আজকের আরব উপদ্বীপকে আমরা চিনে থাকি জ্বলন্ত মরুভূমি হিসেবে। কিন্তু গত ৮০ লাখ বছরে এই অঞ্চল অনেকবারই সবুজে ঢাকা ছিল। এমন সময়গুলোতে আফ্রিকা থেকে নানা প্রাণী হেঁটে আরবে চলে আসতে পারত—সম্ভবত মানুষের পূর্বপুরুষরাও, যাদেরকে শুধু আফ্রিকার বাসিন্দা হিসেবেই ধরা হত এতদিন।

অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির গবেষক মাইকেল পেট্রাগ্লিয়া বলেন “সময়ের সঙ্গে মরুভূমিগুলো কখনো শুকিয়ে গেছে, আবার কখনো সবুজ হয়ে উঠেছে”। “যখন আফ্রিকা থেকে জলহস্তীরা আসতে পারে, তখন মানুষজাতীয় প্রাণীরা কেন আসবে না?”

আগের গবেষণাগুলোতে দেখা গিয়েছে, গত ১১ লাখ বছরে আরবের মধ্যে বৃষ্টির সময়কাল ছিল বেশ কয়েকটি। তখন এই অঞ্চল ছিল নদী-নালায় ভরা, চারপাশে ছিল ঘাসে ঢাকা তৃণভূমি আর অরণ্য। এমন পরিবেশে আধুনিক মানুষ ও আরও কিছু অজানা হোমিনিন (মানবজাতীয় প্রাণী) এই এলাকায় এসে বসবাস করেছিল।

এই আবহাওয়ার ইতিহাস আরও পেছনে নিয়ে যেতে পেট্রাগ্লিয়ার দল আরবের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের উম্ম এর রাধুমা নামের গঠন থেকে সাতটি গুহার স্ট্যালাগমাইট আর স্ট্যালাকটাইটের নমুনা সংগ্রহ করে। স্ট্যালাগমাইট হল গুহার মাটির উপরিভাগে পানি থেকে খনিজ জমে ধীরে ধীরে গঠিত খাড়া স্তম্ভ আর স্ট্যালাকটাইট হল গুহার ছাদ থেকে পানি ঝরার মাধ্যমে খনিজ জমে ধীরে ধীরে গঠিত ঝুলন্ত সূচালো স্তম্ভ। কারণ, এই শিলার স্তম্ভগুলো গুহায় পানি প্রবাহের ফলে তৈরি হয়, তাই এর ভেতরে পুরনো জলবায়ুর প্রমাণ পাওয়া যায়।

আরবের অতীত জলবায়ুর সূত্র খুঁজে পেতে গবেষকরা স্ট্যালাগমাইট এবং স্ট্যালাকাইটের নমুনা সংগ্রহ করেছেন।

তারা দুটি পদ্ধতিতে সময় নির্ধারণ করেছে: ইউরেনিয়াম-থোরিয়াম ডেটিং আর ইউরেনিয়াম-সিসিসিয়াম ডেটিং। ইউরেনিয়াম-সিসিসিয়াম পদ্ধতিকে পেট্রাগ্লিয়া বলছেন একটি বড় অগ্রগতি, কারণ এটি ভূমিভিত্তিক জলবায়ুর ইতিহাসকে অনেক গভীরে নিয়ে যেতে পারে।

গুহার রেকর্ডে দেখা যায়, গত ৮০ লাখ বছরে মোট চারটি বড় বৃষ্টিপাতের সময়কাল ছিল:

১) ৭.৪৪ থেকে ৬.২৫ মিলিয়ন বছর আগে,
২) ৪.১০ থেকে ৩.১৬ মিলিয়ন বছর আগে,
৩) ২.২৯ থেকে ২.০১ মিলিয়ন বছর আগে,
৪) ১.৩৭ থেকে ৮.৬ লাখ বছর আগে।

এই আর্দ্র সময়গুলোতে আরবে কী ধরনের পরিবেশ ছিল তা বোঝার মতো এখনও কোনো জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়নি। তবে যদি আমরা গত এক মিলিয়ন বছরের অভিজ্ঞতা দেখি, তাহলে অনুমান করা যায় তখন নদী আর হ্রদের পাশে ঘাসের মাঠ ও বনভূমি ছিল।

যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির গবেষক আনিয়া ক্রকার বলেন “এখন আমরা বুঝতে পারছি, ওই সময় অঞ্চলটা কতটা বসবাসযোগ্য ছিল”। তিনি বলেন, গুহার রেকর্ড আসলে আরবের বেশিরভাগ জায়গার জলবায়ুর একটা ভালো ধারণা দেয়, কারণ এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত নির্ভর করে মৌসুমি বায়ুর উপর, যেটা গোটা মহাদেশজুড়ে কাজ করে।

পেট্রাগ্লিয়া বলেন, এই আর্দ্র পরিস্থিতি হয়তো পাশের সাহারা মরুভূমিতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। এমন হলে উত্তর আফ্রিকা থেকে আরব পর্যন্ত এক ধরনের সবুজ করিডোর তৈরি হতে পারত। ক্রকার নিজেও সাহারায় গত ১ কোটি ১০ লাখ বছরে বৃষ্টির চিহ্ন পেয়েছেন।

এই গবেষণার ৮০ লাখ বছরের সময়কাল আসলে মানবজাতির পুরো বিবর্তনকেই ঢেকে রেখেছে। প্রাচীনতম হোমিনিন, যেমন সাহেলানথ্রোপাস ও অস্ট্রালোপিথেকাস, কেবল আফ্রিকাতেই পাওয়া গেছে। কিন্তু আমাদের গোষ্ঠী Homo’র কিছু সদস্য আফ্রিকার বাইরে বাস করেছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরনো প্রমাণ হল Homo erectus, যারা ১৮ লাখ বছর আগে জর্জিয়ার ডমানিসিতে বাস করত। আর চীনের শাংচেন নামের জায়গায় ২১ লাখ বছর আগের পাথরের তৈরি হাতিয়ার পাওয়া গেছে, যেগুলো কে বানিয়েছিল তা এখনও অজানা।

পেট্রাগ্লিয়া বলেন, আরবের পরিবেশ যদি বাসযোগ্য থাকত, তাহলে প্রাক-হোমো হোমিনিনদের সেখানেও থাকার সম্ভাবনা থাকত।। সমস্যা হচ্ছে, আরবের জীবাশ্ম রেকর্ডে বিশাল এক গ্যাপ রয়েছে যা প্রায় ৫০ লাখ থেকে ৫ লাখ বছর পর্যন্ত কোনো প্রমাণই নেই। এই সময়কালের কোনো জীবাশ্ম বা প্রমাণ এখন পর্যন্ত কেউ খুঁজে দেখেনি বা খুঁজে পায়নি।

সম্প্রতি পাওয়া আরও এক গবেষণায় দেখা যায়, পরে আরও কিছু আর্দ্র সময় মানুষের বসবাসকে সহজ করে দেয় আজকের এই শুষ্ক এলাকায়। এক গবেষণার জন্য বর্তমান লিবিয়া থেকে পাওয়া দুটি পাথরের যুগের বা আয়রন যুগেের নারীর ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তারা বেঁচে ছিল প্রায় ৭০০০ বছর আগে, আফ্রিকান হিউমিড পিরিয়ডে—যেটা ১৪,৫০০ থেকে ৫০০০ বছর আগের মধ্যে ছিল, যখন সাহারা ছিল সবুজে ঘেরা।

আরব উপদ্বীপের পরিবেশ আজকের মতো শুষ্ক মরুভূমি হলেও, গত ৮০ লাখ বছরে একাধিকবার এই অঞ্চল সবুজ ও আর্দ্র হয়ে উঠেছিল। এই সময়গুলোতে আফ্রিকা থেকে প্রাণী এবং সম্ভাব্য মানবীয় পূর্বপুরুষদের আরবে আগমন ও বসবাসের সুযোগ ছিল। গুহার স্তম্ভগুলোর বিশ্লেষণ আমাদের জলবায়ুর দীর্ঘ ইতিহাস নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করেছে যা থেকে বোঝা যায় যে প্রাক-মানবিক প্রজাতিরা হয়তো আফ্রিকা ছাড়িয়ে আরবেও বিস্তৃত হয়েছিল। তবে এখনও এই সময়ের জীবাশ্ম বা বসতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা ভবিষ্যতে গবেষণার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ উভয়ই। এইসব আবিষ্কার আমাদের মানব ইতিহাস এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের গভীর সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করবে, আরবসহ আশেপাশের অঞ্চলের অতীতকে নতুন আলোকে দেখতে উদ্বুদ্ধ করবে।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : নিউ সাইন্টিস্ট

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply