আনসার্টেনটি প্রিন্সিপল বা হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি বলে একটি কণার অবস্থান এবং ভরবেগ একইসাথে সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, আপনি যদি একটি কণার অবস্থান খুব নিখুঁতভাবে নির্ণয় করতে চান, তাহলে তার ভরবেগ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাবে। এই সীমাবদ্ধতা কোনো যন্ত্রের দুর্বলতা নয় বরং প্রকৃতিরই একটি অন্তর্নিহিত ধর্ম।
তাই বিজ্ঞানীরা চিন্তা করলেন এই নীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই কিভাবে কণার অবস্থান এবং ভরবেগ সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যায়। তখন তাদের সামনে আসে ২০১৭ সালে প্রস্তাবিত একটি ধারণা। এই ধারণা বলে কোয়ান্টাম সিস্টেমে অবস্থান ও ভরবেগ সরাসরি পরিমাপ না করে, অনিশ্চয়তাকে পুনর্বণ্টন করে সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো একসাথে নির্ণয় করা সম্ভব।
গবেষকরা তাদের ব্যাখ্যার জন্য একটি ঘড়ির উদাহরণ ব্যবহার করেছেন। ধরুন একটি ঘড়িতে কেবল একটি কাঁটা আছে। যদি সেটা ঘণ্টার কাঁটা হয়, তাহলে আমরা ঘন্টা নির্ভুলভাবে জানতে পারি, কিন্তু মিনিট সম্পর্কে ধারণা অস্পষ্ট থাকে। একইভাবে মিনিটের কাটা থাকলে উল্টোটা হবে। কিন্তু যদি আমরা সময়ের পরিমাপের কৌশল বদলে ঘড়ির একটি নির্দিষ্ট অংশে জুম করে কাঁটা কতটুকু নড়েছে তা পরিমাপ করি, তাহলে বিষয়টা ভিন্ন কিছু দাঁড়াবে। আমরা তখন সূক্ষ্ম পরিবর্তন নির্ণয় করতে পারবো, যদিও মোট সময় জানা সম্ভব হবে না।

গবেষকরাও ঠিক এই কৌশলই অনুসরণ করেছেন। তারা সরাসরি অবস্থান বা ভরবেগ পরিমাপ না করে বরং এই দুইয়ের সূক্ষ্ম পরিবর্তন নির্ণয়ের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। এজন্য তারা একক চার্জযুক্ত পরমাণুকে ট্র্যাপে আটকে লেজারের সাহায্যে গ্রিড স্টেটে নিয়ে যান। গ্রিড স্টেটে পরমাণুর তরঙ্গ ফাংশন এমনভাবে ছড়িয়ে থাকে যেন তা স্কেলের দাগের মতো বিন্যস্ত হয়। এই বিন্যাসের ফলে, পরমাণুর ক্ষুদ্র স্থানচ্যুতি বা হেলন-দুলন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ধরা সম্ভব হয়।
যখন পরমাণুর ওপর অতি ক্ষুদ্র শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তখন দেখা যায় আয়ন সরে বা হেলে যায়। এই সরার ভিত্তিতে, অবস্থান এবং ভরবেগের ক্ষুদ্র পরিবর্তন একসাথে নির্ণয় করা সম্ভব হয়। এর ফলে, গবেষকরা সফলভাবে 10⁻²³ নিউটনের মতো ক্ষুদ্র বল এবং প্রায় ০.৫ ন্যানোমিটারের স্থানচ্যুতি সনাক্ত করতে পেরেছেন যা ৩০টি অক্সিজেন অণুর ওজন এবং একটি পরমাণুর আকারের সমান।
এই নতুন কৌশল ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। এটি কোয়ান্টাম সেন্সিংকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। নেভিগেশন ও স্থান নির্ধারণে এর প্রয়োগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে স্যাটেলাইটবিহীন পরিবেশে, যেমন পানির নিচে, ভূগর্ভস্থ অঞ্চল কিংবা মহাকাশে, যেখানে GPS কার্যকর নয়। জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসা ইমেজিংয়েও এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা অসীম, কারণ এটি অণু-পর্যায়ের পরিবর্তন শনাক্ত করতে সক্ষম। যেমন অতীতে এটোমিক ক্লক নেভিগেশন ও টেলিকমিউনিকেশনে বিপ্লব এনেছিল, তেমনি অতিসংবেদনশীল কোয়ান্টাম সেন্সর ভবিষ্যতের নতুন শিল্প ও প্রযুক্তির দুয়ার খুলে দিতে পারে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Science Advances জার্নালে।
লেখা: রেদোয়ানুল হক রানা
সূত্র: লাইভ সায়েন্স, ইউরেক এলার্ট

