মানুষের জন্ম, মৃত্যু এবং আত্মার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন চিরকালই মানুষের মনে রহস্যের জন্ম দিয়েছে। আত্মা কী? সেটা কি কোনো বাস্তব কিছুর মতো? নাকি নিছক ধর্মীয় বিশ্বাস? আমরা যখন মৃত্যুর কথা ভাবি তখন একটা গভীর প্রশ্ন আমাদের কুরে কুরে খায় যে মৃত্যুর পর কি কিছু বেঁচে থাকে? আর যদি বেঁচেই থাকে, তবে সেটা কি কোনো বস্তু? ওজন আছে তার? এই রহস্যকে ঘিরেই ১৯০৭ সালে একজন ডাক্তার এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তিনি আত্মার ওজন মাপবেন!
এই গল্প একা আত্মা নিয়ে নয়, এটা এক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের চিন্তা ও চেষ্টার গল্প, যার মধ্যে ছিল অদম্য কৌতূহল কিন্তু গবেষণার ভিত্তি ছিল দুর্বল আর ফলাফল হলো চরম বিতর্কিত। আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি আগের এই ঘটনাটা শুধু এক ব্যর্থ পরীক্ষার প্রমাণ নয়, এটা বিজ্ঞানের সীমানা আর সীমাবদ্ধতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
আত্মার ওজন মাপার অদ্ভুত সিদ্ধান্ত
সময়টা ১৯০৭, এই পরীক্ষা করেছিলেন ডাঃ ডানকান ম্যাকডুগাল নামে একজন আমেরিকান চিকিৎসক। তাঁর ধারণা ছিল যখন একজন মানুষ মারা যায়, তখন তার শরীর থেকে আত্মা বেরিয়ে যায়। আর এই আত্মা যদি বাস্তব কোনো কিছুর মতো হয়, তবে তার ওজন থাকার কথা। আর তাই, তিনি ভাবলেন, মৃত্যুর মুহূর্তে শরীরের ওজন যদি হঠাৎ কমে যায়, তাহলে সেটাই আত্মার ওজন বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।
এই উদ্দেশ্যে তিনি কিছু মুমূর্ষু রোগীর শরীর ওজন করার জন্য একটি বিশেষ ধরনের ওজন মাপার যন্ত্র তৈরি করেন। রোগীরা যখন মারা যেতেন, তখন সেই মুহূর্তে শরীরের ওজনের হঠাৎ পরিবর্তন ঘটছে কি না সেটা তিনি পর্যবেক্ষণ করতেন। তাঁর দাবি ছিল একজন রোগীর ওজন মৃত্যুর পর হঠাৎ করে প্রায় ২১ গ্রাম কমে গিয়েছিল যা তিনি আত্মার ওজন বলে উল্লেখ করেন। এই ২১ গ্রাম পরবর্তী সময়ে নানা সংস্কৃতির কল্পকাহিনি, সিনেমা আর লেখায় বারবার উঠে এসেছে।
পরীক্ষার পদ্ধতির ভুল ও সমালোচনা
তবে ম্যাকডুগালের গবেষণাটা যতটা আকর্ষণীয় শোনায়, বাস্তবে ততটাই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। প্রথমত, তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন মৃত্যুর সঠিক মুহূর্তটা ধরা বা বোঝা খুব কঠিন। কেউ কখন মারা গেলেন, সেটা নিখুঁতভাবে বোঝা খুবই কঠিন একটা কাজ। আর যদি সেই মুহূর্তটা ঠিকমতো চিহ্নিতই করা না যায়, তাহলে তার সাথে ওজন কমার যোগসূত্র খোঁজা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার হলো, মৃত্যুর পর মানুষের শরীরের আচরণ। যখন শরীরের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তখন শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ কিছুটা বেড়ে যায়, কারণ তখন আর রক্তের মাধ্যমে ঠাণ্ডা হওয়া সম্ভব হয় না। এই তাপের কারণে শরীর ঘেমে যায় বা ত্বক থেকে আর্দ্রতা বেরিয়ে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শরীরের ওজন একটু কমে যেতে পারে। তাই ওজন কমার বিষয়টা আত্মার অস্তিত্বের প্রমাণ না হয়ে বরং একটি সাধারণ শারীরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ব্যাখ্যা করা যায়।
কুকুরের উপর পরীক্ষা এবং তারও ব্যর্থতা
ম্যাকডুগাল শুধু মানুষের ওপর নয়, কুকুরের ওপরও এই পরীক্ষা চালান। তাঁর যুক্তি ছিল, যদি কুকুর মারা যাবার পর শরীরের ওজন না কমে, তাহলে বুঝা যাবে যে কুকুরের আত্মা নেই। এবং মানুষ যদি মরে ওজন হারায়, তাহলে বুঝা যাবে মানুষের আত্মা আছে।
কিন্তু এই যুক্তি দিয়েই তো আরও একটা প্রশ্ন উঠে আসে। কুকুরেরা ঘামে না, অন্তত মানুষের মতো নয়। তাদের ঘাম ঝরে শুধু পায়ের পাতার নিচে। ফলে শরীর থেকে আর্দ্রতা কম বের হয়। স্বাভাবিকভাবেই, তাদের মৃত্যুর পর শরীরের ওজন খুব কম পরিমাণে পরিবর্তিত হওয়ার কথা। যদি তেমনটাই হয়, তাহলে সেটা আত্মার অনুপস্থিতির প্রমাণ নয় বরং শরীরের শারীরবৃত্তীয় ব্যবধানের কারণে হতে পারে।
ওজন মাপার যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা
এইসব যুক্তির বাইরেও আরও কিছু বাস্তব সমস্যা ছিল ম্যাকডুগালের পরীক্ষায়। মৃত্যু অনেক সময় ধীরে ঘটে। অনেকে মৃত্যুর আগে শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠেন, কারো শ্বাস ধীরে ধীরে বন্ধ হয়, কেউবা তীব্র যন্ত্রনায় ছটফট করেন। এইসব ছোট ছোট নড়াচড়া ওজন মাপার যন্ত্রকে প্রভাবিত করতেই পারে। ১৯০৭ সালের যন্ত্রগুলো আবার এতটাও সংবেদনশীল ছিল না যে খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরতে পারে। তাই ওজন কমার ঘটনাগুলো হয়তো যন্ত্রের ত্রুটি বা শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়ার ফলও হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের প্রতিক্রিয়া ও ব্যঙ্গাত্মক আচরণ
এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর ডাঃ ম্যাকডুগাল প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েন। তাঁর সহকর্মীরা এবং অন্য বিজ্ঞানীরা তাঁকে নিয়ে মাসের পর মাস ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন। কারণ তাঁর পরীক্ষায় ছিল না পর্যাপ্ত নমুনা, ছিল না সঠিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, এবং সবকিছু মিলিয়ে সেটা একেবারেই অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছিল।
তাঁর পদ্ধতির ওপর ভরসা করার মতো কোনো উপাত্ত বিজ্ঞানসম্মতভাবে দেওয়া যায়নি। আর প্রাণী পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে কুকুর হত্যা করার জন্য তাঁকে কেবল গবেষক বলা যায় না। অনেকে সরাসরি হত্যাকারী সাব্যস্ত করে বলেছিলেন, তিনি আসলে একজন সাধারণ কুকুর হত্যাকারী ছাড়া আর কিছু নন।
বিজ্ঞান কী আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে?
ডাঃ ম্যাকডুগালের এই আত্মা মাপার পরীক্ষা আজ ইতিহাসে ২১ গ্রাম থিওরি নামে পরিচিত হলেও তা বিজ্ঞানের বিচারে এক ব্যর্থ ও ত্রুটিপূর্ণ প্রচেষ্টা। এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে বিজ্ঞান কৌতূহলের চেয়ে বড় আর সত্যের পথ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। আমরা বিশ্বাস করতে পারি অনেক কিছু কিন্তু প্রমাণ ছাড়া বিজ্ঞান কোনো বিশ্বাসকে সত্য বলে ধরে নেয় না।
আজও আত্মার অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক চলছেই। কেউ বলেন আত্মা একধরনের শক্তি, কেউ বলেন সেটা কেবল ধর্মীয় ভাবনা। কিন্তু বিজ্ঞান এখনও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায়নি। তাই আত্মার ওজন মাপতে গেলে শুধু ইচ্ছা নয়, প্রয়োজন কঠোর বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি, প্রযুক্তি ও বিশ্লেষণ।
ডাঃ ম্যাকডুগাল আমাদের দেখিয়ে দিয়েছিলেন—ভুল পথে হাঁটলে কৌতূহল থেকেও বের হয় বিভ্রান্তি। আত্মার ওজন নেই, কিন্তু সত্যকে জানার চেষ্টার ওজন অনেক। সে চেষ্টাটা বিজ্ঞান সম্মত হলেই কেবল তা আমাদের সত্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : IFL Science
