মানুষ মৃত্যুর পর তার দেহ একটি স্বাভাবিক পচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় যা জীববৈজ্ঞানিক নিয়মে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পূর্ণরূপে দেহকে ভঙ্গুর কঙ্কালে পরিণত করে। তবে ইতিহাসের বিভিন্ন যুগ এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মৃতদেহ দীর্ঘদিন কবরের ভেতর থাকা সত্ত্বেও আশ্চর্যজনকভাবে অক্ষত ও অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকে। এই ধরনের ঘটনা বহুসময় রহস্যময় ও অলৌকিক মনে হলেও, এর পেছনে বিজ্ঞানের সুস্পষ্ট এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিদ্যমান।

মূলত মৃতদেহের সংরক্ষণে পরিবেশগত শর্তাবলী, রাসায়নিক উপাদান এবং জীবাণুর কার্যক্রমের মতো বহু জটিল কারণ একযোগে কাজ করে। এসব কারণের সমন্বয়ে কখনও কখনও মৃতদেহ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত প্রায় অক্ষত অবস্থায় বিরাজমান থাকতে পারে যা আমাদের কৌতূহল এবং গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পচন প্রক্রিয়ার মৌলিক ধাপ

মৃত্যুর পরপরই দেহের কোষে একটি প্রক্রিয়া শুরু হয় যাকে বলে অটোলাইসিস বা কোষের স্বয়ং-পচন। কোষের ভেতরের এনজাইম ও রাসায়নিক পদার্থ কোষগুলোকে ভাঙতে শুরু করে। একইসঙ্গে, দেহে থাকা ও বাইরের পরিবেশ থেকে আসা ব্যাকটেরিয়া মৃত টিস্যু ভাঙতে থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায়, এই প্রক্রিয়া দ্রুত এগোতে থাকে এবং কয়েক বছরের মধ্যেই দেহ কঙ্কাল ছাড়া আর কিছু থাকে না। কিন্তু এই গতি অনেকটাই বদলে যায় যখন পরিবেশের কিছু বিশেষ শর্ত একসাথে কাজ করে।

উদাহরণস্বরূপ, যদি মৃতদেহটি এমন মাটিতে কবর দেওয়া হয় যেখানে অক্সিজেনের প্রবাহ অত্যন্ত সীমিত, তাহলে ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণুর কার্যকলাপ অনেকটা ধীর হয়ে যায়। একইভাবে, অত্যন্ত ঠান্ডা বা অতিরিক্ত শুষ্ক পরিবেশে দেহের জলীয় অংশ দ্রুত হারিয়ে যায়, ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলো বেঁচে থাকতে পারে না এবং পচন প্রক্রিয়া থেমে যায় বা খুব ধীর গতিতে চলে।


কবরের পরিবেশ ও মাটির ভূমিকা

লাশ পচার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাটির রাসায়নিক গঠন। কিছু মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে এমন খনিজ বা অ্যাসিড থাকে যা জীবাণুর বৃদ্ধি রোধ করে। উদাহরণস্বরূপ, যেসব মাটি অম্লীয় বা অতিরিক্ত ক্ষারীয় সেগুলো ব্যাকটেরিয়ার কাজ বাধাগ্রস্ত করে। কিছু মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে জীবাণুনাশক গুণ থাকে, আবার কিছু মাটিতে এমন খনিজ থাকে যা টিস্যুকে সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে।

তাছাড়া, মৃতদেহ যদি গভীরে কবর দেওয়া হয় বা মাটি যদি জলাবদ্ধ ও শক্তভাবে চাপা থাকে তবে সেখানে অক্সিজেনের অভাব তৈরি হয়। যেহেতু অধিকাংশ জীবাণু ও পোকামাকড় অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না, তাই এই অবস্থায় পচন প্রক্রিয়া অনেক ধীর হয়ে যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পিটবগের অতি অ্যাসিডিক ও ঠান্ডা পরিবেশে বহু শতাব্দী পুরনো লাশও প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এছাড়াও, কবরের গভীরতা এবং কফিনের ধরনও বড় ভূমিকা রাখে। ধাতব কফিন বা সম্পূর্ণ সিল করা কফিনের ভেতরে বাতাস ঢুকতে না পারায় পচনকারী জীবাণুর জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হয় না, ফলে দেহ দীর্ঘদিন অক্ষত থাকে। অপরদিকে, কাঠের কফিন কিছুটা বাতাস প্রবাহিত হতে পারে যা পচন প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত ঘটায়।

আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার প্রভাব

এখানে আশ্চর্যের বিষয় হলো অতিরিক্ত ভেজা কিংবা অতিরিক্ত শুকনো পরিবেশ এই দুটোই দেহ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। জলাবদ্ধ, অক্সিজেনহীন পরিবেশে দেহে Adipocere বা Corpse wax নামের মোমের মতো পদার্থ তৈরি হয় যা টিস্যুকে বহু বছর ধরে অক্ষত রাখে। অপরদিকে, মরুভূমির মতো শুকনো পরিবেশে দেহ দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হওয়ার আগেই টিস্যু শক্ত হয়ে যায় এবং স্বাভাবিকভাবে প্রাকৃতিক মমি তৈরি হয়।

তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। ঠান্ডা পরিবেশে রাসায়নিক বিক্রিয়া ও জীবাণুর কাজ ধীর হয়ে যায় ফলে পচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। এজন্য ঠান্ডা পাহাড়ি এলাকা বা বরফাচ্ছন্ন অঞ্চলে শত শত বছর আগের মৃতদেহ প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়।


কফিন ও কবরের নকশা

দেহকে কবরে কীভাবে কবরস্থ করা হচ্ছে সেটিও বড় ভূমিকা রাখে। ধাতব সিল করা কফিন মৃতদেহকে বাইরের বাতাস, পানি ও জীবাণুর সংস্পর্শ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয় ফলে পচন অনেক ধীর হয়। অন্যদিকে কাঠের কফিন বাতাস এবং আর্দ্রতা প্রবাহ করতে সাহায্য করে। কাঠ নাতিদীর্ঘ সময় সিল হয়ে থাকে না তাই বাতাস ও জলীয় বাষ্প সহজে কফিনের ভিতরে ঢুকতে পারে।

এতে করে দেহে পচন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ব্যাকটেরিয়া ও কীটপতঙ্গের উপস্থিতি বাড়ে। আর্দ্রতা বাড়লে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় যা দেহের পচনকে দ্রুততর করে। এছাড়া কাঠের কফিন সময়ের সাথে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে ফলে কফিনের ভিতরের পরিবেশ বাইরের সাথে মিশে যায় এবং দেহের সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ে।

তাছাড়া, কফিনের উপাদান এবং নির্মাণের মানও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কাঠের কফিনে নিরোধক বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় যা পচন ধীর করতে সাহায্য করে তবে এটি ধাতব কফিনের তুলনায় অনেক কম কার্যকর।

রাসায়নিক সংরক্ষণ ও এমবামিং

অনেক ক্ষেত্রে মৃতদেহ এমবামিং নামের প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এখানে ফরমালডিহাইড, ফেনল, অ্যালকোহল এবং লবণ জাতীয় রাসায়নিক দেহের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে জীবাণুর কার্যকলাপ বন্ধ করা হয়। সঠিক পদ্ধতিতে এমবামিং করা হলে দেহ বহু বছর ধরে চেহারার বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্য অক্ষত রাখে। কিছু ক্ষেত্রে, কবরের পরিবেশ বা মৃতদেহের ভেতরকার প্রাকৃতিক রাসায়নিকও পচন রোধে সাহায্য করতে পারে, এমনকি এমবামিং ছাড়াও।

প্রাকৃতিক মমি ও বগ বডি

প্রাকৃতিক মমিফিকেশন এমন একটি অসাধারণ প্রক্রিয়া, যেখানে মানবদেহ কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ বা কৃত্রিম সংরক্ষণ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবেই সংরক্ষিত থাকে। এই প্রক্রিয়ায় দেহের নরম টিস্যুগুলো, যেমন ত্বক, চুল, নখ, এমনকি অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অনেক সময় ধরে অক্ষত থাকে যা সাধারণ পচনের প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়।

একটি সুপরিচিত উদাহরণ হলো পিট বগ নামক জলাভূমির মধ্যে পাওয়া Bog Bodies। এই বগ বডিগুলো শত শত বছর আগের হলেও আজও তাদের ত্বক, চুল, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো বগের পানি ও মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পিট বগের পানি অত্যন্ত অম্লীয় অর্থাৎ এতে উচ্চমাত্রায় তেজস্ক্রিয় অ্যাসিড থাকে যা জীবাণুর বৃদ্ধি এবং ব্যাকটেরিয়ার ক্রিয়াকলাপকে বন্ধ করে দেয়।

একটি বগ বডি (Image Credit : National Geographic)

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো এই জলাভূমির অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম বা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থাকে। দেহকে পচানোর জন্য প্রয়োজনীয় জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেনের অভাবে কার্যকর হতে পারে না। এছাড়াও বগ এলাকাগুলো সাধারণত ঠান্ডা যা রাসায়নিক এবং জৈবিক বিক্রিয়াকে আরও ধীর করে দেয়।

এই সব শর্ত একত্রিত হয়ে দেহকে শত শত বছর ধরে প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় সংরক্ষণ করে, যা গবেষকদের জন্য একটি মূল্যবান জানার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এই প্রাকৃতিক মমিফিকেশন না হলে সাধারণত দেহ কিছু বছরেই সম্পূর্ণ পচে যেত।

এই কারণে, বগ বডিগুলো প্রাচীন মানব জীবনের ধাঁচ, তাদের পোশাক, খাদ্যাভ্যাস এবং এমনকি মৃত্যু কারণ সম্পর্কেও অনেক তথ্য উন্মোচন করে যা ইতিহাস এবং বিজ্ঞান উভয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ

কবরস্থ মৃতদেহের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ একটি জটিল প্রক্রিয়া যার পেছনে কাজ করে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম কারণের সমন্বয়। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে সমাধিস্থলের গভীরতা, মাটির রাসায়নিক গঠন এবং আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য মৃতদেহের পচনের গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উদাহরণস্বরূপ, উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে দেহ সাধারণত দ্রুত পচে যায় কারণ এই ধরনের পরিবেশ ব্যাকটেরিয়া ও কীটপতঙ্গের সক্রিয় বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তবে যদি মাটি এমন কিছু বিশেষ খনিজ বা রাসায়নিক দ্বারা সমৃদ্ধ হয় যা জীবাণুর কার্যকলাপকে বাধা দেয় তবে দেহ অনেক দিন পর্যন্ত অক্ষত থাকতে পারে।

কবরের ভেতরের পরিবেশ যেমন অক্সিজেনের অভাব বা ঠান্ডা তাপমাত্রায় থাকে তেমনি কফিনের ধরণ এবং নকশাও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ধাতব সিল করা কফিন দেহকে বাইরের বাতাস ও আর্দ্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় যা পচন প্রক্রিয়াকে অনেকাংশেই বাধাগ্রস্ত করে। তাছাড়া, বহু ক্ষেত্রে এমবালমেন্ট বা রাসায়নিক সংরক্ষণও দেহের দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ফরমালডিহাইড, লবণ ও অন্যান্য সংরক্ষণকারী রাসায়নিক ব্যবহারে দেহ দশকের পর দশক পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় রাখা সম্ভব হয়।

এই সকল কারণের মিলিত প্রভাবে অনেক সময় মৃতদেহ অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে, যা স্বাভাবিক পচনের নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে। এই অবস্থা শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য নয় বরং মানব সমাজের সংস্কৃতি ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের আগ্রহ ও প্রশ্নের জন্ম দেয়।

অতএব, কবরের ভেতরে মৃতদেহ দীর্ঘসময় অক্ষত থাকার রহস্য একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক বিষয়। পরিবেশগত শর্ত, রাসায়নিক প্রভাব এবং জীবাণুর কার্যকলাপের সূক্ষ্ম সমন্বয় মিলেই এই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে থাকে। এইভাবেই প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম নানা উপায়ে মৃতদেহের সংরক্ষণ হয় যা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সমান্তরালে চলমান একটি বিস্ময়কর অধ্যায়।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply