প্রাডার-উইলি সিন্ড্রোম (Pradar -Willi  বা PWS)একটি বিরল কিন্তু জটিল জিনগত রোগ যা মানুষের শৈশবকাল থেকে শুরু করে সারাজীবনে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। জন্মের সময় শিশুরা কম খায়, দুর্বল থাকে, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক প্রচুর ক্ষুধা, স্থূলতা ও শারীরিক-মানসিক নানা জটিলতা দেখা দেয়। চলুন, এই বিরল অসুখটি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।

কারা এই রোগে আক্রান্ত হন?

বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০,০০০ থেকে ৩০,০০০ জনের মধ্যে মাত্র একজন এই সিনড্রোমে আক্রান্ত হন। এটি নারী ও পুরুষ—উভয়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায় এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ঘটতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি পারিবারিকভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে আসে না, বরং শিশুর বিকাশের সময়ই হঠাৎ করে জিনগত পরিবর্তনের কারণে এটি ঘটে।

যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ মানুষ এই রোগে ভুগছেন।

কেন হয় এই সিনড্রোম?

এই রোগটি জন্মের আগে, অর্থাৎ শিশুর ভ্রূণ অবস্থাতেই সৃষ্টি হয়। কারণ, এটি হয় জিনগত (genetic) একটি ত্রুটির কারণে।

এই সিনড্রোমের মূল কারণ হলো, ১৫ নম্বর ক্রোমোজোমে থাকা কিছু বিশেষ জিন সঠিকভাবে কাজ না করা। সাধারণত, আমরা প্রতিটি ক্রোমোজোমের একটি কপি মায়ের কাছ থেকে ও একটি বাবার কাছ থেকে পাই। এর মধ্যে ১৫ নম্বর ক্রোমোজোমে যদি বাবার পক্ষ থেকে আসা কিছু জিন অনুপস্থিত বা ত্রুটিপূর্ণ হয়, তখনই এই রোগ হয়। এটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া জেনেটিক পরিবর্তনের (mutation) ফলে হয়।

মায়ের কপিটিও থাকে, কিন্তু ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের জিনগুলো প্রাকৃতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে। ফলে কার্যকরী জিন না থাকায় শরীরে নানা সমস্যা দেখা দেয়।

লক্ষণগুলো কেমন?

শিশুকালে

দুর্বল পেশি (হাইপোটোনিয়া) , কোলে নিলে শরীর ঢিলে ঢালা লাগে। খাওয়াতে কষ্ট হয়, ওজন বাড়ে না। শিশুর বিকাশ দেরিতে হয়, যেমন হাঁটা, বসা, কথা বলা। কিছুটা ভিন্ন মুখাবয়ব দেখা যায়—পাতলা উপরের ঠোঁট, বাদাম-আকৃতির চোখ, সরু মুখ, ইত্যাদি।

বয়স বাড়ার সাথে

প্রায় ২-৮ বছর বয়সের মধ্যে অতিরিক্ত ক্ষুধা (Hyperphagia)– তারা সব সময় খেতে চায়, ফলে মোটা হয়ে যায়। ক্ষুধা এত বেশি হয় যে অনেক সময় খাবার চুরি করতেও দেখা যায়। এর ফলেই তৈরি হয় স্থূলতা, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা ইত্যাদি। হরমোনের ঘাটতির কারণে যৌনাঙ্গের অপরিপক্বতা। তাদের আচরণগত সমস্যা থাকে (রাগ, জেদ, OCD-এর মতো আচরণ)।

অন্যান্য লক্ষণ:
  • উচ্চতা ছোট হওয়া (হরমোনের ঘাটতির কারণে) 
  • ত্বক ও চুলের রঙ হালকা (রঙ্গকের অভাবে)
  • যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক বিকাশ না হওয়া
  • ঘুমের সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্যের জটিলতা
  • হালকা থেকে মাঝারি মানসিক বিকাশ প্রতিবন্ধকতা।
চিকিৎসা ও যত্ন 

এই সিনড্রোমের এখনো স্থায়ী কোনও প্রতিকার নেই। তবে লক্ষণ অনুযায়ী বিভিন্নভাবে চিকিৎসা করা যায়।

  • শৈশবে : খাওয়ানোর জন্য বিশেষ পদ্ধতি ও উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত খাবার প্রয়োগ করা হয়।
  • গ্রোথ হরমোন থেরাপি : এই থেরাপি পেশির শক্তি বাড়ায়, উচ্চতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং শরীরের চর্বি কমায়।
  • থেরাপি : শারীরিক থেরাপি, স্পিচ থেরাপি এবং মনো-চিকিৎসা – সবই রোগীর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
  • ওষুধ : ২০২৫ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের FDA প্রথমবারের মতো অতিরিক্ত ক্ষুধা কমানোর জন্য একটি ওষুধ অনুমোদন করেছে, যা ৪ বছর বা তার বেশি বয়সী রোগীদের জন্য ব্যবহারযোগ্য।

জীবনের মান কেমন হতে পারে 

 যথাযথ চিকিৎসা ও যত্ন পেলে প্রাডার-উইলি সিনড্রোমে আক্রান্ত মানুষ অনেক ভালোভাবে জীবন কাটাতে পারেন এবং অনেকেই ৭০ বছর পর্যন্ত বাঁচেন। তবে যদি ওজন, ডায়াবেটিস কিংবা হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে না রাখা যায়, তাহলে ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং অনেক সময় ৪০ বছর বয়সের মধ্যেই মৃত্যু ঘটতে পারে।

তাই রোগী ও তার পরিবারের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা, সুশৃঙ্খল খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাডার-উইলি সিনড্রোম একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে তোলে, অন্যদিকে সঠিক পরিচর্যা ও ভালোবাসা পেলে আক্রান্ত শিশুটিও জীবনে অনেক কিছু অর্জন করতে পারে।

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply