মাত্র ১২ মিলিমিটার লম্বা, আকারে মানুষের নখের সমান এক ক্ষুদ্র মাছ অথচ তার আওয়াজ করতে বন্দুকের গুলির মতোই তীব্র! মিয়ানমারের নদী ও পাহাড়ি Bago Yoma অঞ্চলের স্বচ্ছ পানিতে বাস করা এই বিস্ময়কর প্রাণীর নাম Danionella cerebrum (ড্যানিওনেলা সেরিব্রাম)। বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মাছগুলোর মধ্যে অন্যতম এই প্রজাতিটি ১৪০ ডেসিবেলেরও বেশি জোরে আওয়াজ তৈরি করতে পারে যা একটি হাতির চেঁচামেচির সমান।
এই অদ্ভুত বিস্ময় প্রথম নজরে আসে ২০২১ সালে, যখন জার্মানির স্নায়ুবিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণার জন্য ব্যবহার করা এক ক্ষুদ্র স্বচ্ছদেহী মাছ নিয়ে কাজ করছিলেন। মাইক্রোস্কোপে পর্যবেক্ষণের সময় তাঁরা বুঝতে পারেন, এটি আসলে আগে কখনো বর্ণিত হয়নি এমন এক নতুন প্রজাতি। পরবর্তীতে কঙ্কাল বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় তারা সম্পূর্ণ নতুন এক প্রাণীর সঙ্গে কাজ করছেন। তাই এর নাম রাখা হয় Danionella cerebrum। যেখানে “cerebrum” শব্দটি এসেছে মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় অংশের নাম থেকে, যা এই মাছটির স্নায়ুবিজ্ঞানে গুরুত্বের প্রতীক।
এই ক্ষুদ্র মাছটির শরীর প্রায় স্বচ্ছ এবং এর মাথায় খুলি নেই ফলে এর ক্ষুদ্রতম মস্তিষ্ক সরাসরি দেখা যায়। এই কারণেই Danionella cerebrum স্নায়ুবিজ্ঞানীদের কাছে এক মূল্যবান গবেষণার উপাদান, কারণ এটি পৃথিবীর সব কশেরুকপ্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে ছোট মস্তিষ্কের অধিকারী। কিন্তু এর আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে এর শব্দ উৎপাদনের ক্ষমতায়।
বার্লিনের Charité University ও জার্মানির Senckenberg Research Institute–এর গবেষকরা উচ্চগতির ক্যামেরা, মাইক্রো-সিটি স্ক্যান ও জেনেটিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আবিষ্কার করেছেন এই ছোট মাছের দেহে লুকিয়ে আছে এক জটিল ও অনন্য শব্দযন্ত্র।
এই যন্ত্রের মূল উপাদান তিনটি: একটি বিশেষ ধরনের drumming cartilage (ড্রামিং কার্টিলেজ), শক্তিশালী পাঁজরের হাড় এবং এমন এক পেশি যা দ্রুত কাজ করলেও সহজে ক্লান্ত হয় না।

মাছটি যখন এই পেশি সঙ্কুচিত করে, তখন পাঁজরের হাড়কে টেনে ধরে রাখে। পেশি শিথিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়টি ছুটে গিয়ে কার্টিলেজে আঘাত করে এবং সেই ধাক্কা পৌঁছে যায় মাছের ভেতরের swim bladder-এ যা একধরনের গ্যাসভরা থলি। এই সংঘর্ষেই তৈরি হয় প্রচণ্ড ড্রাম বাজানোর মতো শব্দ, যার তীব্রতা পৌঁছে যায় ১৪০ ডেসিবেলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ মাছের পাঁজরের হাড় স্ত্রী মাছের তুলনায় অনেক বড় ও শক্ত, ফলে শুধুমাত্র পুরুষরাই এই আওয়াজ উৎপাদনে সক্ষম। স্ত্রী মাছ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় তারা এত জোরে শব্দ করতে পারে না।
বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি কেন এই ক্ষুদ্র মাছ এত জোরে আওয়াজ করে। তাঁদের ধারণা, Danionella cerebrum ঘোলা ও কাদামাটি-মিশ্র পানিতে বাস করে বলে চোখের চেয়ে শব্দই তাদের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। সম্ভবত তারা এই শব্দ ব্যবহার করে একে অপরকে খুঁজে পেতে অথবা এলাকা ও আধিপত্য রক্ষার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষদের সতর্ক করতে।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো এটি সঙ্গী আকর্ষণের উপায়। অন্যান্য অনেক মাছ প্রজননের সময় সাঁতার থলি ব্যবহার করে আওয়াজ তোলে। উদাহরণস্বরূপ, Black drum মাছ প্রজননের সময় এমন জোরে গর্জন তোলে যে কখনও কখনও মানুষের ঘুম পর্যন্ত ভেঙে যায়, আর Midshipman মাছ ১৩০ ডেসিবেলেরও বেশি শব্দ করে ডাকে তার সঙ্গিনীকে। কিন্তু ১২ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের D. cerebrum মাছের আওয়াজ তীব্রতা ও শক্তির বিচারে এদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই মাছের শব্দ উৎপাদনের ধরনও পরিবর্তনশীল। যখন কোনো মাছ দুই পাশের পেশি পালাক্রমে সংকুচিত করে swim bladder চাপে, তখন তৈরি হয় উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির আওয়াজ; আর একপাশের পেশি বারবার সক্রিয় হলে উৎপন্ন হয় নিচু ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ। এভাবেই তারা পানির নিচে নানা ধরনের “সংগীতধ্বনি” তৈরি করে যেন এক ক্ষুদ্র সিম্ফনি চলছে অদৃশ্য জগতের গভীরে।
এই আবিষ্কার শুধু একটি অজানা মাছের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেনি এটি আমাদের জানান দেয়, প্রকৃতিতে আকার আর ক্ষমতার মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। যেখানে একটি হাতির চেঁচামেচির শব্দ সর্বোচ্চ ১২৫ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছায়, সেখানে একটি নখের সমান ছোট প্রাণী তার চেয়েও জোরে আওয়াজ তুলতে পারে!
বিজ্ঞানীরা বলছেন, Danionella cerebrum নিয়ে এই গবেষণা কেবল শব্দ উৎপাদনের জৈবিক প্রক্রিয়া নয়, বরং প্রাণীদের আচরণ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিবর্তনজনিত অভিযোজন সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে। বিশেষত স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই স্বচ্ছদেহী মাছটি ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতি ও স্নায়ুপ্রেরণের গতিশীলতা বোঝার জন্য এক অনন্য গবেষণামডেল হতে পারে।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির, তাসিনুল সাকিফ
তত্যসূত্র : Smithsonian Magazine

সুবহানাল্লাহ
💝