আমাদের ত্বকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়াল বা ফাঙ্গাল সংক্রমণ হয়ে থাকে এর মধ্যে রিংওয়ার্ম বা দাদ অন্যতম। এটি মূলত এক ধরনের ছত্রাক যা শরীরের বিভিন্ন অংশে হতে পারে এবং একজনের থেকে আরেকজন সংক্রমিত হতে পারে। চলুন সংক্ষেপে জেনে নিই, রিংওয়ার্ম বা দাদ আসলে কী, এর উপসর্গ কী এবং এ থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়।

রিংওয়ার্ম (Ringworm) বা দাদ হলো একটি খুব সাধারণ এবং ছোঁয়াচে ছত্রাকজনিত চর্মরোগ। এই রোগের নাম ‘রিংওয়ার্ম’ তবে এর সঙ্গে কৃমির (worm) কোনো সম্পর্ক নেই। এর কারণ হলো, ত্বকে এটি হলে লালচে বা বাদামী রঙের গোলাকার বা আংটির মতো রিং তৈরি হয় যা দেখতে অনেকটা কৃমির মতো লাগে।

এটি মূলত ডার্মাটোফাইট নামে পরিচিত ছত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে, যার মধ্যে Trichophyton, Microsporum ও Epidermophyton প্রজাতি অন্যতম। ছত্রাকগুলো শরীরের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন:

শরীরের ত্বকে হলে: টিনিয়া কর্পোরিস (Tinea corporis)

মাথার ত্বকে হলে: টিনিয়া ক্যাপিটিস (Tinea capitis)

পায়ে হলে: টিনিয়া পেডিস (Tinea pedis) বা অ্যাথলেটস ফুট

কুঁচকিতে হলে: টিনিয়া ক্রুরিস (Tinea cruris) বা জক ইচ


দাদের প্রধান লক্ষণসমূহ হলো :

• ত্বকে গোলাকার, লালচে এবং চুলকানি যুক্ত দাগ দেখা দেয়।

• দাগের কিনারা উঁচু হয়, মাঝের অংশ সাধারণত স্বাভাবিক থাকে।

• আক্রান্ত স্থান থেকে আঁশ বা শুকনো চামড়া উঠে আসতে পারে।

• মাথার ত্বকে দাদ হলে চুল ভেঙে যায় এবং টাকের মতো ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়।

এই ছত্রাক মূলত ত্বক, চুল ও নখের কেরাটিন খেয়ে বেঁচে থাকে। এটি খুব সাধারণ হলেও, সময়মতো চিকিৎসা না করলে দাদ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আঁচড়ানোর কারণে ক্ষতের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া ঢুকে দ্বিতীয় সংক্রমণ ঘটাতে পারে যা ফোঁড়া, পুঁজ বা ফোস্কার সৃষ্টি করে। অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে ত্বক গভীরভাবে আক্রান্ত হলে কালো বা সাদা দাগ থেকে যায় যা অনেক সময় স্থায়ী হয়। সাধারণত শিশু, কিশোর, ডায়াবেটিস রোগী বা অতিরিক্ত ঘাম হওয়া মানুষের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়।

রিংওয়ার্ম  হলে করণীয় পদক্ষেপ :

• ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিফাঙ্গাল মলম ব্যবহার করতে হবে ৩–৪ সপ্তাহ, দিনে অন্তত দুইবার আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার ও শুকিয়ে লাগানো।

• আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার ও শুকনো রাখা, ভেজা বা আঁটসাঁট কাপড় এড়িয়ে চলা।

• ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আলাদা রাখা, যেমন তোয়ালে, চিরুনি, জামা অন্যের সঙ্গে ব্যবহার না করা।

• চুলকানো এড়িয়ে চলা, কারণ ঘষাঘষি করলে সংক্রমণ ছড়ায়। বেশি চুলকানি হলে ডাক্তার পরামর্শে অ্যান্টিহিস্টামিন ট্যাবলেট রাতে একবার করে সেবন করা যেতে পারে।

• কাপড় ও বিছানার চাদর নিয়মিত গরম পানিতে ধোয়া ও রোদে শুকানো।

• স্টেরয়েড জাতীয় মলম ব্যবহার না করা, কারণ এতে রিংওয়ার্ম ছড়ায় এবং জটিল হয়।


দাদ এর ক্ষেত্রে কিছু ঘরোয়া উপায় অবলম্বন করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। যেমন :

রসুন: পেস্ট তৈরি করে আক্রান্ত স্থানে ২০–৩০ মিনিট লাগিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। রসুনে থাকা অ্যালিসিন ছত্রাক নাশক, তাই এটি দাদ ও চুলকানি কমাতে সাহায্য করে।

টি ট্রি অয়েল: নারিকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে দিনে ২ বার ব্যবহার। এতে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিসেপটিক উপাদান ছত্রাক মারতে ও সংক্রমণ কমাতে সহায়ক।

হলুদ: সামান্য নারিকেল তেলের সঙ্গে পেস্ট বানিয়ে লাগানো ও শুকানোর পর ধুয়ে ফেলা। হলুদের কারকিউমিন প্রদাহ কমায় এবং ত্বকের সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

অ্যালোভেরা: জেল দিনে কয়েকবার আক্রান্ত স্থানে লাগানো। এটি প্রদাহ নাশক ও ত্বক ঠান্ডা রাখে, ফলে চুলকানি কমে আর আরাম পাওয়া যায়।

আপেল সিডার ভিনেগার: তুলো দিয়ে দিনে ২–৩ বার আক্রান্ত স্থানে লাগানো। এতে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান সংক্রমণ কমাতে ও ত্বক শুষ্ক রাখতে সহায়ক।

রিংওয়ার্ম দেখতে সাধারণ এবং হালকা ধরনের একটি ত্বক রোগ মনে হলেও এর প্রভাব কখনোই ছোট করে দেখার মতো নয়। শুরুতে সামান্য লালচে দাগ ও চুলকানি হলেও চিকিৎসা না করলে এটি ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে ফোঁড়া, ক্ষত বা স্থায়ী দাগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু, ডায়াবেটিস রোগী বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের ক্ষেত্রে এটি দ্রুত জটিল হতে পারে।

তবে আশার বিষয় হলো, সঠিক সময়ে শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করলে সংক্রমণ সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নিয়মিত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ ব্যবহার, শরীর পরিষ্কার রাখা, শুকনো জামাকাপড় পরিধান করা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা রিংওয়ার্ম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা ও নিজস্ব জিনিসপত্র আলাদা রাখা অত্যন্ত জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, দাদকে অবহেলা না করে শুরুতেই চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা—এই দুইটিই রিংওয়ার্ম থেকে মুক্ত থাকার মূল চাবিকাঠি। সচেতনতা ও সঠিক পদক্ষেপই আমাদের এই অস্বস্তিকর সংক্রমণ থেকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

লেখক : মাহিয়ান মিন

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply