পানি থেকে বিদ্যুৎ, বাতাস থেকে বিদ্যুৎ, কিংবা সূর্যের আলো ও ভূ-তাপ— নবায়নযোগ্য শক্তির এই নামগুলোর সাথে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আমাদের চারপাশের বাতাসে ভেসে থাকা অদৃশ্য বাষ্প কিংবা নিছক আর্দ্রতা থেকেও আলো জ্বলতে পারে? ব্যাপারটা কল্পবিজ্ঞানের কোনো রোমাঞ্চকর গল্পের মতো শোনালেও, বিজ্ঞান আজ একে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। প্রকৃতি আমাদের চারপাশে শক্তির যে বিশাল জাল বিছিয়ে রেখেছে, তারই এক নতুন ও অভাবনীয় উন্মোচন হচ্ছে এই অভিনব প্রযুক্তি। প্রযুক্তিটির নাম Evapolectricity।
২০১৭ সালের কথা। বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Nanotechnology-তে প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণা পুরো বিজ্ঞানী মহলকে চমকে দেয়। গবেষকরা প্রমাণ করেন, পানির সাধারণ বাষ্পীভবন প্রক্রিয়া কেবল প্রকৃতিকে শীতলই করে না, বরং এই প্রক্রিয়া থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনও সম্ভব। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই নতুন প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে Evapolectricity। Evaporation (বাষ্পীভবন) এবং Electricity— শব্দ দুটির চমৎকার মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এই নাম। সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তির মতোই এটি একটি অফুরন্ত নবায়নযোগ্য শক্তি, কারণ এর মূল জ্বালানি হলো চারপাশের প্রাকৃতিক পানি এবং পরিবেশের আর্দ্রতা। যখন কোনো পৃষ্ঠ থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়, তখন পানির অণুগুলো চারপাশ থেকে তাপ শোষণ করে নেয়। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে একটি সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল চাবিকাঠি।
তাহলে এই রহস্যময়ী ব্যাপারটা আসলে ঘটে কীভাবে? চলুন, বিজ্ঞানের ভারী খোলস থেকে বেরিয়ে খুব সহজ করে বোঝার চেষ্টা করি। খালি চোখে আমরা ভেজা মাটি, কাঠ বা কোনো জৈব পদার্থকে নিরেট ভাবলেও, এদের ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য অতিসূক্ষ্ম সুড়ঙ্গ বা ন্যানো-চ্যানেল। এই সুড়ঙ্গগুলোতে আটকে থাকা পানিতে মিশে থাকে নানা রকম খনিজ লবণ, যেগুলো মূলত পজিটিভ ও নেগেটিভ আয়নে (যেমন সোডিয়াম ও ক্লোরাইড) বিভক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
পরিবেশের তাপে যখন ওপরের পৃষ্ঠ থেকে পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যায়, তখন সেখানে তৈরি হওয়া শূন্যস্থান পূরণের জন্য নিচ থেকে পানি সোঁত করে ওপরের দিকে ছুটে আসে। এই ছুটে চলার সময় পানির সাথে থাকা আয়নগুলোও সরু সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে ওপরে উঠতে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, এই চলাচলের পথেই সুড়ঙ্গের দেয়ালের সাথে ঘর্ষণে বা আকর্ষণে পজিটিভ আর নেগেটিভ চার্জগুলো আলাদা হয়ে যায়। ফলে ব্যাটারির মতো পদার্থের ২ প্রান্তে বিপরীতধর্মী চার্জ জমা হয়ে বিশাল এক বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের জন্ম দেয়।
এখন, এই দুই প্রান্তে যদি আমরা দুটো পরিবাহী তার বা ইলেক্ট্রোড জুড়ে দিই, তবে সেই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ টেনে নেওয়া সম্ভব। বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে কৃত্রিম ন্যানো-চ্যানেল তৈরি করে পানির এই আণবিক দৌড়ঝাঁপকে একেবারে নিজেদের বশে নিয়ে এসেছেন। ফলে এখন ভোল্টেজ ও কারেন্ট, দুটোই বেশ স্থিতিশীলভাবে পাওয়া যাচ্ছে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, এই পুরো অদৃশ্য কারখানাই কিন্তু প্রকৃতির মেজাজ-মর্জির ওপর নির্ভরশীল। চারপাশের বাতাসের আর্দ্রতা, রোদের তেজ, হাওয়া বইছে কি না, এমনকি পানিতে থাকা লবণের পরিমাণ- এসব কিছুই নির্ধারণ করে দেয় ঠিক কতটুকু বিদ্যুৎ আমরা পাব।
আপাতত ইভাপোলেকট্রিসিটির ব্যবহার খুব বড় পরিসরে শুরু হয়নি। তবে গবেষণাগারে সিলিকা ন্যানোপার্টিকেল, গ্রাফিন অক্সাইড এবং মলিবডেনাম ডাইসালফাইডের মতো অত্যাধুনিক পদার্থ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা সফলভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছেন। বড় কোনো যন্ত্র না হলেও, Internet of Things (IoT) সেন্সরের মতো ছোট ছোট ডিভাইস কিংবা বিভিন্ন বায়োমেডিকেল সরঞ্জাম চালানোর জন্য যতটুকু বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, তা এই পদ্ধতিতে অনায়াসেই মিলছে।
বাণিজ্যিকভাবে এখনো জাতীয় গ্রিডে এই শক্তির ব্যবহার শুরু না হলেও, এর সম্ভাবনা আক্ষরিক অর্থেই আকাশছোঁয়া। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক লেক ও জলাশয়ের প্রাকৃতিক বাষ্পীভবন কাজে লাগিয়ে ছোট ইঞ্জিন চালিয়ে দেখিয়েছেন। তাদের এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য— যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো থেকে এই পদ্ধতিতে প্রায় ৩২৫ গিগাওয়াট শক্তি আহরণ করা সম্ভব, যা দেশটির জাতীয় গ্রিডের প্রায় ৭.৫% বিদ্যুৎ চাহিদা একাই মেটাতে সক্ষম। এই শক্তি উৎপাদনে কোনো দূষণ নেই, অতিরিক্ত কোনো জ্বালানি পোড়াতে হয় না, এমনকি কার্বন নিঃসরণের পরিমাণও শূন্যের কোঠায়। তাই একে শতভাগ সবুজ শক্তি হিসেবে নির্দ্বিধায় স্বীকৃতি দেওয়া যায়।
একটু চোখ বন্ধ করলেই বৈপ্লবিক এক ভবিষ্যত মনোজগতে ভেসে ওঠে। শুধু আবহাওয়া কেন্দ্র বা কৃষিজমি নয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানেও এর ব্যবহার হতে পারে যুগান্তকারী। একবার ভাবুন এমন এক বায়োমেডিকেল ডিভাইসের কথা, যেমন মানুষের শরীরে বসানো পেসমেকার কিংবা আধুনিক হেলথ মনিটর। সেগুলো চালানোর জন্য হয়তো বাইরে থেকে কোনো ব্যাটারি চার্জ করার দরকারই হবে না। মানুষের শরীরের ঘাম বা ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা থেকেই এরা নিজেদের প্রয়োজনীয় শক্তিটুকু শুষে নেবে। আবার ধরুন, আধুনিক স্মার্ট ফার্মিং বা কৃষিব্যবস্থার কথা। বিশাল ফসলের মাঠে মাটির আর্দ্রতা মাপার জন্য যে অসংখ্য সেন্সর বসানো থাকে, সেগুলো হয়তো সেই মাটির বুক থেকে বাষ্পীভূত হওয়া পানি থেকেই শক্তি সঞ্চয় করে বছরের পর বছর একটানা কাজ করে যাবে।
দুর্গম যেসব পাহাড়ি গ্রামে কিংবা গহিন অরণ্যে এখনো সোলার প্যানেল বা গ্রিডের তার পৌঁছায়নি, সেখানকার স্থানীয় জলাশয় বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশই হয়ে উঠবে বিদ্যুতের অসীম আধার। এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে যেসব আগাম সতর্কবার্তা যন্ত্র বা সেন্সর থাকে, চরম মেঘলা দিনে সৌরবিদ্যুৎ কাজ না করলেও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে সেগুলো সচল থাকতে পারবে। নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে, যেখানে চারপাশেই জালের মতো ছড়িয়ে আছে খাল-বিল, নদী-নালা আর হাওর, সেখানে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা আক্ষরিক অর্থেই দিগন্ত বিস্তৃত। লেক বা সমুদ্র উপকূলে বড় পরিসরে ইভাপোলেকট্রিসিটি ডিভাইস বসানো গেলে তা একদিকে যেমন হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে যোগান দেবে, অন্যদিকে খরাপ্রবণ এলাকায় অতিরিক্ত বাষ্পীভবন রোধ করে পানি সংরক্ষণেও সাহায্য করতে পারে। আজ যা কেবল ল্যাবরেটরির চার দেওয়ালে আর ন্যানোটেকনোলজির জটিল সমীকরণে বন্দি, কাল হয়তো সেই ইভাপোলেকট্রিসিটিই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। বাতাস আর পানির এক জাদুকরি যুগলবন্দিতে পৃথিবী পাবে এক নতুন, দূষণমুক্ত শক্তির সন্ধান।

