে ফেলে, যেন ভবিষ্যতে সেই আবেগ আর আমাদের মধ্যে সক্রিয় না থাকে। এটি মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যদি আবেগ প্রক্রিয়াজাত না হয়, তাহলে সেটা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘমেয়াদি REM ঘুম থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের মানসিক সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
সবশেষে বলা যায়, স্বপ্ন হলো আমাদের অভিজ্ঞতা, আবেগ আর স্মৃতির মাঝের নাজুক সেতুর ওপর চলাচলের এক প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা—যার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিদিনকার মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখে।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : Scientific American
