বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শুধু ২০২৩ সালেই ৩ লাখ ২১ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে ১,৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রচলিত কীটনাশক-ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যর্থ হচ্ছে মূলত দুই কারণে—প্রথমত, শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত কীটনাশক ছিটানো সম্ভব হয় না। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় এডিস মশারা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

এই সংকটে বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আশার আলো দেখাচ্ছে উলবাকিয়া (Wolbachia) নামের একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া। সম্প্রতি Scientific Reports জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্থানীয় Aedes aegypti মশার মধ্যে উলবাকিয়া সংযোজন করে ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ানোর হার ৯২.৭% পর্যন্ত কমানো সম্ভব। গবেষণাটি হাসান মোহাম্মদ আল-আমিন এর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে।

উলবাকিয়া মশার দেহে ভাইরাসের বিস্তারে বাধা দেয়। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিলের মতো দেশে এ পদ্ধতিতে ডেঙ্গু অনেকাংশে কমেছে। গবেষকরা ঢাকার স্থানীয় মশার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন এক ধরনের মশা তৈরি করেছেন, যার নাম wAlbB2-Dhaka। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই মশাগুলোর দেহে ডেঙ্গু ভাইরাস কম, আর এদের লালায় ভাইরাস প্রায় নেই বললেই চলে।

এই মশাগুলোর জীবনচক্র, ডিম ফোটার হার এবং কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা স্থানীয় মশার মতোই। ফলে প্রকৃতিতে ছাড়লে তারা টিকে থাকতে পারবে। সবচেয়ে বড় সুবিধা—উলবাকিয়া-যুক্ত মশারা প্রজননের সময় ভাইরাসবিহীন পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি করে এবং সাধারণ মশার সঙ্গে মিললে ডিম নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, ফলে ধীরে ধীরে উলবাকিয়া-যুক্ত মশার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, wAlbB2-Dhaka মশা ১০০% হারে এই বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে, অর্থাৎ কোনো সাধারণ মশার সাথে মিলিত হলে তাদের ডিম নিষ্ফল হয়। তাছাড়া wAlb স্ট্রেন ৩৭ ডিগ্রি তাপমাত্রাতেও কার্যকর, যা বাংলাদেশের আবহাওয়ার জন্য উপযোগী। এমনকি ১৬ সপ্তাহ পরও এদের ডিম ফোটার হার স্বাভাবিক থাকে।

তবে ল্যাব পরীক্ষার সফলতা মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হবে কি না, তা বুঝতে ফিল্ড ট্রায়াল দরকার। স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতনতা ও সম্মতি ছাড়া এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে সফলভাবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরেও এ প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে—এই বিশ্বাস গবেষকদের।

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।

একটি মন্তব্য

Leave A Reply