ছোটবেলায় হয়তো আপনি শুনেছেন, বাইরে গিয়ে মাটিতে খেললে শরীর ভালো থাকে কারণ এতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। কিন্তু সত্যিই কি এর পেছনে কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে? সংক্ষেপে বললে, হ্যাঁ—অনেক গবেষণা বলছে, বাচ্চারা ছোটবেলায় মাটি বা ধুলাবালির সংস্পর্শে এলে ভবিষ্যতে তাদের অ্যালার্জি আর অটোইমিউন রোগ হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। মানে, এতে এমন রোগগুলোর হাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া যায় যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্ষতিকরভাবে শরীরের নিজের টিস্যু বা নিরীহ কিছু জিনিসের বিরুদ্ধে লড়ে। একজন শিশুর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন গড়ে ওঠে, তখন শরীরের ভেতরের প্রতিরক্ষাবাহিনীকে শিখতে হয়—কীভাবে শরীরের নিজের কোষ আর বাইরের নিরীহ বা ক্ষতিকর বস্তু যেমন ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাস চেনা যায়। সে জানতে শেখে কোনটা আসল রোগ সৃষ্টিকারী, আর কাকে আক্রমণ করতে হবে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজির প্রফেসর এমেরিটাস গ্রাহাম রুক বলেন, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার যে অংশটি নিয়ন্ত্রণমূলক কাজ করে, তার বিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে পেটের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া থেকে আসা সংকেত। এই ব্যাকটেরিয়ার দলের নাম “গাট মাইক্রোবায়োম”, আর এটি আমাদের সুস্থ থাকার জন্য ভীষণ দরকারি। যেমন, এরা শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন তৈরি করে, আবার খাবার হজম করতেও সাহায্য করে।

শিশুর জীবনের প্রথম বছরটি গাট মাইক্রোবায়োম গঠনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি স্বাভাবিকভাবে প্রসব হয়, তাহলে শিশুর শরীরে মায়ের জন্মপথ থেকে ব্যাকটেরিয়া আসে, আবার বুকের দুধ খেলেও নানা ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। এরপর সে যত বড় হয়, তত নতুন নতুন উৎস থেকে নানা জীবাণুর সঙ্গে পরিচয় হতে থাকে। একটা তত্ত্ব আছে যেটার নাম “ওল্ড ফ্রেন্ডস হাইপোথিসিস” এই তত্ব অনুযায়ী, শৈশবে যত বেশি রকমের জীবাণুর সঙ্গে আমাদের সংস্পর্শ হয়, আমাদের গাট মাইক্রোবায়োম তত বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়, আর তখন আমাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভালোভাবে বুঝতে শেখে—কে শত্রু, কে বন্ধু। এখানে “ওল্ড ফ্রেন্ডস” বলতে বোঝানো হচ্ছে এমন সব উপকারী জীবাণু, যারা আমাদের শরীরে বাস করে কিন্তু ক্ষতি করে না। এই তত্ত্বটি রুক ২০০৩ সালে প্রস্তাব করেন। এটা অনেকটা “হাইজিন হাইপোথিসিস” এর মতো—যেটা বলে, ছোটবেলায় বেশি জীবাণু থেকে দূরে থাকলে ভবিষ্যতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। অনেক গবেষণাই বলেছে, যারা গ্রামে বা খামারে বড় হয় বা যাদের বাড়িতে পোষা প্রাণী থাকে, তাদের অ্যালার্জি হওয়ার সম্ভাবনা শহরের বা পোষা প্রাণীহীন শিশুদের তুলনায় কম থাকে। তবে ওল্ড ফ্রেন্ডস হাইপোথিসিস বলছে—অসুস্থতা সৃষ্টিকারী জীবাণুর চেয়ে বরং শরীরের সঙ্গে থাকা নিরীহ জীবাণুগুলোর সংস্পর্শই বেশি দরকারি। গবেষণাও এই তত্ত্বকে সমর্থন করেছে: ইউরোপে হওয়া কিছু গবেষণা বলছে, কেবল জীবাণুর সংস্পর্শে এলেই অ্যালার্জি প্রতিরোধ হয়—এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক না।  ওল্ড ফ্রেন্ডস তত্ত্বটি আরও ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন ছোটবেলায় অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা সিজারিয়ান ডেলিভারি এগুলো অ্যালার্জি হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় কারণ এর ফলে শিশুর শরীরে প্রাকৃতিকভাবে ভালো ব্যাকটেরিয়া পৌঁছাতে পারে না।

ফিনল্যান্ডে এক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের বাচ্চাদের মাটিতে খেললে তাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কিছুটা শক্তিশালী হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব বাচ্চারা এক মাস ধরে বনের মাটি ও ঘাসে খেলেছে, তাদের ত্বকে ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেড়েছে, আর রক্তে দেখা গেছে বেশি পরিমাণ নিয়ন্ত্রণকারী রোগপ্রতিরোধ কোষ ও সংকেত। এতে বোঝা যায়, মাটির জীবাণুর সংস্পর্শে এলে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও পরিণত হয় এবং অ্যালার্জির আশঙ্কা কমে। একইভাবে সুইডেনেও ২০২৪ সালে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা গরুর খামারে বড় হয়েছে বা পোষা প্রাণী পুষেছে, তাদের মধ্যে অ্যালার্জির হার কম। এদের পেটে বেশি নিরীহ জীবাণু পাওয়া গেছে, তাই গবেষকেরা মনে করেন, এই দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে গাট মাইক্রোবায়োম গুরুত্বপূর্ণ হলেও, কার অ্যালার্জি হবে বা হবে না—এটা নির্ভর করে আরও অনেক বিষয়ের ওপর, যেমন জেনেটিক্স বা বংশগতির ওপরও। জন হপকিন্স মেডিসিনের শিশু রোগ বিভাগের অধ্যাপক রবার্ট উড বলেন, সামগ্রিকভাবে বললে, শিশুদের বাইরে যেতে ও মাটিতে খেলতে উৎসাহিত করা উচিত। তবে গবেষণার ভিত্তিতে সব সময় ব্যবহারিক পরামর্শ দেওয়া যায় না। যেমন, যাদের কুকুর আছে, তাদের অ্যালার্জির সম্ভাবনা কিছুটা কম হতে পারে।

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শহরের দূষিত মাটিতে বাচ্চাদের খেলতে দেওয়া স্বাস্থ্যকর না-ও হতে পারে। এই ধরনের মাটিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক, যেমন সিসা বা প্যারাসাইট থাকতে পারে। তাই খেয়াল রাখতে হবে, যেন শিশুরা এই মাটি মুখে না দেয় বা শ্বাসের সঙ্গে না টেনে নেয়।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : লাইভ সাইন্স

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply