ছবিটি আরেকবার ভালো করে দেখুন। নাসার তোলা অন্যান্য ছবির মতো এটিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো উপায় নেই। কারণ, এই ছবিটি শুধুমাত্র একটি মহাকাশের দৃশ্য নয়; এটি মানুষের ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকেই বদলে দিয়েছে।১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাস। জ্যোতির্বিজ্ঞানী বব উইলিয়ামস একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, যা অনেকের কাছে পাগলামি বলে মনে হয়েছিল। হাবল স্পেস টেলিস্কোপকে তিনি আকাশের এমন একটি অংশের দিকে নির্দেশ করার কথা ভাবলেন, যেখানে কিছুই নেই—শূন্য। সেই শূন্যতার দিকে টানা ১০০ ঘণ্টা তাকিয়ে থাকবে টেলিস্কোপ।
এখানে “শূন্য” বলতে এমন একটি আকাশের অংশকে বোঝানো হয়েছে যেখানে কোনো উজ্জ্বল তারকা, গ্রহ, নক্ষত্রপুঞ্জ, বা গ্যালাক্সির কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন নেই। এটি ছিল মহাকাশের একটি এমন অঞ্চল, যা একেবারে অন্ধকার ও নির্জন বলে মনে করা হতো, এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করতেন সেখানে কিছুই থাকার সম্ভাবনা নেই। এই অংশটি এত ছোট ছিল যে এটি আকাশের একটি শস্যদানার সমান জায়গার প্রতিনিধিত্ব করত।
উইলিয়ামসের সহকর্মীরা ব্যাপারটি শুনে তীব্র আপত্তি তুললেন।
“এটা সময়ের অপচয়! এমন মূল্যবান টেলিস্কোপ দিয়ে শূন্যতার দিকে তাকানোর কোনো মানে হয় না। তাছাড়া, দূরের গ্যালাক্সি দেখতে চাওয়া হাস্যকর; আলো আসার সম্ভাবনাও নেই।”
উইলিয়ামস জানতেন, তিনি ঝুঁকি নিচ্ছেন। হাবল টেলিস্কোপের অতীতও খুব একটা ভালো ছিল না। এর শুরুতে ছবিগুলো ঝাপসা আসত। ত্রুটি মেরামতের পর টেলিস্কোপটি তার সুনাম ফিরে পেলেও, একটি ভুল পদক্ষেপ তা আবার ধূলিসাৎ করতে পারে। তবুও তিনি নির্ভীক—“বিজ্ঞান ঝুঁকি নিতে জানে,” বলেছিলেন উইলিয়ামস। তাঁর সুবিধা ছিল, তিনি স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইনস্টিটিউটের পরিচালক। পরিচালকের জন্য বরাদ্দ সময়ের ১০ শতাংশ নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করার ক্ষমতা ছিল তাঁর। অনুমোদন ছাড়াই তিনি পরিকল্পনা কার্যকর করেন।

ডিসেম্বর ১৮ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত হাবল স্পেস টেলিস্কোপ আকাশের একটি ক্ষুদ্র অন্ধকার অংশের দিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে তাকিয়ে থাকে। এটি ছিল বিগ ডিপারের হ্যান্ডেলের পাশে, পূর্ণিমার চাঁদের মাত্র ১/৩০ ভাগ আকৃতির একটি শূন্যস্থান। হাবল সেখানে ৩৪২টি ছবি তোলে। ১৭ দিন পর যখন ছবিগুলো প্রক্রিয়াজাত করে প্রকাশ করা হয়, বিশ্ব এক অভূতপূর্ব বিস্ময়ের মুখোমুখি হয়। শূন্যতার ওই অংশটি আদতে শূন্য নয়। সেখানে ছিল ৩,০০০-এরও বেশি গ্যালাক্সি, যার মধ্যে কিছু ১২ বিলিয়ন বছরের পুরোনো। সর্পিল, উপবৃত্তাকার এবং অনিয়মিত গ্যালাক্সির পাশাপাশি রঙিন আলোতে ঝলমল করা এক মহাবিশ্ব ধরা পড়ে। তরুণ গ্যালাক্সিগুলো ছিল অস্থির, সংঘর্ষময়।
যাঁরা একসময় উইলিয়ামসের এই পরিকল্পনার সমালোচনা করেছিলেন, তাঁরাই পরে প্রশংসায় ভাসান। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, “মহাবিশ্বে গ্যালাক্সির সংখ্যার পূর্বধারণা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে—এখন তা ৫০ বিলিয়নের বেশি।”
উইলিয়ামসের সিদ্ধান্ত শুধু হাবলের সুনামই রক্ষা করেনি, বরং মহাবিশ্বের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। পরবর্তী দশকগুলোতে হাবল আরও গভীর অনুসন্ধানে নামে। আলট্রা ডিপ ফিল্ড, এক্সট্রিম ডিপ ফিল্ড—একের পর এক প্রকল্পে মহাবিশ্বের অসংখ্য গ্যালাক্সি আবিষ্কৃত হয়। নাসার জেনিফার উইজম্যান বলেছিলেন,
“এটি আমাদের নিজেদের ক্ষুদ্রতা এবং মহাবিশ্বের বিশালতার প্রতি বিস্ময় জাগিয়ে তোলে।”
উইলিয়ামসের সেই ১০০ ঘণ্টার সাহসী সিদ্ধান্তই প্রমাণ করেছিল, শূন্যতা বলে আসলে কিছু নেই। মহাবিশ্ব বোধহয় শূন্যতার মাঝেই নিজের গল্প বলে।
লেখক: মোঃ রেদোয়ানুল হক রানা
সূত্র: নাসা, ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
