আপনি কি বিশ্বাস করবেন যদি কেউ বলে, একা থাকা বা বিবাহবিচ্ছেদই বরং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে? ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের নেতৃত্বে করা নতুন একটি গবেষণায় এমনই তথ্য উঠে এসেছে যে, অবিবাহিত মানুষের ডিমেনশিয়া হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।
আপনি যদি এর আগেও ভিন্ন কিছু শুনে থাকেন, সেটাও ঠিক হতে পারে। কারণ, ২০১৯ সালে আমেরিকায় করা এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, অবিবাহিত মানুষের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বিয়ে করা মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।
আসলে, বিয়ে করা মানুষ সাধারণভাবে ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী হন বলে বহু গবেষণাতেই দেখা গেছে। তারা হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকিতে কম থাকেন এবং তুলনামূলকভাবে বেশি দিন বাঁচেন। তাহলে ফ্লোরিডার নতুন গবেষণায় এমন উল্টো ফলাফল এলো কীভাবে? একটু ভালো করে দেখা যাক।
গবেষকরা ২৪,০০০-রও বেশি আমেরিকানের ওপর গবেষণা করেন, যাদের মধ্যে গবেষণার শুরুতে কেউই ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন না। অংশগ্রহণকারীদের সর্বোচ্চ ১৮ বছর পর্যন্ত ট্র্যাক করা হয়। মূল ব্যাপার হলো, তারা অংশগ্রহণকারীদের বিয়ের অবস্থা অনুসারে বিভিন্ন দলে ভাগ করে দেখেন—যেমন: বিয়ে করা, বিবাহবিচ্ছিন্ন, বিধবা এবং কখনও বিয়ে না করা।
প্রথমে দেখা যায়, অবিবাহিত তিনটি দলের সবারই ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বিয়ে করা দলের তুলনায় কম। তবে ধূমপান কিংবা মানসিক অবসাদের মতো অন্য প্রভাবকগুলো হিসেব করে নেওয়ার পর দেখা যায়, কেবল বিবাহবিচ্ছিন্ন এবং কখনও বিয়ে না করা মানুষেরাই কম ঝুঁকিতে আছেন।
ডিমেনশিয়ার ধরনভেদেও পার্থক্য দেখা যায়। যেমন, অবিবাহিত থাকার সঙ্গে অ্যালঝেইমার রোগের ঝুঁকি কম থাকার বিষয়টি বেশ স্পষ্ট ছিল—এটি ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে প্রচলিত ধরন। তবে ভাসকুলার ডিমেনশিয়ার (একটি তুলনামূলক কম পরিচিত ধরন) ক্ষেত্রে এমন কোনো সম্পর্ক দেখা যায়নি।
এছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বিবাহবিচ্ছিন্ন বা কখনও বিয়ে করেননি, তারা মাইল্ড কগনিটিভ ইম্পেয়ারমেন্ট (MCI) থেকে ডিমেনশিয়ায় যাওয়ার পথে কম অগ্রসর হন। এমনকি যারা গবেষণাকালীন সময়ে বিধবা হন, তাদের মধ্যেও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কম দেখা গেছে।
তবে এই অপ্রত্যাশিত ফলাফলের পেছনে কারণ কী হতে পারে?
হতে পারে, বিয়ে করা মানুষজনের ক্ষেত্রে তাদের জীবনসঙ্গী মেমোরি বা স্মৃতিশক্তি সমস্যা দ্রুত টের পান এবং ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। এতে করে তাদের মধ্যেই বেশি ডিমেনশিয়া ধরা পড়ে। অথচ বাস্তবে হয়তো এটা সবার মাঝেই সমানভাবে হচ্ছে, এটাই হতে পারে তথাকথিত “ascertainment bias” বা শনাক্তকরণ পক্ষপাত। মানে, যাদের সমস্যাটা আগেভাগে চোখে পড়ছে বা ধরা পড়ছে, তাদের সংখ্যাই কেবল বেশি দেখা যাচ্ছে।
তবে এই যুক্তির শক্তি বেশি নয়। কারণ, গবেষণার অংশগ্রহণকারী সবারই প্রতিবছর একজন চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ ছিল, যাকে এক রকম জীবনসঙ্গীর মতো ভাবা যায়—যিনি প্রাথমিক লক্ষণগুলো ধরতে পারতেন।
এছাড়াও, সম্ভবত গবেষণায় ব্যবহৃত যে ডেটা সেট, সেটা পুরো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না। এই ডেটা এসেছিল National Alzheimer’s Coordinating Center (NACC) থেকে। এই নমুনায় জাতিগত এবং আয়ের বৈচিত্র্য খুব কম ছিল। প্রায় ৬৪% অংশগ্রহণকারীই ছিলেন বিবাহিত। তাই এই ফলাফলগুলো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য সত্যি কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। হয়তো এ ফলাফল শুধু এই নির্দিষ্ট দলের জন্যই প্রযোজ্য।
তবে আরও সম্ভবত, এই গবেষণা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বিয়ে বা বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত, বিচ্ছেদ বা সঙ্গী হারানোর মতো জীবনের পরিবর্তনগুলো মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে কতটা জটিল প্রভাব ফেলে। বিয়ে যে ডিমেনশিয়ার বিরুদ্ধে নিশ্চিত রক্ষাকবচ—এমনটা একেবারেই নিশ্চিত নয়। এর আগেও একটি বড় ধরনের মেটা-অ্যানালাইসিস এই বিষয়টিকে ঘিরে মিশ্র ফলাফলই দেখিয়েছে।
ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির এই নতুন গবেষণা এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় আকারের গবেষণাগুলোর একটি এবং এটিকে গুরুত্ব দিয়েই দেখা উচিত। এটি থেকে বোঝা যায়, আগের ধারণাগুলো—যেমন, বিধবা হওয়া বা বিবাহবিচ্ছেদ মানেই এমন মানসিক চাপ, যা অ্যালঝেইমার সৃষ্টি করতে পারে, কিংবা অবিবাহিত মানেই সামাজিকভাবে একাকী এবং তাই ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিতে বেশি—এসব সবসময় ঠিক নয়।
সম্পর্কের জটিলতা কোনোভাবেই সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব সম্পর্ক “দ্বৈত ফলাফল” নয় বরং অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও জটিল। যেমন, কারো দাম্পত্য জীবন কেমন, বিচ্ছেদের পর কেউ কতটা মানসিক শান্তিতে আছে, কোনো সংস্কৃতিতে বিয়ে নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন, অবিবাহিত মানুষেরা কেমন সামাজিক পরিবেশে থাকে—এসবই ফলাফলের পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : The Conversation

