ঘটনাটা শুরু হয়েছিল হ্যারি ক্রোটোর এক কৌতূহল থেকে। তিনি ভাবছিলেন মহাকাশের বিশাল নক্ষত্রদের মধ্যে ভেসে বেড়ানো লম্বা লম্বা কার্বন চেইনগুলো কোথা থেকে আসে। তার ধারণা ছিল, বুড়ো হয়ে যাওয়া লাল দানব নক্ষত্রগুলোই (Red Giant Stars) হয়তো এগুলো তৈরি করছে। এই তত্ত্বটা পরীক্ষা করার জন্যই তিনি রিচার্ড স্মলির ল্যাবে এলেন।

স্মলির ল্যাবে একটা বিশেষ যন্ত্র ছিল, যা লেজার দিয়ে যেকোনো কঠিন বস্তুকে বাষ্পে পরিণত করতে পারতো। তারা পরিকল্পনা করলেন, ধাতুর বদলে কার্বনের একটি রূপ অর্থাৎ গ্রাফাইট দিয়ে এই পরীক্ষাটা করবেন। উদ্দেশ্য, ল্যাবের ভেতরেই একরকম কৃত্রিম নক্ষত্রের পরিবেশ তৈরি করা।
পরীক্ষা শুরু হলো। তারা যা খুঁজছিলেন, সেই ছয় থেকে আট কার্বনের ছোট ছোট চেইন পেলেন। কিন্তু তার সাথেই পেলেন এক ‘অনাহূত অতিথি’—৬০টি কার্বন পরমাণু দিয়ে তৈরি (C₆₀) এক অদ্ভুত অণু। এই অণুটা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো ধাঁধায় ফেলে দিল।
সমস্যাটা হলো, এই C₆₀অণুটা ছিল অস্বাভাবিক রকমের স্থিতিশীল বা নিষ্ক্রিয়। রসায়নের সাধারণ জ্ঞানে, কার্বন পরমাণু যদি একটা সমতল চাদরের মতো সাজানো থাকে (যেমনটা গ্রাফিনে হয়), তবে তার কিনারাগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই অসম্পূর্ণ বন্ধন বা ‘খালি হাত’ (dangling bonds) অণুটাকে খুব সক্রিয় করে তোলার কথা। কিন্তু C₆₀ ছিল একদম শান্তশিষ্ট, কারো সাথে সহজে বিক্রিয়া করতে চায় না। এর মানে, এর গঠন কোনোভাবেই সমতল হতে পারে না।

তাহলে এর আসল আকৃতিটা কেমন? এই জটিল রহস্য সমাধান করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা কিন্তু কোনো সুপারকম্পিউটারের সাহায্য নেননি। তারা টেবিলে বসলেন টুথপিক, জেলি বিন আর কাগজ কেটে বানানো ষড়ভুজ ও পঞ্চভুজ নিয়ে! দিনের পর দিন চলল এই মডেল বানানোর খেলা।
হঠাৎ করেই হ্যারি ক্রোটোর মনে পড়ল স্থপতি বাকমিনস্টার ফুলারের বানানো সেই বিখ্যাত ‘জিওডেসিক ডোম’ এর কথা, যা তিনি ১৯৬৭ সালের এক প্রদর্শনীতে দেখেছিলেন। বইপত্র ঘেঁটে তারা নিশ্চিত হলেন এটাই সেই গঠন! C₆₀ অণুটা আসলে একটা নিখুঁত গোলক, অনেকটা ফুটবলের মতো, যা ১২টি পঞ্চভুজ আর ২০টি ষড়ভুজ দিয়ে তৈরি। এই গঠনে কার্বনের কোনো ‘খালি হাত’ নেই, সব বন্ধনই সম্পূর্ণ। এ কারণেই এটি এত স্থিতিশীল।

সেই বিখ্যাত স্থপতির প্রতি সম্মান জানিয়েই তারা অণুটির নাম দিলেন ‘বাকমিনস্টারফুলারিন’, যা পরে ‘বাকিবল’ নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। ১৯৮৫ সালের ১৪ নভেম্বর স্বনামধন্য ‘নেচার’ জার্নালে তাদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা প্রকাশিত হয়, যা রসায়নের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। আর কয়েক বছরের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা ল্যাবে এটা প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করার সহজ উপায়ও বের করে ফেলেন।
এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ, হ্যারি ক্রোটো, রবার্ট কার্ল এবং রিচার্ড স্মলি ১৯৯৬ সালে যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
লেখা: রেদোয়ানুল হক রানা
সূত্র: লাইভ সায়েন্স

Nice