মানুষ কি আসলেই চাঁদে গিয়েছিল? নাকি পুরো ঘটনাই ছিল সাজানো? অ্যাপোলো ১১ মিশনের পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় কেটে গেলেও এই বিতর্ক এখনো থামে নাই। অনেকের মনে এখনো একই প্রশ্ন আছে। ১৯৬৯ সালে নাসার ওই ঐতিহাসিক চন্দ্রবিজয় কি আসলেই সত্যি ছিল? নাকি পুরোটাই আমেরিকার বানানো এক বিশাল ধাপ্পাবাজি?
১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে নীল আর্মস্ট্রং আর বাজ অলড্রিন যে সত্যিই চাঁদে নামার পর থেকে এই বিষয়ে অনেক লোকের এখনো আঁতে ঘা লেগে আছে। স্নায়ু যুদ্ধ চলাকালীন আমেরিকার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া যেখানে কোনো প্রশ্ন তুলেনি নীরবে মেনে নিয়েছিল সেখানে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীরা একের পর এক প্রশ্ন করে । যেমন, চাঁদের আকাশে কোনো তারা দেখা যায় না কেন? বাতাস না থাকা সত্ত্বেও আমেরিকার পতাকা কীভাবে উড়ছিল? মহাকাশচারীদের ছবির ছায়াগুলো কেমন যেন অদ্ভুত আর এলোমেলো ।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা বারবার এই ষড়যন্ত্র তথ্যগুলো খণ্ডন করেছে।ওগুলো সবই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। চন্দ্রাভিযানের পাথরের নমুনা তো আসল। তবুও বিতর্ক থেমে নেই।কিন্ত এখন প্রযুক্তি এত উন্নত হওয়ার পর মানুষের চাঁদে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা আছে? উত্তর হ্যাঁ।
চাঁদের যাওয়ার জন্য নাসার নতুন মিশন (Artemis) :
চাঁদে আবার মানুষ পাঠানোর দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। তাদের এই নতুন চন্দ্রাভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আর্টেমিস‘। আর্টেমিস হলো গ্রিক পুরাণে অ্যাপোলোর যমজ বোন এবং চন্দ্রদেবী। এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এবারের মিশনের ভিন্নতা। আর্টেমিস মিশনের লক্ষ্য পুরুষ এর সাথে প্রথমবারের মতো একজন নারী এবং একজন অশ্বেতাঙ্গ নভোচারীকে চাঁদের মাটিতে নামানো।
আর্টেমিস মিশনকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে। ২০২২ সালে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে আর্টেমিস ১ মিশন। যেখানে কোনো নভোচারী ছাড়াই ‘ওরিয়ন’ নামক একটি মহাকাশযান চাঁদের চারপাশে ঘুরে এসেছে। এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নাসার নতুন শক্তিশালী রকেট ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস এবং ওরিয়ন মহাকাশযানের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে পরিকল্পনা করা হয়েছে আর্টেমিস ২ মিশনের। এই মিশনে চারজন নভোচারী ওরিয়নে মহাকাশযানে করে চাঁদের দূরবর্তী এলাকা ঘুরে আসবে। কিন্তু চাঁদে নামবে না। এটা হবে মানুষ নিয়ে চাঁদের সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে ভ্রমণ।

ছবি : নাসা
তারপর হচ্ছে আর্টেমিস ৩ মিশন । মূলত এই মিশনের মধ্য দিয়ে চাঁদের মাটিতে মানুষের আবার পা রাখার কথা এটা ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে হতে পারে। এই মিশনে অবতরণের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে চাঁদের দক্ষিণ মেরু।যা আগের অ্যাপোলো মিশনগুলোর অবতরণ স্থান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর গভীর খাদে বরফ আকারে প্রচুর পানি জমে থাকতে পারে। এই পানি যদি সত্যি পাওয়া যায়, তবে তা হবে গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কার। এই পানি থেকে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য অক্সিজেন এবং রকেটের জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন তৈরি করা সম্ভব হবে। তখন আর আলাদা করে পৃথিবী থেকে পানি বয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। এজন্য স্পেস মিশনগুলুর খরচ অনেক কমে আসবে।

আর্টেমিসের ৩ এর পর আর্টেমিস ৪ এবং ৫ মিশনের মাধ্যমে চাঁদের কক্ষপথে একটি মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এটার নাম দেওয়া হয়েছে ‘লুনার গেটওয়ে’। এই গেটওয়ে হবে চাঁদ এবং তার পরবর্তী মঙ্গল অভিযানের জন্য একটি অস্থায়ী ঘাঁটি।
আগেরবারের চন্দ্রাভিযান গুলোর চেয়ে এবারের প্রযুক্তি অনেক উন্নত। নাসার SLS রকেট এখন পর্যন্ত তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট। ওরিয়ন মহাকাশযান নভোচারীদের নিরাপদে চাঁদে নিয়ে যাওয়া এবং ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। চাঁদে নামার জন্য ব্যবহার করা হবে বেসরকারি সংস্থা স্পেসএক্স-এর তৈরি ‘স্টারশিপ’ ল্যান্ডার। স্টারশিফ ল্যান্ডারে করে রকেট বুস্টার পুনরায় সঠিক ভাবে পৃথিবীতে ল্যান্ড করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কমবেশি সবাই দেখেছে।এই স্টারশিপ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য। এজন্য মহাকাশ অভিযানের খরচ অনেক কমে যাবে।

ছবি : SpaceX
এছাড়াও,নভোচারীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে নতুন প্রজন্মের স্পেসস্যুট, যা আগের চেয়ে অনেক বেশি ফ্লেক্সিবল এবং দীর্ঘ সময় ধরে চাঁদের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকবে।তবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এই অঞ্চলে সূর্যের আলো খুব কম পৌঁছায়নোর কারণেতাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকে। এখানকার মাটিও বেশ বন্ধুর এবং ছায়াচ্ছন্ন। এজন্য ল্যান্ডিং এর জন্য ভালো জায়গা খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এবারের চন্দ্রাভিযানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বেসরকারি সংস্থাগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ। ইলন মাস্কের স্পেসএক্স (SpaceX) এবং জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন (Blue Origin) এর মতো কোম্পানিগুলো মহাকাশ গবেষণার ধারণাই পাল্টে দিয়েছে। স্পেসএক্স-এর পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ফ্যালকন রকেট এবং স্টারশিপ মহাকাশযান উৎক্ষেপণের খরচ অনেক কমিয়ে আনছে। নাসা তাদের আর্টেমিস মিশনের জন্য স্পেসএক্স-কে লুনার ল্যান্ডার তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে।আর ব্লু অরিজিনও তাদের ‘ব্লু মুন’ ল্যান্ডার তৈরি করছে এবং আর্টেমিসের পরবর্তী মিশনগুলোতে নাসার সাথে কাজ করার আশা রাখছে।

অন্যান্য দেশের চন্দ্র অভিযানের পরিকল্পনা :
শুধু নাসা নয়, দৌড়ে আছে অন্য মোড়ল দেশগুলোও।চীন মহাকাশ গবেষণায় বর্তমানে শক্তিশালী দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাদের ‘চ্যাং’ই’ চন্দ্রাভিযান কর্মসূচি ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি সফল রোবোটিক মিশন সম্পন্ন করেছে। চ্যাং’ই ৪ মিশন প্রথমবারের মতো চাঁদের অন্ধকার দিকে একটি রোভার নামিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি, চ্যাং’ই ৬ চাঁদের দুর্গম অংশ থেকে মাটি ও পাথরের নমুনা নিয়ে সাফল্যর পৃথিবীতে ফিরে এসেছে।
চীনের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানো এবং রাশিয়ার সাথে মিলে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে একটি আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা কেন্দ্র (International Lunar Research Station – ILRS) স্থাপন করা। এই কেন্দ্রটি হবে একটি স্বয়ংক্রিয় এবং রোবোটিক ঘাঁটি।এখানে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করার সুযোগ পাবেন। চীন এবং রাশিয়া এই প্রকল্পে অন্যান্য দেশকেও আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
ভারতও এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই। চন্দ্রযান-৩ মিশনের সফল অবতরণের পর ভারত বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে চাঁদের মাটিতে পা রেখেছে। ইসরো (ISRO) এখন জাপানের সাথে মিলে ‘লুপেক্স’ (LUPEX – Lunar Polar Exploration Mission) নামক একটি মিশনের পরিকল্পনা করছে।যার লক্ষ্য হলো চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানি এবং অন্যান্য সম্পদের সন্ধান করা। যদিও ভারতের মানববাহী চন্দ্রাভিযানের পরিকল্পনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।তবে ভারতের কম খরচে সফল মহাকাশ অভিযানের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
নতুন করে কেন এই চাঁদে ফেরার পরিকল্পনা ?
প্রশ্ন উঠতে পারে, অর্ধশতাব্দী পর আবার কেন মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো চাঁদে ফেরার জন্য এত আগ্রহী হয়ে উঠেছে? এর পেছনে রয়েছে একাধিক বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক কারণ।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানির উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে তা হবে বিজ্ঞানের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি। এই পানি চাঁদে মানব বসতির সম্ভাবনা তৈরি করবে। এছাড়া, চাঁদের ভূতাত্ত্বিক গঠন, খনিজ সম্পদ এবং পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জানার এখনো অনেক কিছু বাকি আছে।
অন্যদিকে চাঁদে হিলিয়াম-৩ এর মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফিউশন চুল্লির জ্বালানি হতে পারে। মহাকাশ পর্যটন এবং চাঁদের সম্পদ আহরণকে কেন্দ্র করে চাঁদ এক নতুন অর্থনীতির হটস্পট তৈরি হয়ে পারে ।
মহাকাশে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা দেশগুলোর জন্য সবসময়ই মর্যাদার বিষয়।যেমনটা গত শতকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে দেখা গিয়েছিল।চাঁদে সফলভাবে ঘাঁটি স্থাপন করতে পারলে তা একটি দেশের প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিচায়ক হবে। আমেরিকা, চীন এবং রাশিয়ার মধ্যে চলমান এই প্রতিযোগিতা মূলত মহাকাশে কে নেতৃত্ব দেবে তারই প্রতিফলন।
চাঁদে বসতি স্থাপন এবং সেখানকার সম্পদ ব্যবহারের প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারলে তা হবে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর পথে একটি বড় ভিত্তি। চাঁদকে মঙ্গল অভিযানের জন্য একটি মহড়া ক্ষেত্র ভুল হবে না।চাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মঙ্গলে আরো সহজে অভিযান চালাতে পারবে।
চাঁদে আবার মানুষ পাঠানোর ব্যাপারটা রোমাঞ্চকর হলেও, পথটা খুবই কঠিন। আর্টেমিস মিশন বা চীনের পরিকল্পনা—সবই অনেক বড় পরিকল্পনা।কিন্তু সফল হবে কিনা তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আর অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। কাগজে-কলমে যেসব পরিকল্পনা দেখা যায় সেগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে মহাকাশ সংস্থাগুলোর সামনে বাধা আসতে শুরু করে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সময় আর অর্থ।এই অর্থের অভাবই নাসার আগের অ্যাপোলো মিশন গুলো বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন নাসার আর্টেমিস মিশনের সময়সূচি কয়েকবার পিছিয়েছে প্রযুক্তিগত জটিলতা আর টাকার অভাব। ওরিয়ন মহাকাশযান, স্পেসএক্সের স্টারশিপ ল্যান্ডার আর নভোচারীদের নতুন স্পেসস্যুট বানাতে সময় ও টাকা অনেক বেশি লাগছে। প্রতিটি জিনিস ঠিকঠাক না কাজ করলে নভোচারীদের মৃত্যু হতে পারে। তাই কোনো রিস্ক নেওয়া যাবে না।
আরেকটা বড় সমস্যা হলো চাঁদের দক্ষিণ মেরুর খারাপ পরিবেশ। বিজ্ঞানীরা সেখানে পানি খুঁজছেন, কিন্তু সেই বরফ গভীর গর্তে লুকিয়ে আছে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। সেখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। এই ভয়ানক ঠাণ্ডায় যন্ত্রপাতি চালানো আর নভোচারীদের নিরাপদ রাখা খুব শক্ত। অবতরণের জায়গাও খুব বিপজ্জনক। জায়গাটা এবড়োখেবড়ো আর অন্ধকারাচ্ছন্ন।তাই নিরাপদ জায়গা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। একটু ভুল হলেই পুরো মিশন ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।

ছবি : Nasa
প্রযুক্তি বা প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াও দেশগুলোর রাজনীতিও চাঁদে ফেরার স্বপ্নকে অনিশ্চিত করছে। আমেরিকা আর চীনের প্রতিযোগিতা মহাকাশ গবেষণায় গতি আনলেও, একধরনের অস্থিরতাও তৈরি করছে। দেশগুলো যদি সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা করে, তাহলে চাঁদে আন্তর্জাতিক ঘাঁটি বানানোর মতো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সফল হওয়া কঠিন হবে।
আরও একটা বড় প্রশ্ন ওঠে।পৃথিবীতে এত সমস্যা থাকতে চাঁদের পেছনে এত হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা কি ঠিক? এই বিপুল খরচের যুক্তি দেয়াটাও সরকার আর মহাকাশ সংস্থাগুলোর জন্য চাপের।
এইসব সমস্যা আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে মানুষ কবে আবার চাঁদের মাটিতে পা রাখবে সেটা এখনো ঘোলাটে । হয়তো এই দশকের শেষ নাগাদ আমরা সেই দৃশ্য দেখতে পাব, না হয় প্রযুক্তি আর অর্থের সমস্যার জন্য আরও বেশি সময় লাগবে।
তথ্যসূত্র :
- NASA
- CNSA
