পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্ট হলো দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন মহাবন। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক WEF-এর তথ্যমতে, এটি প্রায় ৬.৭ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল এক প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র, যা দক্ষিন আমেরিকার নয়টি দেশ জুড়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে প্রায় ৬০% ব্রাজিলে, ১৩% পেরুতে, ৭-৮% কলোম্বিয়ায় এবং অবশিষ্ট অংশ ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, গায়ানা ও সুরিনামে ছড়িয়ে আছে। বিজ্ঞানীদের মতে, আজ থেকে প্রায় ৫৬-৩৪ মিলিয়ন বছর আগে এর উৎপত্তি, আর আজও এটি পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে টিকে রয়েছে।


অ্যামাজন পৃথিবীর মোট বনভূমির প্রায় ১৫-১৭% এবং বিশ্ব ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্টের ৩৫-৪০% এর বেশি এলাকা দখল করে আছে। এটি প্রতিবছর গড়ে ৫-১০% কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানে মোট প্রায় ৩৯০ বিলিয়ন গাছপালা, ৪০,০০০ উদ্ভিদ প্রজাতি, ১,২৯৪ ধরনের পাখি, ৪২৭ স্তন্যপায়ী, ৩৭৮ সরীসৃপ, ৪৩০ উভচর এবং ২,২০০-র বেশি মাছের প্রজাতি পাওয়া যায়।


কিন্তু দুঃখজনকভাবে গত এক দশকে মানবসৃষ্ট কারণে অ্যামাজন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্যাটেলাইট ডাটা অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রায় ৩৫,০০০ বর্গকিলোমিটার বনভূমি ধ্বংস হয়, যা ২০২১ সালের তুলনায় ১৫% বেশি ছিল। যদিও ২০২৪ সালে বন উজাড় কিছুটা কমে প্রায় ২৮,০০০ বর্গকিলোমিটার হলেও বাস্তবে একই বছরে ভয়াবহ খরা ও অগ্নিকাণ্ডে আরো প্রায় ৩৩,০০০ বর্গকিলোমিটার বনভূমি মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ছিল ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অ্যামাজন ধ্বংসের রেকর্ড।

এদিকে অ্যামাজন মহাবন অবক্ষয়ের হার গত ২০২৪ সালে তার আগের বছরের তুলনায় পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর INPE Brazil এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ব্রাজিলের প্যারো রাজ্যেই গত বছর ১,২৬০ বর্গকিলোমিটার বনভূমি উজাড় করা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যামাজন নদীর জলস্তর রেকর্ড পরিমাণে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে, যা ভবিষ্যতে তীব্র খরার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অ্যামাজন সুরক্ষায় পরিবেশবাদিরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হলেও বাস্তবে অত্র অঞ্চলের বনাঞ্চল ধ্বংস এবং খরা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। গবেষকদের মতে, অ্যামাজন ধ্বংসের পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অ্যামাজন বন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন প্রয়োগে দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অনীহা। এর পাশাপাশি অবৈধ খনিজ আহরণ ও কাঠ সংগ্রহ, অত্র অঞ্চলে কৃষি ও গবাদি পশুর খামার সম্প্রসারণ, বন পরিষ্কার করে জমি দখল, এবং প্রকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, অ্যামাজন মহাবনে বর্তমানে প্রায় ৩৩০-৪৪০ গিগাটন কার্বন ডাই অক্সাইড মজুদ আছে। আর বন ধ্বংসের ফলে বিপুল পরিমাণ CO₂ বাতাসে মুক্ত হয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, যদি মোট বন ধ্বংস ২০-২৫% ছাড়িয়ে যায়, তবে অ্যামাজন “টিপিং পয়েন্টে” পৌঁছে যাবে এবং ধীরে ধীরে হয়ত শুষ্ক সাভানায় পরিণত হবে।

এর ফলে শুধু দক্ষিণ আমেরিকাই নয়, বরং সারা বিশ্বে তপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে জলবায়ু স্থায়ী পরিবর্তন এবং পাশাপাশি কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ভয়াবহভাবে হুমকির মুখে পড়বে। পরিবেশবিদেরা আশঙ্কা করেন যে, যদি বর্তমানে চলমান এই ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত থাকে, তবে আগামী ২১০০ সালের মধ্যে অ্যামাজনের প্রায় ৫০- ৬০% ইকোসিস্টেম পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, যার বিরুপ প্রভাবে সারা বিশ্বের প্রায় কয়েকশো মিলিয়ন মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে আশার কথা হলো যে, গত ২০২৪ সালে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। Amazon Conservation Association বলিভিয়ায় ১.২ মিলিয়ন একর নতুন সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে। ACTO Regional Summit 2023-24 সম্মেলনে অ্যামাজন সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে অবৈধ সোনার খনন প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং অ্যামাজনের ৯টি দেশ একত্রে এই বন সুরক্ষায় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।

অন্যদিকে অ্যামাজনের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নিয়ে জানিয়েছে, “আমরাই অ্যামাজনের প্রকৃত অভিভাবক।” তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও ভূমির অধিকার রক্ষা ছাড়া এই মহাবনকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রভাবশালী দেশগুলোর সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা ব্যতীত শুধু সভা সেমিনার দ্বারা প্রকৃতির মহাবন অ্যামাজনকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply