ইতিহাসের পাতা উল্টালেই দেখা যায়—শান্তি আর সমৃদ্ধির সময় খুব বেশি আসেনি। কোনো সময় হয়তো সভ্যতা একটু এগিয়েছে, মানুষ ভালো থেকেছে, কিন্তু খুব দ্রুতই সেই সময় শেষ হয়ে গেছে—কখনো হঠাৎ যুদ্ধ, কখনো দুর্ভিক্ষ, আবার কখনো রোগে। তবে এই দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যে একটা বছর আছে, যেটিকে অনেকেই মানব জাতির সবচেয়ে দুঃসহ সময়ের শুরু বলে মনে করেন। সেই বছরটি হলো ৫৩৬ খ্রিস্টাব্দ।

এই সময়টা ছিল ভীষণ অন্ধকার, শুধু মানসিক বা সামাজিক অর্থে নয়, আক্ষরিক অর্থেই পৃথিবী অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল। কারণ, পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে এক ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটেছিল, যার ছাই ও ধুলো ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো আকাশজুড়ে। সূর্যের আলোকে বাধা দিয়েছিল সেই ধুলোর আবরণ। ফলে দিনের আলো ছিল মলিন, রোদ উঠলেও তা ছিল যেন ধূসর কুয়াশায় ঢাকা, সূর্যকে দেখে মনে হতো নীলচে রঙের কোনো ম্লান আলো।

বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন, ঠিক কোন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণে এই ঘটনা ঘটেছিল। কেউ বলেন এল সালভাদরের ইলোপাংগো (Ilopango) ছিল এর উৎস। তবে ২০১৮ সালে এক গবেষণায় জানা যায়, আইসল্যান্ডে হওয়া একটি অগ্নুৎপাত এর জন্য দায়ী হতে পারে, কারণ ইউরোপের বরফে পাওয়া গেছে এমন কিছু আগ্নেয় কণিকা যেগুলোর রাসায়নিক গঠন মিলে যায় আইসল্যান্ডের আগ্নেয়গিরির উপাদানের সঙ্গে।

এমনও ধারণা করা হয়, ৫৩৬ থেকে ৫৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে একাধিক বড় অগ্নুৎপাত একসাথে ঘটেছিল, আর সেগুলো মিলেই সৃষ্টি করেছিল এক ভয়াবহ “volcanic winter”—অর্থাৎ এমন এক শীতকাল যা আগ্নেয়গিরির কারণে তৈরি হয়েছিল।

এই অদ্ভুত পরিবেশ কতটা আতঙ্কজনক ছিল, তা বোঝা যায় রোমান শাসক ও পণ্ডিত কাসিয়োদোরাসের একটি চিঠি থেকে, যেটি তিনি ৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে লিখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন—
“মানুষ ভীত, আর এই ভয় স্বাভাবিক। তারা আকাশে অদ্ভুত সব লক্ষণ দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, ভাবে এই অস্বাভাবিক দৃশ্যগুলো কীসের বার্তা দিচ্ছে। সূর্য, যিনি আকাশের সবার উপরে, তাও যেন তার আলো হারিয়ে ফেলেছেন, এখন তার রঙ হয়ে গেছে নীলচে।”

তিনি আরও লিখেছিলেন,
“আমরা অবাক হয়ে দেখি, দুপুর বেলাতেও শরীরের কোনো ছায়া পড়ে না, দেখা যায় না। সূর্যের তাপ যেন আর আগের মতো নেই—দুর্বল হয়ে গেছে, গরমলাগে না আর এমনকি পূর্ণিমা থাকলেও তখনও তার স্বাভাবিক জ্যোতি দেখা যায় না।”

এই অগ্ন্যুৎপাত ও এর ফলে সূর্য ঢাকা পড়া, রাতদিন একরকম অন্ধকার হয়ে যাওয়া, খরা, ঠান্ডা, ফসলহানি—সব মিলিয়ে ৫৩৬ সাল থেকে শুরু হয়েছিল এমন এক সময়, যাকে ঐতিহাসিকরা বলেন “মানব সভ্যতার সবচেয়ে দুর্বিষহ বছর”। এটা ছিল শুধু একটি দুর্যোগ নয়, এটি ছিল এক বিষণ্ন যুগের সূচনা।

শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, এই ঘটনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণও রয়েছে। ডেনমার্কে কাটা পুরনো গাছের গায়ে দেখা গেছে সেই সময়ের বাড়ন্ত অংশ ছিল খুব সরু—এর মানে ৫৩৬ সালের ভয়ঙ্কর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গাছের বৃদ্ধি থমকে গিয়েছিল।

এছাড়া গ্রিনল্যান্ড ও আন্টার্কটিকার বরফের স্তরে সংরক্ষিত বরফে মিলেছে একধরনের এসিডিক ধুলোর স্তর, যা প্রমাণ করে সেই সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ছিল ভারী ধুলো ও ছাইয়ে আচ্ছন্ন।

এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে উত্তরের গোলার্ধে তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে নেমে গিয়েছিল, আর ধসে পড়েছিল কৃষিকাজ। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই ঘটনাগুলোই “Late Antique Little Ice Age” বা “প্রাচীন ক্ষুদ্র হিমযুগের” সূচনার শুরু, যেটি ৫৩৬ সাল থেকেই শুরু হয় এবং পরবর্তী ৫৪০ ও ৫৪৭ সালের আরও কিছু অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে এটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

বিশ্বজুড়ে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমে গিয়েছিল। চীনে গ্রীষ্মে তুষারপাত হয়েছিল, দক্ষিণ আমেরিকায় দেখা দিয়েছিল খরা, আর মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ চিন্তিত ছিল আকাশের সেই ভয়ংকর ধোঁয়াটে কুয়াশা নিয়ে।

এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ। দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আইরিশ ইতিহাসে ৫৩৬ সালকে উল্লেখ করা হয়েছে “রুটির অভাবের বছর” হিসেবে। সেই সময় মিশরের পেলুসিয়াম বন্দর দিয়ে রোমান সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে বুবোনিক প্লেগ।

আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের এই ঘটনা আমাদের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ হয়ে ওঠেনি, সরাসরি প্রামাণ্য নথিও খুব বেশি নেই। তবুও অনেক ইতিহাসবিদ একমত যে ৫৩৬ খ্রিস্টাব্দ মানব ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর কাল অধ্যায়ের শুরু।

ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক অংশে এই বছরকে ইতিহাসবিদ মাইকেল ম্যাককরমিক “বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে খারাপ সময়” বলে বর্ণনা করেছেন।

এই ভয়ানক “Little Ice Age” শুরু হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যেই ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে জাস্টিনিয়ানিক প্লেগ। এই মহামারিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল। পরবর্তী কয়েক দশকে কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। যদিও রোমান সাম্রাজ্যের পতন আরও কয়েক শতাব্দী পরে হয়, অনেক গবেষক মনে করেন এই ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয় ও মহামারি একসাথে মিলে সাম্রাজ্যের শক্তি ধ্বংস করে দেয় এবং তার গৌরবময় দিনগুলো শেষ করে দেয়।

এর প্রভাব ভূমধ্যসাগর ছাড়িয়ে আরও বহু জায়গায় পড়ে। মধ্য এশিয়ার শীতল ও শুষ্ক জলবায়ুতে চারণভূমির সংকট দেখা দেয়, আর তা বাধ্য করে অনেক যাযাবর জাতিকে চীনের দিকে অভিবাসনে যেতে। এই অভিবাসনের ফলে উত্তর চীনের স্টেপ অঞ্চলে শুরু হয় সংঘর্ষ। এই যাযাবর গোষ্ঠীর কিছু অংশ পরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলে এবং একসাথে তারা পারস্যের সাসানিয়ান সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে সাহায্য করে।

তবে পৃথিবীর সব জায়গায় এই ঘটনা খারাপ প্রভাব ফেলেনি। যখন বাইজেন্টাইন ও সাসানিয়ান সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন আরব উপদ্বীপে শুরু হয়েছিল পরিবর্তন। সেখানে তখন আগের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হচ্ছিল, চারপাশে একটু বেশি সবুজ গাছপালা দেখা যাচ্ছিল।

পুরনো সাম্রাজ্যগুলোর পতনের মধ্যেই আরব উপদ্বীপ হয়ে উঠেছিল এক নতুন শক্তির উত্থানের মঞ্চ। আর খুব বেশি দিন যায়নি—৭ম শতকের মধ্যেই বিশ্বমঞ্চে আবির্ভাব ঘটে আরব সাম্রাজ্যের, যা হয়ে ওঠে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর একটি।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির

তথ্যসূত্র : IFL Science

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply