পিরিয়ড আমাদের নারীদের জীবনের এমন এক নিয়মিত অধ্যায়, যেখানে সুস্থ ও সুরক্ষিত থাকতে সঠিক স্যানিটারি পণ্য নির্বাচন এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে নারীদের পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় পরিবর্তন এসেছে। এক সময়কার কাপড়ের ব্যবহার পেরিয়ে আমরা প্যাডে অভ্যস্ত হয়েছি এবং আর এখন ট্রেন্ড চলছে মেনস্ট্রুয়াল কাপের। কিন্তু এই দুটির মধ্যে কোনটি আসলে সেরা, চলুন সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

যুগ যুগ ধরে বিশ্বস্ত মাধ্যম হিসেবে আমরা স্যানিটারি প্যাডকে চিনি। আমাদের দেশে পিরিয়ড বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্যানিটারি প্যাডের ছবি, তবে এই প্যাড ব্যবহারের সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে।
সুবিধার কথা বলতে গেলে, শহর থেকে শুরু করে গ্রামের যেকোনো মুদি দোকান বা ফার্মেসিতে এটি খুব সহজেই কিনতে পাওয়া যায়। বয়ঃসন্ধিকালের তরুণী বা যারা জীবনে প্রথমবার পিরিয়ডের মুখোমুখি হচ্ছে, তাদের জন্য এটি মানসিকভাবে সবচেয়ে আরামদায়ক এবং নিরাপদ অপশন। তাছাড়া এটি শরীরের ভেতরে প্রবেশ করাতে হয় না, তাই রক্ত সরাসরি স্পর্শ করার কোনো ব্যাপার থাকে না এবং পরিবর্তন করার সময়ও সহজে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যায়। পিরিয়ডের ফ্লো অনুযায়ী বাজারে বিভিন্ন সাইজের, যেমন রেগুলার, এক্সট্রা লার্জ বা ওভারনাইট প্যাড পাওয়া যায়, যা প্রয়োজনমতো বেছে নেওয়া সম্ভব।

তবে এর কিছু অসুবিধাও রয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রতি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পর পর প্যাড পরিবর্তন করতে হয়। দীর্ঘসময় একই প্যাড ব্যবহার করলে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি, ত্বকের জ্বালা, দুর্গন্ধ এবং যোনিপথে সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে। বেশিরভাগ বাণিজ্যিক প্যাডেই সুগন্ধি, প্লাস্টিক ও ব্লিচিং কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়, যার ফলে সংবেদনশীল ত্বকে ঘর্ষণ লেগে র্যাশ, চুলকানি বা অ্যালার্জি হতে পারে। রক্তের সাথে বাতাসের অক্সিজেন এবং প্যাডের কেমিক্যালের বিক্রিয়ায় পিরিয়ডের দিনগুলোতে একধরণের অস্বস্তিকর দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে।
অতিরিক্ত ফ্লো বা ভারী রক্তপাতের দিনগুলোতে প্যাড দ্রুত ভিজে গিয়ে কাপড়ে দাগ লেগে যাওয়ার বা লিক করার ভয় থাকে। তাছাড়া এটি পরলে একটু ভেজা ও ভারী ভাব অনুভূত হয়, যা চলাফেরায় অস্বস্তি বাড়ায়। সবচেয়ে বড় কথা, স্যানিটারি প্যাডগুলো ওয়ান টাইম বা একবার ব্যবহারযোগ্য এবং এগুলোতে প্রচুর প্লাস্টিক থাকে। এগুলো মাটিতে মিশে যেতে বা পচতে প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ বছর সময় নেয়, যা পরিবেশের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর।
অন্যদিকে, মেনস্ট্রুয়াল কাপ হলো পিরিয়ডকালীন সুরক্ষায় ব্যবহৃত মেডিকেল গ্রেড সিলিকন দিয়ে তৈরি একটি ছোট, নরম এবং ফানেল আকৃতির কাপ। এটি স্যানিটারি প্যাডের মতো রক্ত শোষণ করে না, বরং যোনিপথের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে রাখার পর পিরিয়ডের রক্ত জমা করে রাখে। নির্দিষ্ট সময় পর, সাধারণত ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর, কাপটি বের করে রক্ত ফেলে দিয়ে, ধুয়ে আবার ব্যবহার করা যায়। ব্র্যান্ডভেদে বেশিরভাগ মানসম্মত মেনস্ট্রুয়াল কাপ প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যেতে পারে।
মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহারের নিয়ম :
মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহারের নিয়মটি তিনটি ধাপে বিভক্ত –
১.ব্যবহারের আগে :
পিরিয়ডের শুরুতে প্রথমবার কাপটি ব্যবহারের আগে ফুটন্ত গরম পানিতে ৪-৫ মিনিট ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে এবং প্রতিবার কাপ ধরার আগে নিজের হাত সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া জরুরি।
২.ভেতরে প্রবেশ করানো :
কাপটি সহজে ভেতরে প্রবেশ করানোর জন্য এর মুখটিকে চেপে ইংরেজি ‘C’ অক্ষরের মতো করতে হয় অথবা একপাশ আঙুল দিয়ে ভেতরের দিকে নামিয়ে ছোট করে ভাঁজ করতে হয়।কমফোর্টেবল পজিশনে বসে বা দাঁড়িয়ে ভাঁজ করা কাপটি আলতো করে যোনিপথে পুশ করতে হয় যা ভেতরে গিয়ে নিজে নিজেই গোল হয়ে খুলে যায় এবং একটি বাতাসহীন লক তৈরি করে লিকেজ আটকায়।
৩.বের করা :
ফ্লো অনুযায়ী ৮-১২ ঘণ্টা পর কাপের নিচের অংশটি আঙুল দিয়ে সামান্য চেপে ভেতরের লকটি ভেঙে আলতো করে নিচে টেনে বের করতে হবে এবং ভেতরের রক্ত ফেলে সাধারণ পানি দিয়ে ধুয়ে এটি আবার পরা যাবে।
সংরক্ষণ করবেন কিভাবে :
পিরিয়ডের দিনগুলো শেষ হয়ে গেলে কাপটি শেষবারের মতো গরম পানিতে ফুটিয়ে শুকিয়ে নিতে হবে এবং প্লাস্টিকের বক্স এড়িয়ে কাপের সাথে থাকা সুতি কাপড়ের ব্যাগে সংরক্ষণ করতে হবে।তবে কাপ পরিষ্কার করার সময় কখনোই সাধারণ সুগন্ধি সাবান, ডেটল, স্যাভলন বা হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহার করবেন না। এতে সিলিকন নষ্ট হতে পারে এবং জরায়ুতে ইনফেকশন হতে পারে। কাপ ধোয়ার জন্য শুধু পরিষ্কার পানি অথবা বাজারে পাওয়া যাওয়া বিশেষ কাপ ওয়াশ ব্যবহার করবেন।
মেন্স্ট্রুয়াল কাপ নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা ও তার সঠিক ব্যাখ্যা :
সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো এটি ব্যবহারে যোনিপথ ঢিলা হয়ে যেতে পারে অথবা কুমারী মেয়েদের সতীচ্ছদ বা হাইমেন নষ্ট হয়ে কুমারীত্ব চলে যাবে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল। হাইমেন হলো যোনিপথের মুখে থাকা একটি অত্যন্ত পাতলা ও ইলাস্টিক পর্দা যা শুধু শারীরিক সম্পর্ক নয়, বরং সাইকেল চালানো, খেলাধুলা, নাচ বা স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধির কারণেও নিজ থেকে প্রসারিত বা ছিঁড়ে যেতে পারে। মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহারে হাইমেন প্রসারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তবে হাইমেনের অবস্থা দিয়ে কারও কুমারীত্ব নির্ধারণ করা যায় না।
অনেকে মনে করেন এটি ব্যবহারে জরায়ুর ভেতরে ইনফেকশন বা বড় কোনো রোগ হতে পারে। কিন্তু কাপ রক্ত শোষণ না করে কেবল জমা রাখে এবং মেডিকেল গ্রেড সিলিকনের মসৃণ পৃষ্ঠ পরিষ্কার রাখা সহজ বলে সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিষ্কার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি উল্টো কম থাকে। অনেকের মতে এটি পরলে ভেতরে তীব্র ব্যথা, চুলকানি বা মারাত্মক অস্বস্তি হয়। কিন্তু মেনস্ট্রুয়াল কাপগুলো শতভাগ হাইপোঅ্যালার্জেনিক মেডিকেল গ্রেড সিলিকন দিয়ে তৈরি যা শরীরের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। সঠিক নিয়মে ভাঁজ করে ভেতরে দেওয়ার পর এটি যখন পজিশন মতো সেট হয়ে যায়, তখন ভেতরে কিছু আছে বলে বোঝাই যায় না। শুরুতে এক থেকে দুই মাস একটু নতুন বা অদ্ভুত লাগলেও অভ্যস্ত হয়ে গেলে এটি প্যাডের চেয়েও অনেক বেশি আরামদায়ক ও চুলকানিযুক্ত র্যাশ থেকে মুক্তি দেয়।
কার জন্য কোনটি পারফেক্ট?
যারা কুমারী বা অবিবাহিত, তারা মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহারে প্রথম দিকে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতে পারেন যদিও এটি চিকিৎসাগতভাবে সম্পূর্ণ নিরাপদ। তাই নতুন ব্যবহারকারীরা চাইলে প্যাড দিয়ে শুরু করতে পারেন অথবা নিজের শারীরিক গঠন অনুযায়ী উপযুক্ত সাইজের কাপ বেছে নিতে পারেন।যারা কর্মজীবী নারী, ক্রীড়াবিদ বা সারাদিন বাইরে থাকেন, তাদের জন্য দীর্ঘসময় নিশ্চিন্ত থাকতে কাপ একটি দারুণ সমাধান।
মেনস্ট্রুয়াল কাপ কারা ব্যবহার করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
১. যাদের পেলভিক অর্গান প্রোলাপ্স আছে।
২. যাদের সম্প্রতি স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত অস্ত্রোপচার হয়েছে।
৩. যাদের IUD (Copper-T বা Hormonal IUD) আছে, তাদের কাপ ব্যবহারের সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
৪. যাদের যোনিপথে তীব্র ব্যথা বা অজানা সমস্যা রয়েছে।
প্যাড বনাম কাপ কোনটি তুলনামূলক ভালো?
১.খরচের হিসাব করলে প্যাডে প্রতি মাসে নিয়মিত খরচ হয়। কাপে একবার ইনভেস্ট করলে কয়েক বছর আর খরচ নেই।
২.সঠিক মাপের কাপ ভেতরে থাকলে বোঝাই যায় না যে পিরিয়ড চলছে, সাঁতার কাটা বা ব্যায়ামও করা যায়। প্যাডে কিছুটা ভেজা বা ভারী ভাব থাকে।
৩.প্যাড ওয়ান টাইম ইউজেবল কিন্তু কাপ রিইউজেবল।সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে চাইলে অনায়েসেই ৫-১০ বছর ব্যবহার করতে পারবেন
বিশেষ সতর্কবার্তা :
খুব বিরল ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় একই মাসিক পণ্য ব্যবহার বা স্বাস্থ্যবিধি না মানলে টক্সিক শক সিনড্রোম (TSS) নামক গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।টক্সিক শক সিনড্রোম হলো কিছু নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার (বিশেষ করে Staphylococcus aureus এবং Streptococcus pyogenes) উৎপন্ন বিষাক্ত পদার্থ বা টক্সিনের কারণে হওয়া একটি বিরল কিন্তু গুরুতর অসুস্থতা। এটি খুব দ্রুত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ উচ্চ জ্বর, মাথা ঘোরা, বমি, ডায়রিয়া, শরীরে রোদে পোড়া মতো লালচে র্যাশ, পেশিতে ব্যথা এবং রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখা, প্যাড বা কাপ নির্ধারিত সময় পরপর পরিবর্তন বা পরিষ্কার করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এর ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্যানিটারি প্যাড ও মেনস্ট্রুয়াল কাপ দুটিই নিরাপদ। প্যাড বা কাপ , কোনটি সেরা তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, শরীরের গঠন ,বাজেট এবং জীবনযাত্রার ওপর। আপনি যদি পরিবেশের কথা ভাবেন এবং বারবার প্যাড বদলানোর ঝামেলা থেকে মুক্তি চান, তবে একবার মেনস্ট্রুয়াল কাপ ট্রাই করে দেখতে পারেন। তবে যেকোনো পদ্ধতি বেছে নেওয়ার আগে নিজের শরীরের আরাম ও হাইজিনকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেবেন।
