খেলার মাঠে, সিনেমার পর্দায় কিংবা বাস্তব জীবনের প্রতিযোগিতায় একটি দৃশ্যের বারবার দেখা মেলে। যখন একটি দুর্বল দল তুলনামূলক শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হয় তখন অনেক নিরপেক্ষ দর্শকই অদ্ভুতভাবে দুর্বল দলটির পক্ষ নিতে শুরু করে। তারা চায় অসম্ভবকে সম্ভব করে সেই দলটি জিতে যাক। তারা চায় এই দলটি আরেকটু ভালো কিছু ডিজার্ভ করে। কিন্তু কেন?
মনোবিজ্ঞানে এই ধরনের প্রবণতাকে Underdog Effect বলা হয়। এটি এমন একটি মানসিক প্রবণতা, যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সেই ব্যক্তি বা দলের প্রতি সমর্থন অনুভব করে, যাদের সম্পদ কম, ক্ষমতা কম, সুযোগ কম বা জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্ক শুধু ফলাফল দেখে না, বরং সংগ্রামের গল্পকেও মূল্যায়ন করে। যখন আমরা দেখি কোনো দল বা ব্যক্তি সীমিত সামর্থ্য নিয়ে বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়ছে, তখন তাদের মধ্যে আমরা নিজেদের অনেক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাই। কারণ বাস্তব জীবনেও বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ কিংবা শক্তিশালী নয় বরং সংগ্রামী বা অবহেলিত হিসেবেই মনে করে। ফলে দুর্বল দলের লড়াই আমাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের লড়াই বলে মনে হয়।
এর পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ন্যায্যতার অনুভূতি। সাধারণত মানুষ চায় প্রতিযোগিতা ভারসাম্যপূর্ণ বা সমানে-সমানে হোক। যখন একটি দলকে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে হয়, তখন অনেকের মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুর্বল দলের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি সামাজিক সহযোগিতা ও ন্যায়বিচারবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গভীর মানবিক প্রবণতা।
Underdog Effect-এর সঙ্গে ডোপামিনেরও সম্পর্ক থাকতে পারে। যদি দুর্বল দলটি সত্যিই জিতে যায়, তাহলে সেটি আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। আর মস্তিষ্ক সাধারণত এই অপ্রত্যাশিত ইতিবাচক ঘটনায় বেশি আনন্দ অনুভব করে। তাই শক্তিশালী দলের প্রত্যাশিত জয়ের চেয়ে দুর্বল দলের অপ্রত্যাশিত জয় মানুষের মনে অনেক বেশি উত্তেজনা ও আনন্দ সৃষ্টি করতে পারে।
তাহলে মানুষ কেন সবসময় দুর্বল দলকে সমর্থন করে না? এক্ষেত্রে একটি মজার বিষয় হলো, মানুষ সব সময় দুর্বল পক্ষকে সমর্থন করে না। গবেষণায় দেখা গেছে, যদি কোনো দুর্বল দলকে অযোগ্য, অলস বা অসৎ মনে হয়, তাহলে সমর্থনের সেই সহানুভূতি দ্রুত কমে যায়। অর্থাৎ মানুষ শুধু দুর্বলতাকে নয় বরং সংগ্রাম, চেষ্টা এবং সাহসকে পুরস্কৃত করতে চায়।
এ কারণেই খেলাধুলার ইতিহাসে অনেক Fairy Tale Run এত বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যখন ছোট কোনো ক্লাব বড় বড় দলকে হারিয়ে এগিয়ে যায় অথবা কম পরিচিত কোনো খেলোয়াড় বিশ্বসেরাদের সাথে পাল্লা দেয়, তখন কোটি কোটি মানুষ তাদের গল্পের সঙ্গে মনের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ে। কারণ সেই জয়ে তারা শুধু একটি দলের সাফল্য দেখে না, বরং অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্নও দেখে।
তাই এরপর থেকে যদি স্পেনের বদলে কেপ ভার্দে অথবা জার্মানির বদলে কুরাসাও-এর জয় বেশি প্রত্যাশা করেন, তাহলে জানবেন এর পেছনে রয়েছে মনোবিজ্ঞান। রয়েছে সেই Underdog Effect নামক মনোবিজ্ঞান, যার কারণে আমরা শুধু জয়ই দেখতে চাই না, দেখতে চাই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই কিংবা অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস।
