আমরা প্রতিনিয়ত আশেপাশের নানা গন্ধ অনুভব করি যেমন ফুলের ঘ্রাণ, পারফিউম কিংবা পরিচিত-অপরিচিত কারও দেহের ঘামের। তবে আপনি কি জানেন, এই গন্ধগুলোর কিছু কিছু আপনার মনের ওপর অদ্ভুত প্রভাব ফেলতে পারে? এমনকি কিছু গন্ধ আছে এমন যে যা আপনি বুঝতেও পারবেন না কিন্তু তবুও তা আপনার আবেগ, আকর্ষণ কিংবা মানসিক চাপের উপর নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছে।
সম্প্রতি জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক এমনই এক বিস্ময়কর তথ্য সামনে এনেছেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে নারীর শরীর থেকে নির্গত কিছু গন্ধ উপাদান বিশেষ করে ডিম্বস্ফোটনের সময় পুরুষের মনে একধরনের আকর্ষণ, প্রশান্তি এবং আবেগীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রভাব এতটাই সূক্ষ্ম যে আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়, অনুভব বদলে যায়, এমনকি শরীরের স্ট্রেসও কমে যায়।
এই গবেষণার ফলাফল যে কেবল বৈজ্ঞানিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ তা কিন্তু নয় বরং মানব সম্পর্ক, সামাজিক আচরণ এবং নারীবাদ ও পুরুষ-মানসিকতার আলোচনাতেও নতুন আলো ফেলছে এটি। তাহলে কী সত্যিই আমাদের শরীরের গন্ধের মাঝে লুকিয়ে আছে একধরনের মৌন ভাষা?
ডিম্বস্ফোটনের সময় নারীর শরীরের ঘামের গন্ধ কীভাবে পুরুষের মন ও শরীরকে প্রভাবিত করে?
এই গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর শরীর থেকে নিঃসৃত তিনটি বিশেষ গন্ধের উপাদান ডিম্বস্ফোটনের সময় বেড়ে যায়, আর এই গন্ধ যদি পুরুষদের শোঁকানো হয় তাহলে তারা সেই ঘ্রাণকে সাধারণ ঘামের তুলনায় অনেক বেশি পছন্দ করে। আবার পুরুষটিকে যদি সেই গন্ধের সঙ্গে কোনো নারীর ছবি দেখানো হয় তাহলে তারা ওই নারীকে বেশি সুন্দর ও নারীনুষ্ঠর বলে মনে করে।
এই বিষয়টা শুধু মানসিক অনুভূতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং গন্ধ শুঁকার পর পুরুষদের শরীরেও কিছু শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে যেমন তাঁদের শরীরে স্ট্রেস বা মানসিক চাপে ব্যবহৃত একধরনের রাসায়নিক সালিভারি অ্যামাইলেস এর মাত্রা কমে গেছে। এর মানে হলো, এই গন্ধ কেবল ভালো লাগা বা আকর্ষণের অনুভূতি তৈরি করে না বরং পুরুষদের মধ্যে একধরনের শান্ত ও আরামদায়ক অনুভবও তৈরি করে যা শরীরের ভেতর স্ট্রেস কমিয়ে দিতে সাহায্য করে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই উপাদানগুলোকে এখনই ফেরোমোন বলা যাবে না কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে ফেরোমোন বলতে বুঝানো হয় এমন একধরনের রাসায়নিক যা এক প্রজাতির এক জীব থেকে আরেক জীবের আচরণ বা শারীরিক প্রতিক্রিয়াকে নির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও এই গবেষণায় দেখা গেছে যে এই গন্ধ পুরুষদের আবেগ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলতে পারে তবুও এটি এখন পর্যন্ত ফেরোমোন হিসেবে বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা পূরণ করছে না তাই একে ফেরোমোন-সদৃশ বলা যেতে পারে।
এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন টোকিও ইউনিভার্সিটির ‘অ্যাপ্লাইড বায়োলজিক্যাল কেমিস্ট্রি’ বিভাগ এবং নিউরোইন্টেলিজেন্সের আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র (WPI-IRCN)-এর গবেষকরা। তারা বোঝাতে চেয়েছেন, আমাদের শরীরের গন্ধ আসলে আমাদের আবেগ ও সামাজিক আচরণে অজান্তেই প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণার প্রধান অধ্যাপক কাজুশিগে তোউহারা জানান, “আমরা নারী শরীরের গন্ধে এমন তিনটি উপাদান খুঁজে পেয়েছি, যেগুলো ডিম্বস্ফোটনের সময় বেশি পরিমাণে তৈরি হয়। যখন পুরুষদের এসব উপাদান দিয়ে তৈরি এক ধরনের মডেল ঘামের গন্ধ শোঁকানো হয়েছে, তখন তারা সেটিকে আগের মতো অপছন্দ করেনি বরং গ্রহণ করে বলেছে—এই গন্ধ মোটেও খারাপ নয়। আর সেই গন্ধের সাথে দেখানো হয়েছিল কিছু নারীদের ছবি। আর তাদের তখন নারীদের ছবিগুলোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও নারীত্বপূর্ণ বলে মনে করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই গন্ধ পুরুষদের শুধু মানসিকভাবে প্রভাবিত করেনি বরং তাদের শরীরেও মানসিক শান্তির প্রভাব ফেলেছে। স্ট্রেস বেড়ে গেলে শরীরে যেসব রাসায়নিক তৈরি হয় তার মধ্যে একটি হলো অ্যামাইলেস। আমরা দেখেছি, এই গন্ধ শুঁকার পর সেই অ্যামাইলেসের পরিমাণ বাড়েনি বরং কমে গেছে যার মানে হলো পুরুষরা রিল্যাক্স বা প্রশান্তি অনুভব করেছেন।”
এই কথাগুলো শুনে মনে হতে পারে, মানুষের শরীর থেকে নিঃসৃত গন্ধ আসলে একটি নিঃশব্দ ভাষা যা পুরুষ-নারীর মধ্যে একধরনের মৌন যোগাযোগ তৈরি করে দেয়।
এমন গবেষণা আগে কখনোই হয়নি তা নয়। আগেও অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর মাসিকচক্রের বিভিন্ন সময়ে শরীরের গন্ধ পরিবর্তন হয় এবং ডিম্বস্ফোটনের সময় সেই গন্ধ পুরুষদের কাছে বেশি পছন্দনীয় লাগে। কিন্তু তখন ঠিক কী রাসায়নিক উপাদান এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী, তা বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করতে পারেননি—এই নতুন গবেষণার মাধ্যমে সেই রহস্য অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে।
এই গন্ধের বিশ্লেষণ করতে বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করেন যার নাম ‘গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি-মাস স্পেকট্রোমেট্রি’। এই যন্ত্রে ঘামের মধ্যে থাকা অতি সূক্ষ্ম রাসায়নিক উপাদানগুলোর উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যায় এবং বোঝা যায় কোন উপাদান কখন বাড়ে বা কমে।
এই গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক নোজুমি ওহগি বলেন, গবেষণার সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল মাসিকচক্রের নির্দিষ্ট সময়ে নারীদের বগলের ঘামের নমুনা সংগ্রহ করা। ২০ জনেরও বেশি নারী স্বেচ্ছাসেবককে সঠিক সময়ে উপস্থিত করানোটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। তিনি আরও বলেন আমরা প্রতিটি অংশগ্রহণকারীর শরীরের তাপমাত্রা এবং মাসিকচক্রের বিভিন্ন লক্ষণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতাম, যাতে বুঝতে পারি কোন সময়ে কোন ধরনের গন্ধ তৈরি হচ্ছে। একজন অংশগ্রহণকারীর সম্পূর্ণ চক্র অনুযায়ী নমুনা সংগ্রহ করতে এক মাসের বেশি সময় লেগেছে।
এই গবেষণাটি নিরপেক্ষ রাখতে বিজ্ঞানীরা আরও একটি কাজ করেন, তারা নিশ্চিত করেন যেন যেসব পুরুষ অংশগ্রহণকারী গন্ধ শুঁকছেন তারা কিছুই না জানেন যে কোন গন্ধটি কী কিংবা কেন শোঁকানো হচ্ছে। এমনকি কিছু অংশগ্রহণকারীকে একেবারে কোনো গন্ধই শুঁকতে দেওয়া হয়নি, যেন বোঝা যায় মানসিক প্রত্যাশা বা কল্পনা ফলাফলে প্রভাব ফেলছে কি না।
তবে গবেষকদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো, মানুষ ভুল বুঝতে পারে যে এটি যেন মানুষের ফেরোমোন আবিষ্কারের প্রমাণ না ভেবে বসে। কারণ পপ কালচারে ফেরোমোন নিয়ে অনেক রকম গল্প ছড়িয়ে আছে যা শুনলেই মনে হয় ফেরোমোন মানেই প্রেম, আকর্ষণের জাদু এমন কিছু।
প্রফেসর তোউহারা স্পষ্ট করে বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নই যে এই উপাদানগুলো মানব ফেরোমোন কি না। কারণ ফেরোমোন বলতে বুঝানো হয় এমন রাসায়নিক যেটি এক প্রজাতির ভেতরে সুনির্দিষ্ট আচরণ তৈরি করে। আমাদের গবেষণায় আমরা শুধু দেখেছি এই গন্ধ পুরুষদের মনে ও শরীরে কিছু প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। তাই আমরা একে ফেরোমোন-সদৃশ বলতে পারি তবে একে পুরোপুরি ফেরোমোন বলা যাবে না।
এই গবেষণা এখানেই শেষ নয়। গবেষকরা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে গবেষণা করতে চান যাতে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়াগুলো কেমন হয় তা বোঝা যায় এবং কোনো জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না সেটা পরিষ্কার হয়।
তাঁরা আরও উন্নত রাসায়নিক বিশ্লেষণ করবেন এবং মস্তিষ্কের সেইসব অংশ পর্যবেক্ষণ করবেন, যেগুলো আবেগ ও অনুভূতির সঙ্গে জড়িত যাতে বোঝা যায় এই গন্ধ আমাদের অনুভব, আকর্ষণ এবং সামাজিক আচরণে কেমন ভূমিকা রাখে।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : নিউরোসায়েন্স নিউজ

