মানবসভ্যতার ইতিহাসে চিরকালই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে—আমরা কি একা? আমাদের এই বিশ্বটাই কি একমাত্র বাস্তবতা? নাকি এর বাইরেও রয়েছে অসংখ্য সম্ভাব্য বিশ্ব, যাদের অস্তিত্ব আমাদের চোখের আড়ালে?এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় ‘মাল্টিভার্স’ তত্ত্ব। মাল্টিভার্স মানে একাধিক বা অসংখ্য ‘বিশ্ব’। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ভাবছেন, আমাদের পরিচিত মহাবিশ্বের বাইরেও থাকতে পারে অন্য অনেক মহাবিশ্ব—যাদের প্রতিটির শারীরিক নিয়ম, বাস্তবতা এমনকি সময়ের গতি পর্যন্ত আমাদের চেনা নিয়ম থেকে আলাদা হতে পারে।
গত কয়েক বছর ধরে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের রহস্যময় দুনিয়ায় এক একক ফোটন কখনো কখনো একাধিক স্থানে একই সময়ে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র আলোচনা বেড়েছে। এই নতুন গবেষণার ফলাফলগুলি শুধু পদার্থবিজ্ঞানের সীমাকে ছাড়িয়ে গিয়ে আমাদের বাস্তবতা এবং অস্তিত্বের গভীরতর দিকগুলোকে স্পর্শ করছে। একটি ফোটন কীভাবে একসঙ্গে দুই বা ততোধিক স্থানে উপস্থিত হতে পারে—এই প্রশ্নটি এখন শুধু বিজ্ঞানীদের মধ্যে নয়, বরং দার্শনিক ও ভাবুক মানুষের মধ্যেও এক বহুমাত্রিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হলগার হফম্যানের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ফোটন কেবল একটি পথেই নয় বরং তা একই সাথে দুটি আলাদা পথ দিয়ে চলতে পারে। এটি শুধু এক ভৌত পর্যবেক্ষণ নয় বরং আমাদের বোঝার ধরণে গভীর প্রভাব ফেলে এমন একটি তথ্য। এই গবেষণা “বহুবিশ্ব” (Multiverse) নামক সেই তত্ত্বের পুনর্মূল্যায়নের দরজা খুলে দিয়েছে যা জানান দেয় আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ড শুধু একটি বাস্তবতা নয়, অসংখ্য বাস্তবতার একটি অদৃশ্য সমষ্টি।
বহুবিশ্বের ধারণা: বাস্তবতার বহুমাত্রিকতা
বহুবিশ্ব তত্ত্বটি এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী যে আমাদের দেখা বা বুঝতে পারা ব্রহ্মাণ্ড কেবল একমাত্র নয়, বরং অসংখ্য স্বতন্ত্র এবং পরস্পর থেকে আলাদা বাস্তবতার সমাহার। প্রতিটি বাস্তবতা বা ইউনিভার্সের নিজস্ব নিয়ম, আইন, এবং এমনকি কসমিক কনস্ট্যান্ট থাকতে পারে। এটি কেবল সাইন্টিফিক কাল্পনিক কল্পনা নয়, বরং কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কিছু ব্যাখ্যা অনুসারে এক সম্ভাব্য বাস্তবতা।
এই তত্ত্বটি থেকে এও বোঝা যায় যে, প্রতিটি কোয়ান্টাম ঘটনা যে এককভাবে ঘটে, তা নয় বরং প্রতিটি সম্ভাব্য ফলাফল আলাদা আলাদা বিশ্বে বাস্তবায়িত হয়। ফলে আমাদের এই বিশ্ব কেবল সেই গাছের একটি শাখা যেখানে আমরা অবস্থান করি, আর অন্যান্য শাখাগুলোও সমান্তরালে বিস্তৃত।
কোয়ান্টাম পদের বিভাজন: বাস্তবতা কি একক বা বহুমাত্রিক?
একক ফোটনের অস্তিত্ব এবং তার পথ নির্বাচন কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সর্ববৃহৎ রহস্যের মধ্যে একটি। বিখ্যাত ডাবল-স্লিট (Double-slit) পরীক্ষায় দেখা যায়, একটি ফোটন যখন পর্যবেক্ষণ ছাড়া যায়, তখন তা তরঙ্গের মতো আচরণ করে—একসঙ্গে দুইটি ফাঁক দিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু যখন পর্যবেক্ষক তার পথ নির্ণয় করতে চায়, তখন ফোটন কেবল একটি পথেই চলে। এই ঘটনাটি আমাদের বোধগম্য বাস্তবতার বাইরে যেখানে পর্যবেক্ষণই বস্তুগত সত্যের রূপ নির্ধারণ করে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে, অনেক কোয়ান্টাম বিজ্ঞানী মনে করেন যে ফোটন প্রকৃতপক্ষে দুটি বা ততোধিক পথে চলে যেখানে তার অস্তিত্ব একটি তরঙ্গসদৃশ বিস্তৃত অবস্থা। হফম্যান ও তার দল তাদের নূতন পরীক্ষায় এই বিস্তারের আরো শক্তিশালী প্রমাণ পেয়েছেন।
তাদের গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে দুর্বল পরিমাপের (Weak measurement) কৌশল, যা একটি কোয়ান্টাম অবজেক্টের অবস্থা মাপতে পারে কিন্তু তার স্বাভাবিক তরঙ্গবৈচিত্র্যকে নষ্ট করে না। এই পদ্ধতি ফোটনের পোলারাইজেশন পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে, যা নির্দেশ করে যে ফোটন কিভাবে তার পথ বেছে নিচ্ছে। ফলাফলে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে ফোটন তার শক্তির একটি অংশ দিয়ে এক পথে, অন্য অংশ দিয়ে অন্য পথে বিচ্ছুরিত হয়। এটি সাধারণ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রথাগত ব্যাখ্যার বাইরে একটি নতুন চিত্র তুলে ধরে।

যদিও এই পরীক্ষার ফলাফল এখনও বিতর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আর এটি আমাদের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণাগুলোকে একেবারে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। “বাস্তবতা কি একক? কিংবা আমরা কি আসলে একক ব্রহ্মাণ্ডের অধিবাসী?—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা বৈজ্ঞানিক দুনিয়ার মিলিত পর্যবেক্ষণের সামনে দাঁড়িয়েছি।
যেমন প্রফেসর লেভ ভাইডম্যান বলেন “প্যারালাল বিশ্বে ফোটনটি অন্য একটি আউটপুট পোর্টে পাওয়া গেছে। এর অর্থ, আমাদের বাস্তবতার বাইরে এমন বাস্তবতাও থাকতে পারে যেখানে একই ফোটন সম্পূর্ণ আলাদা অবস্থানে উপস্থিত। এই ধারণা বহু-বিশ্বের সত্যতা বা অন্তত এর সম্ভাবনাকে জোরালো করে তোলে। অন্যদিকে, অধ্যাপক এন্ড্রু জর্ডান সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, একক ফোটনের বিষয়ে এই প্রকার দাবি করা এখনই যুক্তিযুক্ত নয়। তিনি মনে করেন, দুর্বল পরিমাপ হয়তো একটি গণিতীয় বা পরিসংখ্যানিক মডেল মাত্র, যা বাস্তবতাকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না।
এই ধরনের গবেষণা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পর্যবেক্ষক এবং পর্যবেক্ষণের প্রক্রিয়া নিজেই বাস্তবতাকে গঠন করতে পারে। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে এই ধারণা নতুন নয়, তবে এখন তা আরো বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে আসার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।আমরা যদি মেনে নিই যে, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা শুধু বাস্তবতার একটি নির্দিষ্ট শাখাকে এক্টিভ করি তবে বাস্তবতা কোন একক রূপে নির্ধারিত নয় বরং তা আমাদের কাছে এক ধরনের সম্ভাবনার মণ্ডলী যা বিভিন্ন দিক থেকে বিভাজিত।
এই গবেষণার ফলাফল শুধু তাত্ত্বিক আলোচনাই নয়, প্রযুক্তির ভবিষ্যতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং নিরাপদ যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফোটনের আচরণের বিস্তারিত বোঝাপড়া নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। সেখানে বস্তুগত বাস্তবতা আর পারমাণবিক পর্যবেক্ষণের মাঝের সেতু গড়ার কাজ হচ্ছে। এটি আমাদের জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে এক নতুন দিশা দেখাবে।
ফোটনের একাধিক স্থানে উপস্থিতি—যা কোয়ান্টাম সুপারপজিশনের (Superposition) একটি বাস্তব প্রমাণ হতে পারে—আমাদের বাস্তবতা, আমাদের পর্যবেক্ষণ এবং আমাদের অস্তিত্বের প্রকৃতি নিয়ে সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। এটি বহুবিশ্বের ধারণাকে শুধু এক সম্ভাবনা হিসেবে নয়, বরং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
আমাদের বাস্তবতার আয়তন এখন আরও বড় এবং জটিল যেখানে স্থান, সময় এবং অস্তিত্বের দিক পরিবর্তিত হতে পারে আমাদের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের দ্বারা। এই অভিজ্ঞতা নতুন জ্ঞানের এক নতুন দিগন্তের সূচনা করছে, যেখানে বিজ্ঞান এবং দর্শন একত্রে মানবজীবনের রহস্যের অজস্র স্তর উন্মোচন করবে।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির

