সৃষ্টিজগতের এক বিস্ময়কর জটিল প্রক্রিয়া হলো নিষেক বা fertilization. আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ভ্রূণতত্ত্ব বা Embryology দীর্ঘ প্রচেষ্টায় আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন কিভাবে নিষেকের জন্য শুক্রাণু ডিম্বাণুর কাছে যায় এবং আমাদের মতো চোখ না থাকার পরও কিভাবে সে পথ খুঁজে পায়। আজকের লেখায় আমরা শুক্রাণুর এই রহস্যময় যাত্রার আদ্যোপান্ত জানব।
শুক্রাণু কিভাবে ডিম্বাণুর অবস্থান চিহ্নিত করে?
অন্ধকার জরায়ুর অভ্যন্তরে শুক্রাণুর কোনো চোখ না থাকলেও বিজ্ঞানীদের মতে ডিম্বাণুর উপস্থিতি ও অবস্থান শনাক্ত করার জন্য শুক্রাণু মূলত ৩ টি প্রধান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা সংকেত ব্যবহার করে।
Chemotaxis
ডিম্বাণু এবং তাকে ঘিরে থাকা follicle কোষগুলো থেকে Progesterone হরমোনসহ কিছু বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয় যার একটি নির্দিষ্ট ঘ্রাণ বা সংকেত থাকে। শুক্রাণুর মাথায় থাকা বিশেষ receptors এই রাসায়নিক পদার্থগুলির উপস্থিতি টের পায় এবং ঘ্রাণ অনুসরণ করে শুক্রাণু বুঝতে পারে ডিম্বাণু ঠিক কোন দিকে আছে এবং সেদিকেই এগোতে থাকে।
Thermotaxis
নারী প্রজননতন্ত্রের ভেতরে Fallopian Tube এর ভেতরের দিকের তাপমাত্রা প্রবেশপথের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকে সাধারণত ১° থেকে ২° সেলসিয়াসের পার্থক্য কিন্তু শুক্রাণু অত্যন্ত তাপমাত্রা সংবেদনশীল হওয়ায় কম তাপমাত্রার অঞ্চল থেকে বেশি তাপমাত্রার অঞ্চলের দিকে সাতার কাটে যা তাদের সরাসরি ডিম্বাণুর দিকে নিয়ে যায়।
Rheotaxis
Fallopian Tube এর ভেতরে এক ধরণের তরলের মৃদু স্রোত জরায়ুর দিকে প্রবাহিত হয়। শুক্রাণু এই স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার প্রবৃত্তি ধারণ করে। ঠিক যেভাবে নদীর স্রোতের বিপরীতে মাছ এগিয়ে যায় শুক্রাণুও তেমন তরলের স্রোত ঠেলে ডিম্বাণুর দিকে ছুটে চলে।
কিন্তু শুক্রাণু চলে কিভাবে?

শুক্রাণুর লেজ বা Flagellum একটি Propeller এর মতো কাজ করে। এর গোঁড়ায় থাকা mitochondria থেকে শুক্রাণু দ্রুত চলার সকল শক্তি পায়। শুক্রাণু এই লেজ চাবুকের মতো নড়াচড়া করে শুক্রাণুকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়। জরায়ুর ভেতরের তরলের সংস্পর্শে এসে শুক্রাণুর মাথার ওপরের চর্বির স্তরটি ধুয়ে যায় এবং এর লেজের নড়াচড়া সাধারণ সাঁতার থেকে Hyperactivation এ রূপ নেয়। অর্থাৎ Propeller টি তখন সাধারণ গতির চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী এবং অনিয়মিতভাবে দুলতে শুরু করে। এই তীব্র গতিই শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর আঠালো প্রাচীর ভেদ করার চূড়ান্ত শক্তি জোগায়। জরায়ুর ভেতরে শুক্রাণুর গতির এই পরিবর্তনকে Capacitation বলে।
এবার নিষিক্তকরণের পালা!
Fallopian Tube এ এসে যখন সফল শুক্রাণুগুলো ডিম্বাণুর দেখা পায় তখন শুরু হয় নিষিদ্ধকরণের কাজ। এক্ষেত্রে কয়েকটি ধাপে শুক্রাণু নিষিদ্ধকরণ সম্পন্ন করে।
i. Zona Pellucida ভেদ –
ডিম্বাণুর চারপাশে একটি শক্ত প্রতিরক্ষামূলক আবরণ থাকে যাকে Zona Pellucida বলে। শুক্রাণুর মাথায় থাকা Acrosome নামক একটি থলিতে থাকে বিভিন্ন শক্তিশালী এনজাইম যেমন Hyaluronidase. শুক্রাণু ডিম্বাণুকে স্পর্শ করামাত্র এই এনজাইম মুক্ত হয় এবং ডিম্বাণুর শক্ত দেয়ালটি গলিয়ে ভেতরে ঢোকার রাস্তা তৈরি করে।
ডিম্বাণু ভেদের মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে calciuam আয়ন । আর এই calcium এর মাত্রা ও শুক্রাণুর Hyperactivation নিয়ন্ত্রণ করে শুক্রাণুর ঝিল্লিতে থাকা PMCA (Plasma Membrane Ca2+ – ATPase) নামক একটি বিশেষ পাম্প বা protein. ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছানোর পর PMCA এর কার্যকারিতার ফলেই শুক্রাণুর ভেতরে Calcium Influx ঘটে এবং হঠাৎ calcium বেড়ে যায় যা মূলত Acrosome থলিটিকে ফাটতে এবং এনজাইম নিঃসৃত করতে সংকেত দেয়। PMCA প্রোটিন ঠিকমতো কাজ না করলে শুক্রাণু ডিম্বাণুর প্রাচীর ভেদ করতে ব্যর্থ হয়।
ii. Cortical reaction –
যেই মুহূর্তে প্রথম ভাগ্যবান শুক্রাণুটি ডিম্বাণুর plasma membrane স্পর্শ করে ডিম্বাণুর ভেতরে একটি electric ও chemical পরিবর্তন ঘটে যাকে Cortical Reaction বলে। ফলে ডিম্বাণুর বাইরের দেয়ালটি তাৎক্ষণিকভাবে এত শক্ত হয়ে যায় যে অন্য কোনো শুক্রাণু আর ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। এটি নিশ্চিত করে যে কেবল একটি শুক্রাণুই ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করবে। তবে মাঝে মাঝে ব্যাতিক্রমও হয় তাই আমরা জমজ শিশু দেখতে পাই।
iii. DNA combining –
ভেতরে প্রবেশের পর শুক্রাণুর লেজটি খসে পড়ে এবং এর ভেতরে থাকা ২৩ টি chromosome ডিম্বাণুর ২৩টি chromosome এর সাথে যুক্ত হয়ে যায়।ফলে তৈরি হয় ৪৬টি chromosome বিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ কোষ যাকে বলা হয় Zygote। এভাবেই সম্পন্ন হয় নিষেকের অলৌকিক প্রক্রিয়া যা থেকে পরবর্তী ৯ – ১০ মাসে একটি মানব শিশুর জন্ম হয়।
তাহলে সব শুক্রাণু ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে পারে না কেনো? বাকি থাকা শুক্রাণুগুলি কোথায় যায়?

যৌন মিলনের সময় জরায়ুর মুখে বা Cervix এ প্রায় ১০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন শুক্রাণু মুক্ত হয়। কিন্তু নিষিক্ত হয় একটাই কারণ প্রকৃতিগতভাবেই মানুষের প্রজনন প্রক্রিয়ায় এমন কিছু বাধা বা filter set করা আছে যাতে কেবল সবচেয়ে সুস্থ ও শক্তিশালী শুক্রাণুটিই ডিম্বাণু পর্যন্ত পৌঁছাতে এবং তাকে নিষিক্ত করতে পারে।
কোনো শুক্রাণু একা Zona Pellucida প্রাচীর সম্পূর্ণ গলাতে পারে না। শত শত শুক্রাণু একসাথে তাদের Acrosome থেকে Hyaluronidase এনজাইম নিঃসরণ করে ডিম্বাণুর দেয়ালটিকে দুর্বল করে এবং যৌথ আক্রমণের ফলে যখন দেয়ালে একটি ছোট্ট পথ তৈরি হয় তখন সবচেয়ে গতিশীল এবং নিখুঁত শুক্রাণুটি সবার আগে ভেতরে ঢুকে পড়ে। কোনোভাবে যদি একটির বেশি শুক্রাণু যদি ডিম্বাণুর ভেতরে ঢুকে যায় তাকে বিজ্ঞানের ভাষায় Polyspermy বলে। এমনটা হলে অতিরিক্ত chromosome এর কারণে zygote টি নষ্ট হয়ে যায় এবং কোনো ভ্রূণ তৈরি হয় না। তাই প্রকৃতি এটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।
প্রথম শুক্রাণু ডিম্বাণুতে প্রবেশের পর যখন Zona Pellucida শক্ত হয়ে বন্ধ হয়ে যায় তখন বাকি কোটি কোটি শুক্রাণুগুলোকে জরায়ুর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য থাকা White Blood Cells বা Macrophages বহিরাগত বস্তু বা Foreign Body হিসেবে চিহ্নিত করে এবং শুক্রাণুগুলোকে গ্রাস করে বা খেয়ে ফেলে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। আবার অনেক শুক্রাণু জরায়ু বা Fallopian Tube এর দেয়ালে আটকে মারা যায় এবং পরবর্তীতে নারীর যোনিপথের স্বাভাবিক তরল বা Vaginal Discharge সাথে শরীর থেকে প্রাকৃতিকভাবেই বাইরে বের হয়ে যায়।
এছাড়াও নারীর শরীরের ভেতরে শুক্রাণু সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়ে যাওয়ার পর যে শুক্রাণুগুলো Fallopian Tube এ বা জরায়ুতে ঘুরে বেড়ায় তারা শক্তির অভাবে কয়েকদিনের মধ্যে এমনিতেই মারা যায় এবং শরীরের ভেতরেই দ্রবীভূত বা Absorbed হয়ে যায়।
এভাবেই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র শুক্রাণু ও ডিম্বাণু থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ মানব শিশুর জন্ম হয়। যা আমাদের আবারও স্মরণ করায় সৃষ্টির বিস্ময় ও রহস্য কত গভীর।

This article answered many of my questions. Thank you! 🌸
Thanks for making complex topics easy to understand. 🌷
Thank you for writing this article🖤