ধরুন একদিন সকালে আপনি ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, এই বিশাল পৃথিবীতে মানুষের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। নেই কোনো শহর, গাড়ি, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন সব কিছু যেন হঠাৎ মিলিয়ে গেছে। প্রশ্নটা তখন মাথায় ঘুরবে এই শূন্য পৃথিবীতে তাহলে কারা আবার গড়ে তুলবে সভ্যতা? ভবিষ্যতের মানুষ কারা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক জীবের নাম বলেন যাকে আপনি হয়তো মাছের বাজারে দেখে থাকবেন, এমনকি খেয়েও থাকতে পারেন। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে অক্টোপাস বা আট বাহুর রহস্যময় সামুদ্রিক প্রাণীটির কথা।
এই প্রশ্ন শুনে অনেকেরই হাসি আসতে পারে। অক্টোপাস আবার সভ্যতা গড়বে? কিন্তু একটু ধৈর্য ধরে শুনলে আপনি দেখবেন, বিজ্ঞানীদের যুক্তিগুলো মোটেও বাতুলতা নয়। বরং ভবিষ্যতের জগতে মানুষের পরে যদি কেউ বুদ্ধি, দক্ষতা আর অভিযোজন ক্ষমতা দিয়ে টিকে থাকে, তাহলে অক্টোপাস হতে পারে সেই সম্ভাব্য পরবর্তী নেতৃত্বের দাবিদার।
গণবিলুপ্তি
পৃথিবীর ইতিহাসে একবার নয়, অনেকবার এমন ঘটনা ঘটেছে যখন অধিকাংশ প্রাণী প্রজাতি একসাথে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এই ধরণের ঘটনা বিজ্ঞানীরা বলেন ম্যাস এক্সটিংশন বা গণবিলুপ্তি। যেমন, আজ থেকে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে একটি বিশাল উল্কা পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। এর ফলে আবহাওয়ার ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটে, আর সেই ধাক্কায় ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়ে যায়।
আজকের পৃথিবীও ঠিক এমন এক বিপদের দিকে এগিয়ে চলেছে; এবার কিন্তু উল্কাপিণ্ড নয় বরং বিলুপ্তির কারণ মানুষ নিজেই। বন কাটছে, কারখানার ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, জলবায়ু বদলাচ্ছে, প্রাণীরা হারিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধারা যদি না থামে তাহলে ২০৮০ সালের মধ্যেই পৃথিবীর অর্ধেক প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আর যদি কোনো মহাযুদ্ধ হয় বা আবার কোনো উল্কা এসে পড়ে তাহলে মানুষের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বানরজাতীয় প্রাণীরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।
মানুষ না থাকলে কে টিকবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা নজর দিয়েছেন এমন কিছু প্রাণীর দিকে যাদের আমরা সাধারণত খুব একটা গুরুত্ব দিই না। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী টিম কুলসন বলেন, ভবিষ্যতের চেতনার উত্তরসূরি হতে পারে অক্টোপাস।
কেন? কারণ অক্টোপাস শুধু একটিমাত্র প্রাণী নয়, এদের রয়েছে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি। কেউ বাস করে গভীর সমুদ্রে, কেউ উপকূলের কাছাকাছি। তাই একটি প্রজাতি হারিয়ে গেলেও অন্যরা হয়তো টিকে যাবে। এমনকি সময়ের সঙ্গে তারা আরও নতুনভাবে রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ, টিকে থাকার ও অভিযোজিত হওয়ার দিক থেকে অক্টোপাসের মধ্যে রয়েছে অনেক সম্ভাবনা।
অক্টোপাসের রয়েছে অদ্ভুত বুদ্ধিমত্তা
আমরা সাধারণত কুকুর, শিম্পাঞ্জি, কাক, কিংবা ডলফিনের মতো প্রাণীদের বুদ্ধিমান বলি। কিন্তু অক্টোপাসও অনেক ক্ষেত্রে তাদের চেয়ে কম নয়। কিন্তু এর বুদ্ধির প্রমাণ? কিছু অক্টোপাসকে দেখা গেছে নারকেলের খোলস ব্যবহার করে নিজেকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতে। গবেষণাগারে অনেক অক্টোপাসকে একটি ধাঁধার বাক্সে আটকে রাখা হয়, পরে দেখা যায় সেই বাক্সগুলো খুলে খাবার বের করতে পেরেছে।এমনকি ট্যাংকের ঢাকনা খুলে অন্য ট্যাংকে গিয়ে অন্য অক্টোপাসের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার ঘটনাও আছে!
প্রিন্সটনের অধ্যাপক অ্যান্ডি ডবসন বলেন,
মানুষের মস্তিষ্কের মতো না হলেও অক্টোপাসের স্নায়ুতন্ত্র তথ্য প্রক্রিয়াকরণের দিক থেকে অনেকটা কম্পিউটারের মতো। তাদের দুটি বড় চোখ এবং আটটি বাহু একসঙ্গে কাজ করে আশপাশ ভালোভাবে বুঝে নিতে। তাদের বাহুগুলো একধরনের হাতের মতো যার মাধ্যমে তারা নিখুঁতভাবে কোন কিছু ধরতে, নাড়াতে, এমনকি তৈরি করতেও পারে।
কিন্তু সভ্যতা গড়তে হলে শুধু বুদ্ধি নয়, চাই সমাজ
সভ্যতা কেবল একটা ব্যক্তির বুদ্ধি দিয়ে গড়ে ওঠে না। মানুষের মতো সফল সমাজ গঠনের জন্য দরকার একসঙ্গে থাকা, একে অপরের কাছ থেকে শেখা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা হস্তান্তর করা।
সমস্যা হলো, অক্টোপাসেরা সাধারণত একা থাকে। তারা সামাজিক প্রাণী নয়। এমনকি অনেক সময় একে অপরকে খেয়ে ফেলে! তাদের মা-বাবা জন্মের পরই মরে যায় ফলে বাচ্চারা কারো কাছ থেকে কিছু শেখে না। আর তাই সংস্কৃতি বা সামাজিক শিক্ষার ধারাও সেখানে তৈরি হয় না।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির অধ্যাপক পিটার গডফ্রে-স্মিথ বলেন, সভ্যতা গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে আগে দরকার সমাজবদ্ধ জীবনযাপন। আর এটি সম্ভব হতে হলে অক্টোপাসদের আগে আরও সামাজিক হতে হবে।
কিছু আশার আলো আছে কি?
তবে বিজ্ঞানীরা কিছু ভালো দিকও দেখেছেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে কিছু অক্টোপাস প্রজাতি একসঙ্গে ১০টির বেশি সংখ্যায় বসবাস করছে। মানে, হয়তো সামাজিকতা আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে। কিন্তু এই পরিবর্তন খুব ধীরগতির। অ্যান্ডি ডবসন বলেন, গত ৫০-১০০ মিলিয়ন বছরেও অক্টোপাসদের মধ্যে বড় কোনো সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাই হঠাৎ করে সভ্যতার নেতৃত্বে চলে আসার সম্ভাবনা খুবই কম।
যদি অক্টোপাসরা এই সভ্যতার ভার নিতে না পারে, তাহলে কারা পারবে?
ডবসনের মতে, পৃথিবীর গভীর মাটির নিচে বসবাসকারী ক্ষুদ্র, সুতার মতো প্রাণী নেমাটোড হতে পারে ভবিষ্যতের পরবর্তী সফল জীব। আর গডফ্রে-স্মিথ বাজি ধরছেন ককাটু পাখির ওপর যেটি এক ধরনের উজ্জ্বল রঙের, বুদ্ধিমান পাখি যারা নানা ধরণের শব্দ অনুকরণ করতে পারে এবং সামাজিক জীবনযাপন করে।
সর্বশেষ
মানুষের বিলুপ্তির পর পৃথিবীর ভাগ্য কী হবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে বিজ্ঞানীরা অক্টোপাসের মধ্যে কিছু এমন বৈশিষ্ট্য দেখেছেন যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বুদ্ধিমান সভ্যতা গঠনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
অবশ্য সভ্যতা গড়তে গেলে শুধু বুদ্ধিমত্তা যথেষ্ট নয়। দরকার সামাজিকতা, শেখার ক্ষমতা, আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান আদান-প্রদানের ব্যবস্থা। এই জায়গাতেই অক্টোপাস পিছিয়ে আছে। তবুও, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে যদি মানুষ আর না থাকে, তাহলে হয়তো অক্টোপাস, ককাটু পাখি কিংবা ক্ষুদ্র অথচ অদম্য নেমাটোডের মধ্য থেকেই কোনো এক বিস্ময়কর নতুন যাত্রার সূচনা হতে পারে।
হয়তো তখন একদল বুদ্ধিমান প্রাণী সাগরের নিচে সভ্যতা গড়ছে অথবা তারা আমাদের মতোই প্রশ্ন করছে আমরা কেন এখানে? আমাদের আগে কে ছিল? এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর হবে একদা পৃথিবীতে এক বুদ্ধিমান প্রজাতি বাস করত, যাদের নাম ছিল মানুষ।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির

