আমরা প্রায়ই একটি ভুল ধারণা শুনে থাকি যে, শুক্রাণু বাতাসের সংস্পর্শে এলে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। বাস্তবতা কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। এই ক্ষুদ্র কোষগুলো মানুষের প্রজনন ব্যবস্থায় এমন এক জটিল ও অবিশ্বাস্য যাত্রায় নামে, যা তাদের বেঁচে থাকার ক্ষমতাকে ঘিরে তৈরি করেছে নানা বিস্ময়। শুক্রাণুর জীবনের দৈর্ঘ্য নির্ভর করে সে কোথায় আছে, পরিবেশের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং তার শক্তি সরবরাহের উপরে। আর এইসব কিছুর সমন্বয়ে তাদের বেঁচে থাকার সময় হতে পারে কয়েক মিনিট থেকে শুরু করে কয়েক দশক পর্যন্ত!

শুক্রাণুর সৃষ্টি হয় পুরুষের অণ্ডকোষে। সেখান থেকে তারা একটি সরু, পাকানো নালির মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে—এই নালির নাম ইপিডিডাইমিস। এই যাত্রায় প্রায় ১০ দিন সময় লাগে। এরপর তারা পৌঁছে যায় একটি রিজার্ভারে, যেখানে তারা কার্যক্ষমতা হারালেও জীবিত থাকে। গবেষক ব্রেট নিকসন জানান, এই রিজার্ভারে শুক্রাণু প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, যদিও তখন তারা “স্লিপ মোডে” থাকে—অর্থাৎ জীবিত থাকলেও নিষ্ক্রিয়।

কিন্তু এই সুরক্ষিত অবস্থান ছেড়ে, যখন শুক্রাণু শরীরের বাইরের জগতে প্রবেশ করে, তখন শুরু হয় তাদের জীবনের বিপদসংকুল অধ্যায়। আমরা অনেকেই শুনেছি, শুক্রাণু বাতাসে এলেই মারা যায়। কিন্তু বিজ্ঞান এটাকে অতটা সরল বিষয় নয় বলে দাবি করে। আসলে আর্দ্রতার অভাবই শুক্রাণুর মৃত্যু ঘটায়, অক্সিজেন নয়।

যদি শুক্রাণু শরীরের বাইরে কোনো শুষ্ক স্থানে পড়ে, আর তার চারপাশে কোনো তরল না থাকে, তাহলে তারা কয়েক মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। কারণ তারা সাঁতারের মাধ্যমে চলাচল করে, তাই টিকে থাকতে হলে ভেঁজা পরিবেশ লাগবে যেখানে তারা সাঁতার কাটতে পারবে আর যেখানে চারপাশে সাঁতারের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকে তাহলে তখন তারা মারা যাবে।

কিন্তু একেবারে ভিন্ন চিত্র দেখা যায় গবেষণাগারে। সঠিক তাপমাত্রা, পুষ্টি ও তরল পরিবেশে শুক্রাণুকে যদি ইঞ্জেকশন বা ইনকিউবেটরের মাধ্যমে রাখা হয়, তবে তারা ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এর চেয়েও বেশি দিন ধরে শুক্রাণুকে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় হিমায়িত করে। ব্রেট নিকসন বলেন, “যদি সঠিকভাবে ফ্রিজিং করা যায়, শুক্রাণু বহু বছর বা এমনকি দশকও বেঁচে থাকতে পারে।” এজন্যই আজকাল ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ চিকিৎসায় শুক্রাণু সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

IVF পদ্ধতিতে শুক্রাণু সংরক্ষণ

কিন্তু মানুষের শরীরের ভেতর, শুক্রাণুর আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হয় যখন তারা নারীর প্রজনন পথে প্রবেশ করে। এই পথ পেরিয়ে ডিম্বানুরর কাছে পৌঁছাতে তাদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই যাত্রার মধ্যেও তারা অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারে। কিছু গবেষণায় পাওয়া গেছে, শুক্রাণু কখনো কখনো ২৮ দিন পর্যন্তও নারীর দেহে টিকে থাকতে পারে, যদিও এমন ঘটনা বিরল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, বিজ্ঞানীরা ধরে নেন যে শুক্রাণু প্রায় সাত দিন পর্যন্ত নারীর শরীরে বেঁচে থাকে। কারণ কেউ যদি ডিম্বানু নিঃসরণের সাত দিন আগেও যৌন সম্পর্ক করে, তখনও গর্ভধারণের প্রায় ৫ শতাংশ সম্ভাবনা থেকে যায়।

এখন প্রশ্ন হলো—শুক্রাণু কিভাবে এতদিন বাঁচে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবিষ্কার করেছেন। প্রথমত, শুক্রাণু নিজেরাই কিছু শক্তি ধারণ করে রাখে। তাদের শরীরের ভেতরে শক্তি উৎপাদনের পদ্ধতিও আছে। যখন শক্তি কমে যায়, তখন তারা শক্তি ব্যবহার করার পদ্ধতি বদলে ফেলে, যাতে করে কম শক্তিতে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারে। এছাড়া, শুক্রাণুকে বহন করা সেমিনাল ফ্লুইডে (বীর্যরস) থাকে নানা ধরণের পুষ্টিকর উপাদান—যেমন জিঙ্ক ও প্রোটিন, যা শুক্রাণুকে সাপোর্ট করে।

দ্বিতীয়ত, নারীর প্রজনন পথ নিজেই শুক্রাণুর জীবন রক্ষায় সাহায্য করে। এই পথে শুক্রাণু গ্লুকোজের মতো শক্তি সরবরাহ পায়। গবেষক ক্রিস্টোফার ব্যারাট বলেন, “শুক্রাণুর নিজের শক্তি পাঁচ বা সাত দিন পর্যন্ত টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়, তাদের নারী দেহ থেকেই পুষ্টি নিতে হয়।”

তৃতীয়ত, শুক্রাণুর যাত্রা সোজা-সাপ্টা নয়। অনেক সময় তারা দৌড়ে না গিয়ে রাস্তায় কিছু “বিশ্রাম কেন্দ্র” খুঁজে নেয়। যেমন, ফ্যালোপিয়ান টিউবের নিচের অংশে, তারা শরীরের কোষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অপেক্ষা করতে পারে। এই “ডকিং স্টেশন”-গুলোতে তারা নিরাপদে অবস্থান করতে পারে এবং যখন ডিম নিঃসৃত হয়, তখন আবার তারা গন্তব্যে ছুটে যায়।

পশুদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, এই “ডকিং স্টেশন”-এ শুক্রাণু যখন কোষের গ্লাইকান নামক এক ধরনের চিনির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তারা আরও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে এবং আরও কার্যক্ষম হয়। এই কোষগুলো হয়তো শুক্রাণুকে কিছু পুষ্টি বা সংকেত পাঠায়, যেগুলো তাদের জীবন বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটা মানুষের দেহে কিভাবে কাজ করে, সেটা এখনো পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়নি। ব্যারাট বলেন, “বেশ কিছু ডেটা আছে, যেগুলো দেখায় শুক্রাণু ও ওভিডাক্ট একে অপরকে সংকেত পাঠায়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।”

এইসব কারণেই, শুক্রাণু যদি শরীরের ভেতরে কয়েক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, তাহলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। ব্যারাট বলেন, “ডিম্বানু নিঃসরণের আগের দিনগুলোতে যৌন সম্পর্ক থাকলেও শুক্রাণু যদি শরীরে অপেক্ষা করতে পারে, তাহলে ডিম বের হলেই তারা কাজ করতে পারে। এইটাই তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।”

মানুষ ছাড়াও, অনেক প্রাণীর শুক্রাণু আরও দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারে। গবেষক নিকসন বলেন, “কিছু বাদুড়ের শুক্রাণু ছয় মাস পর্যন্ত নারীর শরীরে বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি কিছু সরীসৃপের ক্ষেত্রে এটা বছরের পর বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।” তবে তারা কীভাবে এত দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে—এই রহস্য এখনো বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি বোঝেননি।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : Live Science

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Most Voted
Newest Oldest
Inline Feedbacks
View all comments