চাঁদের উদ্দেশে মানুষের প্রথম যাত্রার কথা আমরা সবাই জানি, কিন্তু তার আগেই এক অবিশ্বাস্য মিশনে চাঁদের চারপাশ ঘুরে এসেছিল দুইটি কচ্ছপ! ১৯৬৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘জন্ড ৫’ মহাকাশযানে করে পাঠানো হয়েছিল এই প্রাণীগুলোকে—যাদের উদ্দেশ্য ছিল মহাশূন্যে জীবিত প্রাণীর টিকে থাকার সম্ভাবনা যাচাই করা। মানুষের আগেই মহাকাশে জীবনের উপস্থিতির এই নিঃশব্দ কিন্তু ঐতিহাসিক অধ্যায় আজ প্রায় বিস্মৃত। এই লেখায় তুলে ধরা হলো সেই অনন্য অভিযানের গল্প।

১৯৬৮ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর, সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘জন্ড ৫’ নামের মহাকাশযান চাঁদের চারপাশে সফলভাবে ঘুরে আসে। এই ঘটনা ঘটেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত অ্যাপোলো ৮ মিশনের মাস দুয়েক আগেই। তাহলে আমরা কেন ইতিহাসের প্রথম চাঁদঘোরা মিশন হিসেবে জন্ড ৫–এর কথা মনে রাখি না? কারণ, এই মহাকাশযানে কোনো মানুষ ছিল না। এর যাত্রীরা ছিল দুইটি রাশিয়ান স্টেপ কচ্ছপ! আর হ্যাঁ, সঙ্গে ছিল কিছু কীটপতঙ্গ, মাছি আর বীজ—তবে এ’র মূল নায়ক ছিল ওই কচ্ছপদ্বয়ই।

১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর কচ্ছপ দুটি ভারত মহাসাগরে অবতরণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসে।

এই কচ্ছপদের মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল জীবিত প্রাণীর ওপর মহাকাশযাত্রার প্রভাব কী হতে পারে তা জানার উদ্দেশ্যে। এই ঘটনা ঘটে স্পুটনিক ১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের এক দশক পরে। ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক ১ উৎক্ষেপণ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এতে চমকে উঠে আমেরিকা এবং সেখান থেকেই শুরু হয় বিখ্যাত “স্পেস রেস”—যেখানে দুই পরাশক্তি প্রায় ২০ বছর ধরে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে।

কিন্তু ষাটের দশকের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের গতি কিছুটা মন্থর হয়ে পড়ে। আমেরিকার হাতে তখন শক্তিশালী স্যাটার্ন-৫ রকেট আর অ্যাপোলো প্রোগ্রামের প্রস্তুতি চলছিল। অন্যদিকে সোভিয়েতরা বেশ কিছু ব্যর্থতা ও হতাশার সম্মুখীন হচ্ছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল ভ্লাদিমির কোমারভের মৃত্যুর ঘটনা যিনি ইতিহাসে পরিচিত আকাশ থেকে পড়া মানুষ হিসেবে।

খোলা কফিনে ভ্লাদিমির কোমারভের দেহাবশেষ Image Credit : RIA Novosti/Photo Researchers Inc.

সোভিয়েতরা তখনও এমন কোনো শক্তিশালী রকেট বানাতে পারেনি যা মানুষকে চাঁদের চারপাশে নিয়ে গিয়ে নিরাপদে ফেরত আনতে পারে। কিন্তু যদি মানুষ পাঠানো না যায় তবে অন্য কিছু পাঠিয়ে কি সাফল্য অর্জন করা যায় না? এমন চিন্তা থেকেই কচ্ছপদের চাঁদের উদ্দেশ্যে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জন্ড ৫ মহাকাশযান এই দুটি কচ্ছপকে মহাশূন্যে নিয়ে যায়। এরপর চাঁদের চারপাশ ঘুরিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়; যদিও তা পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না তবে বেশ সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

এই কচ্ছপরা ছিল আফগানিস্তান, উজবেকিস্তানসহ আশেপাশের স্তেপ অঞ্চল থেকে সংগৃহীত। তাদের ২ সেপ্টেম্বর মহাকাশযানে বসানো হয় আর ১৪ সেপ্টেম্বর মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের আগ পর্যন্ত তাদের কোনো খাবার দেওয়া হয়নি, কারণ বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন খাবার খেলে তাদের শরীরের ভেতরে যে পরিবর্তন হবে তা গবেষণার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।

চার দিন ধরে জন্ড ৫ চাঁদের চারপাশ ঘুরে বেড়ায় আর এভাবেই ইতিহাসে প্রথম জীবন্ত প্রাণী হিসেবে তারা এই অসাধারণ সফর সম্পন্ন করে। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসার যাত্রা। ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৮ সালে কচ্ছপদ্বয় পৃথিবীতে ফিরে আসে। ভারত মহাসাগরে অবতরণ করে তাদের বাহন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এতদূর সফরের পরও তারা সুস্থ অবস্থায় ফেরে যদিও কিছুটা ভর কমে গিয়েছিল। এই মিশনের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি ছোট পদক্ষেপ নিলেও, সেটা ছিল কচ্ছপদের জন্য এক বিশাল জয়।

মানুষের মহাকাশজয়ের ইতিহাসে কচ্ছপদের এই নিঃশব্দ যাত্রা হয়তো খুব বেশি আলোচনায় আসে না, কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও মহাকাশ অভিযানের পথে এটি ছিল এক সাহসী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। মানুষের আগে প্রাণী পাঠিয়ে মহাশূন্যের প্রতিক্রিয়া বোঝার এই চেষ্টাই ভবিষ্যতের চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানের ভিত্তি গড়ে দেয়। ‘জন্ড ৫’-এর সেই দুই কচ্ছপের সফল চাঁদঘোরা অভিযান তাই শুধু বৈজ্ঞানিক সাফল্যই নয়, বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মহাকাশজয়ের প্রতিটি ধাপে, ছোট ছোট প্রাণীর ভূমিকাও কতটা বড় হতে পারে।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : IFL Science

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply