ক্রিস্টোফার নোলান সিনেমা জগতের সবেচেয় আলোচিত নামগুলোর মধ্যে একটি। নোলানের নাম শুনলে অনেকের চোখেই প্রথম ভেসে ওঠে ‘ইন্টারস্টেলার’ কিংবা ‘ইনসেপশন’-মুভির দৃশ্য। অন্যরকম চিন্তা, জটিল গল্প আর বাস্তবসম্মত উপস্থাপনায় তিনি তৈরি করেছেন এক নিজস্ব ঘরানা। ২০২০ সালে মুক্তি পাওয়া তার সায়েন্স ফিকশন সিনেমা Tenet এই ধারারই এক বিস্ময়কর সংযোজন। তবে ইন্টারস্টেলার বা ইনসেপশন যেখানে দর্শকদের আবেগে, সম্পর্কের টানে অথবা স্বপ্ন-বাস্তবের সীমারেখায় নাড়া দিয়েছিল, Tenet যেন তার চেয়েও বেশি ধাক্কা দেয় মানুষের ভাবনার জগতে।

এই সিনেমার কাহিনি সময়কে ঘিরে—কিন্তু এমনভাবে নয় যেভাবে আমরা সাধারণ সময় ভেবে থাকি। এখানে সময় শুধু সামনে চলে না বরং পিছনেও চলে। গুলি বন্দুক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বদলে উল্টো দিক থেকে আবার ফিরে আসে, আগুনে পুড়ে যাওয়া জিনিস আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। দেখে মনে হতে পারে—এই ধারণাগুলো নিছক সিনেমার গল্প। কিন্তু Tenet সিনেমার অনেকটাই তৈরি হয়েছে কিছু জটিল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ধারণার উপর ভিত্তি করে।

Tenet সিনেমায় সময়কে যেভাবে দেখানো হয়েছে, তার পেছনে বিজ্ঞানের কী ব্যাখ্যা রয়েছে। এই “time inversion” বা সময়কে উল্টো পথে প্রবাহিত করার ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত আর কতটাই বা এখনো কল্পনার পর্যায়ে রয়ে গেছে।

সময় কি উল্টো পথে চলতে পারে?

আমরা সবাই জানি, সময় সবসময় সামনের দিকে যেতে থাকে—জন্ম, বেড়ে ওঠা, বার্ধক্য এরপর মৃত্যু। এই ধারাটি এতটাই স্বাভাবিক যে আমরা অন্য কিছু কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে “Arrow of Time” বা সময়ের তীর বলে একটি ধারণা আছে যা অনুযায়ী—সময় সবসময় একদিকে চলে কারণ জগতে এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলার মাত্রা সবসময় বাড়তে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, একটা কাঁচের গ্লাস যদি পড়ে ভেঙে যায় আমরা সেটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখি। কিন্তু যদি ভাঙা গ্লাস একসাথে জুড়ে গিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে আসে তাহলে সেটা আমাদের কাছে অস্বাভাবিক। কারণ, ভাঙা থেকে গ্লাস জোড়া লাগা মানে এনট্রপি কমে যাওয়া—যা প্রকৃতিতে ঘটে না।

Tenet এই নিয়মকেই চ্যালেঞ্জ করে। সিনেমার কল্পিত প্রযুক্তি Turnstile ব্যবহার করে কোনো বস্তুকে সময়ের বিপরীত দিকে প্রবাহিত করা যায়। একবার এই যন্ত্রে ঢুকলে মানুষ বা বস্তু সময়কে উল্টোভাবে অনুভব করে ও ঘটনাগুলো উল্টোক্রমে ঘটে।

Inversion কীভাবে কাজ করে?

সিনেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কল্পনা হলো—Inversion। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো কণার entropy-র গতি উল্টে যায়। এর ফলে সেই কণা বা বস্তু সময়ের বিপরীত দিকে চলে। সিনেমায় দেখানো হয়েছে, inversion-এর মাধ্যমে গুলি উল্টো পথে ফিরে আসে, শ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে কারণ বাতাসও উল্টো দিকে চলেছে, এমনকি সেখানে আগুনও উল্টো পথে চলে। এটি বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে পদার্থবিজ্ঞানের সেইসন নিয়ম যা সময়ের দুইদিকে সমানভাবে প্রযোজ্য। যেমন, নিউটনের গতি সূত্র বা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিছু সমীকরণ। তবে এই নিয়মগুলো বাস্তবে একমুখী সময়ের ধারণা ব্যাখ্যা করে না। সেটা ব্যাখ্যা করে এনট্রপির নিয়ম।

তবে, বাস্তব পৃথিবীতে inversion সম্ভব কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। এই মুহূর্তে আমাদের বিজ্ঞানে এমন কোনো প্রযুক্তি নেই যা সময়কে উল্টো পথে প্রবাহিত করতে পারে। অর্থাৎ, Tenet-এ দেখানো inversion এখনো পুরোপুরি কাল্পনিক।

One-Electron Universe তত্ত্ব —

Tenet সিনেমার ধারণার পেছনে রয়েছে পদার্থবিদ জন হুইলার ও রিচার্ড ফাইনম্যান-এর একটি তাত্ত্বিক ভাবনা—One-Electron Universe। এই তত্ত্বে বলা হয়, সব ইলেকট্রন আসলে একটি মাত্র কণা, যা সময়ের সামনে ও পেছনে চলাফেরা করে, ফলে একাধিক ইলেকট্রনের মতো প্রতীয়মান হয়। সময় পেছনে চললে এই কণাটি হয়ে যায় পজিট্রন—ইলেকট্রনের বিপরীত কণা।

এ ধারণা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে Tenet-এ এমন এক ভবিষ্যতের কথা বলা হয়েছে, যেখানে মানুষেরা সময় উল্টো করে অস্ত্র বানিয়ে বর্তমানকে হুমকি দেয়। ভবিষ্যতের মানুষ মনে করে, অতীতে যা হয়েছে তার জন্যই তারা ধ্বংসের মুখে, তাই তারা অতীতকে বদলাতে চায়।

Temporal Pincer Movement: দুদিক থেকে সময়ের যুদ্ধ —

সিনেমার আরেকটি অভিনব ধারণা হলো Temporal Pincer Movement—যেখানে একদল সৈনিক ভবিষ্যত থেকে অতীতে যায়, আরেকদল অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে যায়। দুদিক থেকে মিলিয়ে তারা এমন একটি যুদ্ধ পরিকল্পনা করে, যেখানে সময়ই কৌশল। এটি কল্পনার মতো মনে হলেও এর পেছনে যুক্তি আছে—যদি সময়ে পেছনে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে দুইদিক থেকে ঘটনাকে প্রভাবিত করা সম্ভব হতে পারে। তবে বাস্তবে এটি সম্ভব কি না, তা আমরা এখনও জানি না।

শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ (Credit: Maksym Bondarenko/Shutterstock)

গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স —

সময় নিয়ে চিন্তা করলে একটি সমস্যা সামনে আসে—Grandfather Paradox। আপনি যদি টাইম ট্রাভেল করে সময়ের বিপরীতে ফিরে গিয়ে আপনার দাদাকে মেরে ফেলেন, তাহলে আপনি নিজেই কি আর জন্মাবেন? আর জন্ম না নিলে ফিরে গিয়ে দাদাকে মারলেন কীভাবে?

Tenet এই সমস্যার একটা সহজ সমাধান দিয়েছে। সিনেমার ব্যাখ্যায় আপনি অতীত পরিবর্তন করতে পারবেন না, কারণ যা ঘটেছে তা আগেই ঘটেছে। আপনি যা করেছেন, তা-ই ভবিষ্যতের অংশ ছিল। ফলে টাইম ট্রাভেলের মাধ্যমে ভবিষ্যত পাল্টে ফেলার সম্ভাবনা নেই।

বিজ্ঞান কতটা সত্য বলে?

Tenet-এ দেখানো অনেক কিছুরই ভিত্তি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান। তবে এসব ধারণা পরীক্ষাগারে যাচাই করা যায়নি। সময়কে উল্টো করা, এনট্রপিকে কমানো বা inverted অস্ত্র বানানো সবই এখনো কল্পনাপ্রসূত।

তবে এটা বলতেই হয়—সিনেমাটি দর্শকদের মনে নতুন প্রশ্ন জাগাতে পেরেছে। বিজ্ঞান ও কল্পনার সংমিশ্রণে এমন সিনেমা বিরল। যদিও Tenet সকলের কাছে সহজবোধ্য না, তবে যারা বিজ্ঞানে আগ্রহী, তাদের জন্য এটি একরকম বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা।

Tenet এক গভীর চিন্তার সিনেমা। এটা শুধু একটা গল্প না, বরং সময়, বাস্তবতা আর কারন-ফলাফলের সম্পর্ক নিয়ে এক ধরনের গবেষণা। সিনেমার বেশিরভাগ বৈজ্ঞানিক কনসেপ্ট এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে থাকলেও, এসব আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শেখায়—সময় কি সত্যিই একমুখী? নাকি বিজ্ঞান একদিন সত্যিই সময়কে উল্টো পথে চালাতে পারবে? এমন প্রশ্নগুলোই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য—সব উত্তর জানি না, কিন্তু খুঁজে চলি। Tenet সেই অনুসন্ধানেরই এক চিত্ররূপ।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply