মানুষের মস্তিষ্ক এক বিস্ময়কর জগত। এই জগতের অন্দরমহলে প্রতিনিয়তই জন্ম নেয় হাজারো ভাবনা, কল্পনা আর অনুভূতি—যার অনেক কিছুই আমাদের ইচ্ছা সীমার বাইরে। দিবাস্বপ্ন দেখা এই কল্পনার জগতেরই এক সাধারণ প্রকাশ, যা আমাদের মানসিক বিশ্রাম, সৃজনশীলতা কিংবা বাস্তবতা থেকে সাময়িক অবসর নিতে সাহায্য করে। কিন্তু যদি এই দিবাস্বপ্ন অস্বাভাবিক মাত্রায় দীর্ঘস্থায়ী হয়? যদি কল্পনার সেই রঙিন জগতই এক সময় বাস্তব জীবনকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে? যদি কোনো ব্যক্তি দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, একটি কল্পিত গল্পের ভিতরে নিজেকে ডুবিয়ে রাখেন—এতটাই গভীরে যে পরিবার, সমাজ বা কাজের প্রতি দায়িত্বজ্ঞান ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়?
এই অবস্থাকেই বলা হয় মালঅ্যাডাপ্টিভ ডেড্রিমিং (Maladaptive Daydreaming)—একটি তুলনামূলকভাবে নতুন ও আলোচিত মানসিক অবস্থা, যেখানে দিবাস্বপ্ন কেবলমাত্র নিস্পাপ কল্পনা নয়, বরং এক ধরনের মানসিক যন্ত্রণা ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখানে ব্যক্তি এমন সব চিন্তা করে যা কখনোই ঘটবে না। যদিও এটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য নির্ণায়ক ম্যানুয়ালগুলিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তবে বিশ্বের বহু মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক একে স্বতন্ত্র একটি মানসিক ব্যাধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন।
কোন বৈশিষ্ট্যগুলো এটিকে আলাদা করে?
সাধারণ দিবাস্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। কেউবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনে, কেউবা পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে। কিন্তু মালঅ্যাডাপ্টিভ ডেড্রিমিয়েং-এর ক্ষেত্রে ব্যক্তি এমন এক কাল্পনিক জগতে ঢুকে পড়ে যা প্রায় সিনেমার মতো স্পষ্ট, ধারাবাহিক এবং দীর্ঘস্থায়ী। অনেক সময় সেই কল্পনার গল্পে একই চরিত্র বা কাহিনি বছরের পর বছর ধরে চলে, যেন ব্যক্তি নিজের মস্তিষ্কে একটি ব্যক্তিগত নাট্যমঞ্চ পরিচালনা করছেন।
এই দিবাস্বপ্ন সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট উদ্দীপনার প্রভাবে শুরু হয়—যেমন আবেগপ্রবণ সঙ্গীত, একঘেয়ে হাঁটা বা দৌড়ানো, কিংবা গাড়ি চালানোর মতো পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ। এই সময়কার অনুভূতিগুলো এতটাই বাস্তব মনে হয় যে হাসি, কান্না, উত্তেজনা, হতাশা—সবই ব্যক্তি বাস্তবেই অনুভব করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রেই এই কল্পনার জগত বাস্তবের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা ব্যক্তির কাজ, পড়াশোনা বা সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
কোথা থেকে জন্ম নেয় এই প্রবণতা?
Maladaptive Daydreaming-এর পেছনে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে যেসব ব্যক্তি শারীরিক বা মানসিক আঘাত পেয়েছেন, তারা বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বাঁচার উপায় হিসেবে কল্পনার এক আশ্রয় তৈরি করে নেন। এটা অনেকটা আত্মরক্ষার প্রক্রিয়া—বাস্তবের তীব্র যন্ত্রণা থেকে পালাতে গিয়ে কল্পনার এক নিরাপদ জগৎ গড়ে তোলা।
এছাড়া বিষণ্নতা, উদ্বেগ, শুচিবাই (OCD) এবং বিচ্ছিন্নতাজনিত মানসিক ব্যাধির (dissociative disorders) সঙ্গেও Maladaptive daydreaming-এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এসব সমস্যায় আক্রান্ত অনেক রোগীর মধ্যে চারটিরও বেশি মানসিক রোগের লক্ষণ একসাথে দেখা গেছে। আর একবার যদি দিবাস্বপ্ন দেখা একটি আরামদায়ক অভ্যাসে পরিণত হয়, তা ধীরে ধীরে এক ধরনের আসক্তি এবং বাধ্যতামূলক আচরণে রূপ নেয়। তবে ব্যক্তিভেদে এর প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে।
কীভাবে বোঝা যাবে?
Maladaptive Daydreaming-এর লক্ষণগুলো নির্দিষ্ট কিছু আচরণ দিয়ে চিহ্নিত করা যায়। দিনের একাধিক সময় ধরে কল্পনার ভেতরে ডুবে থাকা, বাস্তব অভিজ্ঞতা বা ঘটনা থেকে হঠাৎ দিবাস্বপ্ন শুরু হয়ে যাওয়া, দিবাস্বপ্ন দেখার সময় অজান্তে কথা বলা বা শরীর নাড়াচাড়া করা এবং দিবাস্বপ্ন বন্ধ করতে না পারার অসহায়তা—এই সবই এর সাধারণ উপসর্গ। অনেকেই নিজেদের আচরণ সম্পর্কে লজ্জিত থাকেন এবং বিষয়টি পরিবার বা চিকিৎসকের কাছেও গোপন রাখেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, একেকজন ব্যক্তি দিনে চার ঘণ্টারও বেশি সময় এই কল্পনার জগতে কাটিয়ে দেন, ফলে বাস্তব জীবনের কাজ বা সম্পর্ক ধীরে ধীরে ব্যাহত হতে শুরু করে। মালঅ্যাডাপ্টিভ ডেড্রিমিয়েং স্কেল (MDS) নামে একটি স্ব-প্রতিবেদনমূলক প্রশ্নমালা ব্যবহার করে এই সমস্যার মাত্রা মূল্যায়ন করা হয়। এছাড়া SCIMD নামের একটি কাঠামোবদ্ধ ক্লিনিকাল সাক্ষাৎকার পদ্ধতি বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইসরায়েলের এক গবেষণায় জনসংখ্যার প্রায় ২.৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা গেছে।
মুক্তির উপায় কী?
এটি একটি নবীন মানসিক অবস্থা হওয়ায় এখনো এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে বিভিন্ন থেরাপি এবং জীবনধারাভিত্তিক কৌশল এই অবস্থার লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি (CBT) এবং মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন—এই দুটি পদ্ধতি কল্পনার সময় হ্রাস, বাস্তব জীবনে মনোযোগ বৃদ্ধি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হতে পারে। ঘুমের মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, এবং নির্দিষ্ট আবেগপ্রবণ উদ্দীপনা (যেমন গান বা চলাফেরা) সীমিত করার মতো অভ্যাসও ফলপ্রসূ হতে পারে।
চিকিৎসার পাশাপাশি, ফ্লুভোক্সামিন জাতীয় কিছু ওষুধও প্রয়োগ করা হয়েছে, বিশেষ করে যখন এই প্রবণতা OCD এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। তবে ওষুধ ব্যবহার এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ব্যক্তি যেন তার অভিজ্ঞতা গোপন না রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কারো সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন।
মালঅ্যাডাপ্টিভ ডেড্রিমিয়েং এমন একটি অবস্থা, যা একদিকে ব্যক্তি মানসিক শান্তি ও সৃষ্টিশীলতা খুঁজে পান, অপরদিকে বাস্তব জীবনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এই দ্বৈততার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিরা এক জটিল মানসিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যান। সঠিক সচেতনতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার এবং গবেষণার মাধ্যমে এই সমস্যার সঠিক রূপ শনাক্ত ও সমাধানের পথ সুগম করা সম্ভব। আর সবচেয়ে বড় কথা, কল্পনার জগৎকে যেন কখনও বাস্তবের বিকল্প ভাবা না হয়—এই উপলব্ধিটাই হতে পারে প্রথম মুক্তির চাবিকাঠি।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : National Institute of Health, Harvard Health, Cleveland Clinic, WebMD

