ইতালির মাঝখানে অবস্থািত এক বিশাল পাহাড়ের নিচে, বিজ্ঞানীরা এক ধরনের রহস্যময় কণিকার খোঁজে গবেষণা চালাচ্ছেন। যার নাম “ডার্ক ম্যাটার”। এই ডার্ক ম্যাটার আমাদের চোখে দেখা যায় না, আলো শোষণ বা প্রতিফলনও করে না—তবু বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, মহাবিশ্বে থাকা অধিকাংশ ভরই এই ডার্ক ম্যাটার দিয়ে তৈরি। কিন্তু যেহেতু এটা কোনো যন্ত্রেই সরাসরি ধরা পড়ে না, তাই একে খুঁজে পাওয়া বিশ্বের অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ।
এই কণিকাকে খুঁজে বের করতে বিজ্ঞানীরা একটা বিশেষ ফাঁদ তৈরি করেছেন। তারা একটি বিশাল ধাতব ট্যাংকের মধ্যে ৩.৫ টন তরল জেনন গ্যাস ভরে রেখেছেন। এই জেনন গ্যাস এক ধরনের ‘নোবেল গ্যাস’, অর্থাৎ এটি রাসায়নিকভাবে খুবই স্থির এবং পৃথিবীর অন্যতম পরিষ্কার ও তেজস্ক্রিয়তা-প্রতিরোধী পদার্থ। ফলে যদি মহাবিশ্বের কোনো অতি-দুর্লভ কণিকা এর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তবে তা ধরা পড়বে সংবেদনশীল যন্ত্রে। এরকমই এক বিরল কণিকা হতে পারে ডার্ক ম্যাটার।
জার্মানির মিউনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্র ক্রিশ্চিয়ান উইটভেগ এই গবেষণা প্রকল্পে পাঁচ বছর ধরে কাজ করছেন। তিনি মজা করেই বলেন, প্রতিদিন এই পাহাড়ের নিচের ল্যাবে যেতে যেতে তার মনে হয় যেন কোনো সিনেমার ভিলেনের গোপন ঘাঁটিতে ঢুকছেন। ল্যাবটা দেখতে যেমন রহস্যময়, কাজটাও তেমনই চ্যালেঞ্জিং।
এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটার ধরতে পারেননি। তবে সম্প্রতি তারা মহাবিশ্বের অন্যতম দুর্লভ একটি পারমাণবিক ঘটনার প্রমাণ পেয়েছেন। ২৪ এপ্রিল ২০২৫ এ Nature জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, তারা প্রথমবারের মতো জেনন-১২৪ নামে এক ধরনের পরমাণুর ক্ষয় হতে দেখেছেন—একটি বিরল প্রক্রিয়ায়, যার নাম “টু-নিউট্রিনো ডাবল ইলেকট্রন ক্যাপচার”।
এই ক্ষয়প্রক্রিয়া তখনই ঘটে, যখন একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস একসাথে দুটি ইলেকট্রন গিলে ফেলে। এই ইলেকট্রন দুটি পরমাণুর বাইরের খোল থেকে একসাথে নিউক্লিয়াসে চলে যায় এবং সেখানে দুটি প্রোটনের সঙ্গে সংঘর্ষ করে সেগুলোকে নিউট্রনে রূপান্তর করে। ফলে পরমাণুর প্রকৃতি বদলে যায়—জেনন-১২৪ থেকে সেটা হয়ে যায় টেলিউরিয়াম-১২৪। এই রূপান্তরের সময় দুটি নিউট্রিনো কণা বেরিয়ে যায়—যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র, কোনো চার্জ নেই, ভরও নেই বললেই চলে—এবং সহজে কোনো পদার্থের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে না।
এই নিউট্রিনো কণাগুলো এতটাই নিষ্ক্রিয় যে সাধারণ যন্ত্রে তাদের ধরা যায় না। তাই গবেষকরা নিউট্রিনো ধরার চেষ্টা না করে, নজর দেন পরমাণুর ভেতরে যে দুটি ইলেকট্রন চলে গেছে, তাদের ফাঁকা জায়গার দিকে। ওই ফাঁকা জায়গাগুলো আবার পূরণ হয় ওপরের খোল থেকে আসা ইলেকট্রন দিয়ে। এই পরিবর্তনের ফলে এক ধরনের ‘ইলেকট্রন ক্যাসকেড’ বা ‘ধাপে ধাপে’ পতনের মতো ঘটনা ঘটে, আর সেখান থেকে নির্গত হয় এক্স-রে ও শক্তি। সেই এক্স-রে গুলোই ধরা পড়ে বিশেষ যন্ত্রে।
গবেষক উইটভেগ বলেন, “যখন ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসে চলে যায়, তখন বাইরের খোলে দুটি ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। পরে ওপরের স্তরের ইলেকট্রন নিচে নেমে আসলে একের পর এক এক্স-রে ও শক্তি বের হয়, যেগুলো আমরা পরিষ্কারভাবে ডিটেক্ট করতে পারি।”

Image credit: Xenon Collaboration
এক বছরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গবেষক দল প্রায় ১০০টি ঘটনার চিহ্ন পেয়েছেন, যেখানে জেনন-১২৪ ঠিক এইভাবে ক্ষয় হয়ে টেলিউরিয়ামে রূপান্তর হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা পৃথিবীর ল্যাবে সরাসরি দেখা দ্বিতীয়-সবচেয়ে দুর্লভ পারমাণবিক ঘটনার প্রমাণ দিলেন।
এই ঘটনাটি এতটাই বিরল যে জেনন-১২৪ পরমাণুর হাফ-লাইফ বা অর্ধ-আয়ু ১৮ সেক্সটিলিয়ন বছর (মানে ১.৮ x ১০²² বছর)। সহজভাবে বললে, কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যক জেনন-১২৪ পরমাণু নিলে, তাদের অর্ধেক ক্ষয় হতে এই বিশাল সময় লাগবে। অথচ আমাদের মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স মাত্র ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ, এই হাফ-লাইফ হলো মহাবিশ্বের বয়সের প্রায় এক ট্রিলিয়ন গুণ বেশি! এটা এখন পর্যন্ত ল্যাবে সরাসরি মাপা সবচেয়ে দীর্ঘ হাফ-লাইফ। শুধু টেলিউরিয়াম-১২৮-এর ক্ষয় আরও দীর্ঘ, কিন্তু সেটি শুধু কাগজে-কলমে হিসাব করা হয়েছে, কেউ চোখে দেখেননি।
যদিও এই আবিষ্কার ডার্ক ম্যাটারের কোনো সরাসরি তথ্য দেয় না, তবে এটা প্রমাণ করে—বিজ্ঞানীরা যে যন্ত্র ব্যবহার করছেন, সেটি এতটাই সংবেদনশীল যে বিশ্বের সবচেয়ে বিরল কণিকাগুলোকেও ধরা সম্ভব। গবেষকরা এখন পরিকল্পনা করছেন আরও বড় একটি ট্যাংক বানানোর—যেটিতে থাকবে ৮.৮ টন তরল জেনন। এতে করে আরও অনেক দুর্লভ ঘটনা খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : লাইভ সায়েন্স

