আমরা সবাই জানি, পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণীরই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তবে মৃত্যুর সময় কী ঘটে তা আমাদের জীবনের আজও এক অজানা রহস্য। অনেকেই বলেন, মৃত্যুর সময় চোখের সামনে জীবনের পুরোটাই যেন এক ঝলকে ভেসে ওঠে। কেউ বলেন, তারা তীব্র আলো দেখতে পান বা স্বপ্নের মতো অনুভব করেন। কিন্তু এসব কী কেবল গল্প? নাকি সত্যিই এমন কিছু ঘটে আমাদের মস্তিষ্কে?

বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো একজন মানুষের মৃত্যুর সময় তার মস্তিষ্কে কী ঘটে সেটার কিছুটা প্রমাণ পেয়েছেন। একজন ৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধ হঠাৎ পড়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং ধীরে ধীরে তার শরীরের সব কার্যক্ষমতা বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়টাতে তিনি এক বিশেষ যন্ত্রের সাথে সংযুক্ত ছিলেন, যার নাম ইইজি (EEG)। এই যন্ত্রটি মস্তিষ্কের ঢেউ বা তরঙ্গ ধরতে পারে। মৃত্যুর সময় তার মস্তিষ্কে কী ঘটছে, সেটা এই যন্ত্র রেকর্ড করে ফেলে।

আগেও মৃত্যুর কাছাকাছি থাকা মানুষদের মস্তিষ্কে কিছু রেকর্ড করা হয়েছে, কিন্তু সেটা ছিল খুব সীমিত। আর এবারই প্রথম এত বিস্তারিতভাবে এই রেকর্ডিং পাওয়া গিয়েছে।

ড. স্যাম পার্নিয়া নামের একজন গবেষক বলেন,

অনেক মানুষ মৃত্যু-পূর্ব কিছু সময় খুব পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারেন, কিছু কিছু স্মৃতি দেখতে পান। আগে এসবকে কেবল গল্প ভাবা হতো, কিন্তু এখন আমরা বুঝছি এটা হয়তো সত্যিই ঘটে।

এই রোগীর মৃত্যুর ঠিক আগে ও পরে ৩০ সেকেন্ড সময়ের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করেন। তারা দেখেন, মৃত্যুর মুহূর্তে মস্তিষ্কের সেই অংশগুলো সক্রিয় হয়ে উঠছে যেগুলো সাধারণত তথ্য বিশ্লেষণ, মনোযোগ, স্মৃতি মনে করা, স্বপ্ন দেখা বা সচেতন থাকার সঙ্গে জড়িত।

এটি থেকে তারা ধারণা করছেন, হয়তো মৃত্যুর ঠিক আগেই মানুষ তাদের জীবনের স্মৃতিগুলো এক ঝলকে মনে করতে পারে। অনেকটাই সেরকম যেমনটা আমরা শুনে থাকি—জীবন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

তাদের গবেষণা থেকে আরও জানা যায়, মৃত্যুর সময় মস্তিষ্কে দুই ধরনের তরঙ্গ—আলফা আর গামা একসঙ্গে সক্রিয় হতে দেখা গেছে। সাধারণত সুস্থ মানুষদের মস্তিষ্কে এই দুটি তরঙ্গ একসঙ্গে সক্রিয় হলে তারা পুরনো স্মৃতি মনে করতে পারেন। তাই গবেষকরা ধারণা করছেন, এই রোগীর মৃত্যুর সময় হয়তো তার স্মৃতিগুলো মনে পড়ছিল।

আলফা তরঙ্গ হয় যখন আমরা শান্ত কিন্তু সতর্ক থাকি—যেমন মনোযোগ দিয়ে কিছু শিখি বা ভাবি। আর গামা তরঙ্গ হয় তখন যখন আমরা খুব সক্রিয় চিন্তা করি—যেমন মনোযোগ, স্মৃতি বা জটিল কিছু বুঝতে গেলে।আরেকটি গবেষণা দলের কাজ থেকেও মিল পাওয়া গেছে এমনটাই।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের একদল বিজ্ঞানী দেখেছেন, হার্ট অ্যাটাকের পর লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার সময় দুইজন রোগীর মস্তিষ্কে হঠাৎ করে গামা তরঙ্গ বেড়ে যায়। এমনকি তাদের হার্ট রেটও তখন বেড়ে যায়। এই গামা তরঙ্গ সেই অংশে দেখা গেছে যেটা স্বপ্ন দেখা বা অলৌকিক অভিজ্ঞতা বা altered consciousness এর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মানে মৃত্যুর সময়ও মস্তিষ্ক পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় থাকে না—বরং কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ সক্রিয় হয়ে যেতে পারে।

এই গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা একটা তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন: যখন আমরা মারা যাই, তখন আমাদের মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ কাজ করতে শুরু করে যেগুলো সাধারণ সময়ে মনে থাকে না বরং চাপা থাকে। এই কারণে হয়তো আমরা তখন এমন কিছু অনুভব করি যা বেঁচে থাকতে কখনো করি না—যেমন গভীর স্মৃতি দেখা, নিজের জীবনকে ঝলমলে করে মনে পড়া বা অলৌকিক কিছু অনুভব করা।

তবে এই গবেষণার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। যে রোগীর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করা হয়েছিল, তিনি আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, ফোলাভাব আর খিঁচুনি ছিল এমনকি খিঁচুনির ওষুধও চলছিল। তাই সব তথ্য একদম নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আর, তার মৃত্যুর আগের স্বাভাবিক ব্রেইন স্ক্যানও পাওয়া যায়নি, তাই তুলনা করাও কঠিন। তবুও এই গবেষণা আমাদের জানার পথে এক বিশাল ধাপ। এতে বোঝা যায়, মৃত্যু মানেই অন্ধকার নয়। বরং হতে পারে, মৃত্যুর সময়ই আমাদের মস্তিষ্কের এক রহস্যময় দরজা খুলে যায়।

এখনও বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি নিশ্চিত নন, মৃত্যু সময়কার এই ব্রেইন অ্যাকটিভিটিই মানুষের জীবনের ঝলক দেখা বা আলো দেখার অভিজ্ঞতার কারণ কি না। কারণ সুস্থ মানুষের মৃত্যুর মুহূর্তে এই পরীক্ষা করা সম্ভব না। কেবল অসুস্থ ও হাসপাতালে থাকা রোগীদের ওপরই এটা করা যায়।

এই কারণেই গবেষকরা বলছেন, যারা মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে আবার ফিরে এসেছেন—তাদের ওপর গবেষণা চালিয়ে বোঝা দরকার, মৃত্যুর সময় সত্যিই কী ঘটে আমাদের মাথার ভেতরে।

সংক্ষেপে বলা যায়, মৃত্যুর মুহূর্তে আমাদের মস্তিষ্ক পুরোপুরি বন্ধ হয় না। বরং, কিছু অংশ হঠাৎ সক্রিয় হয়ে পড়ে—বিশেষ করে যেসব অংশ আমাদের স্মৃতি, মনোযোগ আর স্বপ্ন দেখার সঙ্গে জড়িত। এতে ধারণা করা হচ্ছে, হয়তো আমরা মৃত্যুর সময় আমাদের জীবনকে একবারে স্মরণ করতে পারি। এই গবেষণাগুলো এখনো প্রাথমিক, তবে ভবিষ্যতে এগুলো হয়তো আমাদের মৃত্যুকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : Popular Mechanics

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply