মানবজীবনের অন্যতম গভীর আকাঙ্ক্ষা হলো নিজের সন্তানকে পৃথিবীতে দেখা। এই আকাঙ্ক্ষা সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে, কিন্তু তার মূল সত্তা অপরিবর্তিত অর্থাৎ সন্তান মানে নিজের রক্তের উত্তরাধিকার। প্রযুক্তির অগ্রগতি আজ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে এই স্বপ্ন পূরণের পথ লিঙ্গ, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের সীমারেখা অতিক্রম করছে। এমন এক বিস্ময়কর ও আলোচিত বিষয় হলো, একজন ব্যক্তি যিনি জন্মগতভাবে পুরুষ ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে নারী হয়ে উঠেছেন, তিনি কি নিজের সংরক্ষিত শুক্রাণু ব্যবহার করে মা হতে পারেন? এমন এক জটিল প্রশ্ন পাই আমাদের কি…বিজ্ঞান খুঁজছেন গ্রুপে। চলুন বিশ্লেষণ করে দেখা যাক

জৈবিক সম্ভাবনা
যিনি জন্মগতভাবে পুরুষ ছিলেন এবং পরবর্তীতে নারী হিসেবে জীবনযাপন শুরু করেছেন, তিনি যদি নিজের শুক্রাণু আগে থেকে সংরক্ষণ করে রাখেন, তাহলে সেই শুক্রাণু ব্যবহার করে জৈবিক সন্তান জন্ম দেওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াটি পরিচিত স্ফার্ম ক্রায়োপ্রিজারভেশন নামে। এটি বহু বছর ধরে ব্যবহৃত একটি প্রযুক্তি, যেখানে তরল নাইট্রোজেনের সাহায্যে শুক্রাণুকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়, যাতে বহু বছর পরও তা কার্যকর থাকে।
পরবর্তীতে, এই সংরক্ষিত শুক্রাণু ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা IVF (In Vitro Fertilization) প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা যায়। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় ডোনার ডিম্বাণু সংগ্রহ করে শুক্রাণুর সঙ্গে মিলিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। তারপর সেই ভ্রূণটি একটি সারোগেট মায়ের গর্ভে স্থাপন করা হয়। সারোগেট মা সেই শিশুটিকে গর্ভধারণ করে জন্ম দেন, কিন্তু জেনেটিকভাবে শিশুটি আসলে সেই নারীর (অর্থাৎ ট্রান্সজেন্ডার নারীর) সন্তান, যিনি শুক্রাণু সরবরাহ করেছিলেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমোন থেরাপি যা একজন ট্রান্স নারী নিজের শরীরে নারীত্বের পরিবর্তন আনতে গ্রহণ করেন তা অনেক সময় শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে দেয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, হরমোন থেরাপি বন্ধ করার পর অনেকের ক্ষেত্রে শুক্রাণু উৎপাদন আবার ফিরে আসে। তাই অনেক চিকিৎসক এখন পরামর্শ দেন, হরমোন থেরাপি শুরু করার আগেই শুক্রাণু সংরক্ষণ করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
চিকিৎসা-প্রযুক্তির সাফল্য ও বাস্তব উদাহরণ
বিশ্বের বহু দেশে ইতিমধ্যেই ট্রান্সজেন্ডার নারীদের শুক্রাণু সংরক্ষণ ও তা দিয়ে সন্তান জন্মদানের ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ উন্নত দেশগুলোতে বড় বড় ফার্টিলিটি ক্লিনিকগুলো এখন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের জন্য আলাদা পরামর্শ ও সেবা প্রদান করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একজন ট্রান্স নারী নিজের ট্রানজিশনের আগে সংরক্ষিত শুক্রাণু ব্যবহার করে ডোনার ডিম্বাণুর সাহায্যে নিজের জেনেটিক সন্তান জন্ম দিয়েছেন।
চিকিৎসাগতভাবে এই প্রক্রিয়ার সাফল্যের হার প্রায় সাধারণ দম্পতিদের IVF সাফল্যের সমান। মূল নির্ভরতা থাকে ডিম্বাণুর মান, সারোগেট মায়ের স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতার উপর। ফলে বিজ্ঞানের সফলতা যে হ্যাঁ, একজন ট্রান্স নারী তাঁর সংরক্ষিত শুক্রাণু ব্যবহার করে মা হতে পারেন, যদি উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা ও আইনি অনুমতি থাকে।
সবচেয়ে বড় বাধা আইনি জটিলতা
যদিও চিকিৎসা বিজ্ঞান এই স্বপ্নকে সম্ভব করেছে, কিন্তু আইনের জগৎ এখনও সমানভাবে অগ্রসর হয়নি। প্রতিটি দেশে সারোগেসি বা ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের আইন ভিন্ন ভিন্ন। অনেক দেশ, যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি বা বাংলাদেশে সারোগেসি এখনও আইনত স্বীকৃত নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজ্য, কানাডা, ভারত ও গ্রিসে নির্দিষ্ট শর্তে এটি বৈধ।
এখানেই সমস্যার সূত্রপাত। অনেক জায়গায় মা ও বাবা শব্দ দুটি আইনগতভাবে জৈবিক লিঙ্গ অনুযায়ী নির্ধারিত। ফলে একজন ট্রান্স নারী, যিনি জন্মগতভাবে পুরুষ ছিলেন, আইনি কাগজে বাবা হিসেবে উল্লেখিত হতে পারেন, যদিও সামাজিক ও মানসিকভাবে তিনি মা হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে চান। এই বৈপরীত্য অনেক সময় নাগরিক নিবন্ধন, নাগরিকত্ব বা উত্তরাধিকার আইনেও জটিলতা তৈরি করে।
আরেকটি বিষয় হলো আন্তর্জাতিক সারোগেসি। অনেক দেশে স্থানীয়ভাবে সারোগেসি নিষিদ্ধ হওয়ায় ট্রান্সজেন্ডার দম্পতিরা বিদেশে গিয়ে সারোগেসির ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এরপর শিশুর নাগরিকত্ব ও অভিভাবকত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এই আন্তর্জাতিক সারোগেসি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে বাস্তবে অনেকের জন্য এই প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠছে।
নৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক
এই পুরো বিষয়টিকে ঘিরে নৈতিক আলোচনাও প্রবল। একদিকে রয়েছে প্রজনন অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, অন্যদিকে রয়েছে সারোগেট মায়ের সুরক্ষা ও শোষণের আশঙ্কা। কেউ কেউ মনে করেন, সারোগেসি ধনী মানুষের সুবিধা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে দরিদ্র নারীরা আর্থিক প্রলোভনে গর্ভধারণ করেন। আবার অনেকে বলেন, এটি এক ধরনের চুক্তিভিত্তিক সহযোগিতা, যেখানে উভয় পক্ষই উপকৃত হন।
ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের প্রজনন অধিকারের বিষয়েও সমাজে বিভক্ত মতামত দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, একজন ট্রান্স নারীকে প্রজননের সুযোগ দেওয়া তার লিঙ্গপরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধার অংশ। অন্যদিকে কিছু রক্ষণশীল সমাজ এই প্রক্রিয়াকে প্রকৃতির বিরুদ্ধে বলে সমালোচনা করে। তবে আধুনিক চিকিৎসা ও মানবাধিকারের আলোচনায় স্পষ্ট হচ্ছে যে, যে কেউ তার লিঙ্গ পরিচয় যাই হোক না কেন, নিজের জেনেটিক সন্তান পাওয়ার অধিকার রাখেন।
বিকল্প প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
চিকিৎসা জগতে বর্তমানে আরেকটি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে গর্ভাশয় প্রতিস্থাপন বা uterus transplant। যদিও এই প্রযুক্তি মূলত জরায়ু-অক্ষম নারীদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, ভবিষ্যতে এটি ট্রান্স নারীদের জন্যও সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। তবে বর্তমানে এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং নৈতিকভাবে বিতর্কিত। তাই এখনো পর্যন্ত ট্রান্স নারীদের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায় হলো সারোগেসি।
Predestination-এ দেখানো অদ্ভুত বাস্তবতা
বিজ্ঞান ও কল্পনার সংযোগে মানুষের প্রজনন নিয়ে সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোর একটি উঠে এসেছে ২০১৪ সালের সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র Predestination-এ।

ছবির মূল চরিত্র Jane এক অনাথ আশ্রমে বড় হয়। জন্মগতভাবে তার শরীরে পুরুষ ও নারীর উভয় প্রজনন অঙ্গ থাকে অর্থাৎ সে একজন Intersex ব্যক্তি। বাইরের দিক থেকে সে নারী, কিন্তু তার শরীরের ভেতরে আছে দ্বৈত জৈবিক সম্ভাবনা। Jane বড় হয়ে অত্যন্ত মেধাবী হয়, মহাকাশ সংস্থায় কাজ করার সুযোগ পায়, কিন্তু চিকিৎসা পরীক্ষায় এই গোপন তথ্য প্রকাশ পেলে তাকে বাদ দেওয়া হয়। জীবনের এক পর্যায়ে সে এক রহস্যময় পুরুষের প্রেমে পড়ে, যে তাকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়।
কিছুদিন পর Jane বুঝতে পারে সে গর্ভবতী। সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় তার শরীরে জটিলতা দেখা দেয়, এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসকেরা তার জরায়ু ও ডিম্বাশয় অপসারণ করে, পরিবর্তে তার শরীরকে পুরুষে রূপান্তরিত করেন। সেই সময় থেকে Jane পরিণত হয় John-এ একই মানুষ, কিন্তু নতুন শরীরে।

John যখন নিজের অতীত জীবনের রহস্য খুঁজে বেড়াচ্ছে, তখন তার জীবনে আসে এক রহস্যময় বারটেন্ডার, যে আসলে ভবিষ্যৎ থেকে আগত সময়ভ্রমণকারী এজেন্ট। সে John-কে বলে, “তুমি চাইলে তোমার জীবনের ধ্বংসের কারণের মুখোমুখি হতে পারো।” তারা একসঙ্গে সময়ভ্রমণ করে ফিরে যায় ১৯৬৩ সালে। সেখানে John দেখা পায় এক তরুণীর যিনি আর কেউ নন, তারই অতীত নারী রূপ Jane। John বুঝতে পারে না যে সে নিজের অতীত রূপের প্রেমে পড়ছে। তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং Jane গর্ভবতী হয়। এই সন্তানের জন্মই তৈরি করে সময়ের অবিরাম চক্র যেখানে Jane জন্ম দেয় Jane-কে, John হয় Jane-এর ভবিষ্যৎ রূপ, আর Jane-এর সন্তান আবার Jane হয়ে ফিরে আসে সেই অনাথ আশ্রমে, যেখান থেকে সবকিছুর শুরু।
এই অদ্ভুত সময়চক্রে একজন মানুষ নিজেরই মা, বাবা, প্রেমিক ও সন্তান। এটি নিছক এক কল্পবিজ্ঞান নয়; বরং মানুষের প্রজনন ও আত্মপরিচয়ের সীমা কত দূর প্রসারিত হতে পারে তার প্রতীকী রূপ। আজকের চিকিৎসা প্রযুক্তি বাস্তবেও এমন কিছু সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, যেমন একজন ট্রান্স নারী নিজের সংরক্ষিত শুক্রাণু ব্যবহার করে IVF প্রক্রিয়ায় সন্তান জন্ম দিতে পারেন। বাস্তবে কেউ নিজের সন্তান নিজেই জন্ম দিতে পারেন না, কিন্তু Predestination এই অসম্ভব কল্পনাটিকে ব্যবহার করেছে, দার্শনিকভাবে দেখিয়েছে লিঙ্গ, সময় ও পরিচয় কতটা আপেক্ষিক।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র :
ASRM Ethics Committee Opinion (2021),
PMC Systematic Review on Fertility Preservation in Transgender Patients (2021),
UPMC Case Reports (2019),
European Parliament Surrogacy Brief (2025),
Reuters Reports on Surrogacy Laws (2024–2025), Predestination (2014)
