বিজ্ঞানের দুনিয়ায় কিছু প্রশ্ন আছে যেগুলো দশকের পর দশক ধরে পদার্থবিদদের ঘুম নষ্ট করে রেখেছে। Black hole এ যদি কিছু পড়ে যায়, সেই তথ্য কি চিরতরে হারিয়ে যায়? স্টিফেন হকিং নিজেই এই প্রশ্নটা তুলেছিলেন, আর সেটা সমাধান করতে গিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের দুটো বিশাল স্তম্ভ একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এখন একটি নতুন গবেষণা বলছে এই সমস্যার সমাধান হয়তো আছে, তবে শর্ত একটাই, মহাবিশ্বকে হতে হবে সাত মাত্রার বা Seven dimensional.
হকিং বিকিরণ ও তথ্য হারানোর সমস্যা
Black hole নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা প্রচলিত ধারণা আছে যে এটা সব কিছু গিলে ফেলে, তবে কিছুই বের হয় না। এই ধারণাটা মোটামুটি ঠিকই আছে, তবে পুরোপুরি না। ১৯৭০ এর দশকে হকিং একটি ইন্টারেস্টিং তত্ত্ব দিয়েছিলেন, black hole আসলে ধীরে ধীরে বিকিরণ ছাড়ে এবং সময়ের সাথে সংকুচিত হতে হতে একসময় সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায়। এই বিকিরণকে বলা হয় Hawking Radiation। কিন্তু এই তত্ত্বটাই একটা বড় সমস্যা তৈরি করে।

মূলত Quantum Mechanics এর একটি মৌলিক নিয়ম আছে যা বলে মহাবিশ্বের কোনো তথ্য কখনো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয় না (উল্লেখ্য, এখানে তথ্য বলতে শুধু লেখা বা ছবি বোঝানো হচ্ছে না)।
Quantum Mechanics এর ভাষায় প্রতিটি কণার অবস্থান, গতি, শক্তি, এই সব কিছুই তথ্য। গবেষণাটির সহ-লেখক Slovak Academy of Sciences এর Richard Pinčák একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন।
ধরুন একটা বই আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। বইটা দেখতে আর পাওয়া যাবে না, কিন্তু সেই বইয়ের প্রতিটি অক্ষরের তথ্য ধোঁয়া, ছাই আর তাপের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে এখনো আছে। যথেষ্ট জ্ঞান থাকলে তাত্ত্বিকভাবে সেই তথ্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
কিন্তু হকিংয়ের তত্ত্ব অনুযায়ী যদি black hole সম্পূর্ণ বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যায়, তাহলে তার ভেতরে যা কিছু পড়েছিল সেই সব তথ্য চিরতরে হারিয়ে যায়। এবং এটা Quantum Mechanics এর সেই মৌলিক নিয়মকে সরাসরি লঙ্ঘন করে। এই দ্বন্দ্বটাকেই বলা হয় Information Loss Paradox.

নতুন গবেষণা কী বলছে?
২০২৫ সালের মার্চ মাসে General Relativity and Gravitation জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণা বলছে black hole আসলে সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায় না, বরং একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র অবশিষ্ট রেখে যায় যার মধ্যে সব তথ্য সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাটা সত্যি হতে হলে মহাবিশ্বকে সাত মাত্রার বা Seven Dimensional হতে হবে।
আমরা তিনটি মাত্রায় (Three Dimension) বাস করি— দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা। আইনস্টাইনের তত্ত্বে সময়কে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে যোগ করা হয়েছিল। কিন্তু এই নতুন গবেষণা বলছে এর বাইরেও আরো তিনটি মাত্রা আছে যেগুলো এত ছোট আকারে পেঁচিয়ে আছে যে আমরা কখনো সেগুলো অনুভব করতে পারি না। Pinčák এটা বোঝাতে origami এর উদাহরণ দিয়েছেন।
কাগজ ভাঁজ করলে সেটা দেখতে ভিন্ন হয়ে যায়, ভেতরে নতুন গঠন তৈরি হয়।
এই লুকানো তিনটি মাত্রাও ঠিক তেমনি একটি বিশেষ গাণিতিক কাঠামোয় ভাঁজ হয়ে আছে যেটাকে বলা হয় G₂ Geometry।G₂ আসলে একটি গাণিতিক প্রতিসাম্য গোষ্ঠীর নাম যা বলে এই লুকানো মাত্রাগুলো কোন নিয়ম মেনে ভাঁজ হয়েছে। এই কাঠামো String Theory এর উন্নত সংস্করণ M-theory তে বিস্তারিত আলোচিত হয়।
স্থান-কালের মোচড় এবং ক্ষুদ্র অবশিষ্টের রহস্য
এই লুকানো মাত্রার ভাঁজ থেকে একটি বিশেষ ভৌত প্রভাব তৈরি হয় যার নাম Torsion। সহজ বাংলায় এটাকে বলা যায় স্থান-কালের মোচড়। আরও একটু বিস্তারিত বললে, সাধারণত আমরা স্থান-কালকে একটি সমতল বা বাঁকানো চাদরের মতো ভাবি। কিন্তু Torsion হলো সেই চাদরটা যখন শুধু বাঁকে না, পেঁচিয়েও যায়। এই পেঁচানোর কারণে একটি বিকর্ষণ শক্তি তৈরি হয়, অনেকটা চুম্বকের একই মেরু যেভাবে পরস্পরকে ঠেলে দেয় সেরকম। Black hole যখন Hawking Radiation ছাড়তে ছাড়তে ক্রমশ ছোট হতে থাকে, তখন এক পর্যায়ে এই Torsion এর বিকর্ষণ শক্তি এত বেশি হয়ে যায় যে সে আর সংকুচিত হতে পারে না। এটা একটা ব্রেকের মতো কাজ করে। Black hole তখন সম্পূর্ণ মিলিয়ে না গিয়ে একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিন্তু স্থিতিশীল অবশিষ্টে পরিণত হয়।

এই অবশিষ্টের ভর কতটুকু সেটা শুনলে আশ্চর্য হবেন। এটি প্রায় 9×10-41 কিলোগ্রাম, যা একটি electron এর চেয়েও দশ বিলিয়ন গুণ হালকা। এই ক্ষুদ্র অবশিষ্টের মধ্যে black hole এ পড়া সব তথ্য Quasinormal Modes (Hyperlink) নামক এক ধরনের কম্পনের মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকে।
কণার ভরের উৎস এবং হিগস মেকানিজম
এই গবেষণার সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং দিক হলো এটি শুধু black hole এর সমস্যা সমাধান করে না, কণাপদার্থবিজ্ঞানের (Particle physics) একটি বিখ্যাত ঘটনার সাথেও মিলে যায়। Torsion field যে শক্তির পরিবেশ তৈরি করে সেটা Higgs Mechanism এর সাথে মিলে যায়।
Higgs Mechanism হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে electron বা quark এর মতো মৌলিক কণাগুলো ভর পায়।
এটাকে এভাবে ভাবা যায়, কল্পনা করুন একটি পুকুরে কেউ হেঁটে যাচ্ছে। তবে পানির বাধার কারণে তার হাঁটা ধীর হয়ে যায়, মানে সে একটা কার্যকর ভর অনুভব করছে। Higgs field ও ঠিক তেমনি কণাদের বাধা দিয়ে তাদের ভর দেয়।

এই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে Torsion থেকে তৈরি শক্তির কাঠামো হুবহু সেই একই রকম। মানে একই তত্ত্ব একইসাথে black hole এর আচরণ আর কণাদের ভরের উৎস দুটোই ব্যাখ্যা করছে, যেটা পদার্থবিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মিল।
সীমাবদ্ধতা ও পরোক্ষ পরীক্ষা
সত্যি বললে, এই তত্ত্ব সরাসরি পরীক্ষা করা এখনো অসম্ভব। কারণ এই তত্ত্বে যেসব শক্তির মাত্রার কথা বলা হয়েছে সেগুলো বর্তমান particle accelerator এর সাধ্যের বাইরে। গবেষণা অনুযায়ী এই লুকানো মাত্রার সাথে সম্পর্কিত Kaluza-Klein কণাগুলোর ভর হওয়া উচিত প্রায় 1016 GeV, যা পরিচিত সবচেয়ে ভারী কণা top quark এর চেয়ে ১৪ গুণ মাত্রা বেশি ভারী।
Kaluza-Klein কণা হলো সেই কণা যেগুলো তৈরি হয় যখন কোনো কণা এই লুকানো মাত্রাগুলোতে কম্পিত হয়, অনেকটা একটি বদ্ধ ঘরে শব্দ প্রতিধ্বনিত হলে নতুন সুর তৈরি হয় সেরকম। এই কণাগুলোর হালকা কোনো সংস্করণ যদি ভবিষ্যতের accelerator এ পাওয়া যায়, সেটা তত্ত্বটিকে সমর্থন করবে। আর না পাওয়া গেলে তত্ত্বটি ভুল প্রমাণিত হবে। তবে পরোক্ষ পরীক্ষারও সুযোগ আছে। আদিম black hole এর চূড়ান্ত বাষ্পীভবনের মুহূর্তটি ভবিষ্যতের gamma-ray telescope বা gravitational wave detector দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা গেলে স্থিতিশীল অবশিষ্টের পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। Pinčák নিজেই বলেছেন এই তত্ত্বের পূর্বানুমানগুলো সুনির্দিষ্ট, মানে এটা ভুলও হতে পারে।
উপসংহার
যদিও স্টিফেন হকিং তার জীবদ্দশায় এই ধাঁধার সমাধান করতে পারেননি। কিন্তু তিনি যে প্রশ্নটা তুলেছিলেন সেটা আজও পদার্থবিজ্ঞানকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নতুন এই গবেষণা বলছে উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে এমন মাত্রায় যেগুলো আমরা কখনো দেখতে পাব না, কিন্তু গণিতের ভাষায় অনুভব করতে পারি।
