বেশ কয়েকবছর আগে, ফ্লোরিডার লারগো শহরে লিনাস ফিলিপ নামে এক ব্যক্তি পুলিশের গু*লিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর তদন্ত এবং মাদক সংক্রান্ত আরেকটি মামলার সূত্র ধরেই পুলিশ তার মোবাইল ফোন আনলক করার চেষ্টা করে ওই মৃতদেহের আঙুল দিয়ে। তখনই উঠে আসে একটি প্রশ্ন—একজন মৃত মানুষের আঙুল দিয়ে কি সত্যিই ফোন আনলক করতে পারে?
মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক অনিল জেইন, তিনি বলেন—একজন মানুষের মৃত্যুর পরে তার শরীর থেকে বৈদ্যুতিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় আর সেটাই মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায় ফোন আনলকে। অধিকাংশ স্মার্টফোনে যে ধরনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর ব্যবহৃত হয়, তা আসলে শরীরের ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সিগন্যালের ওপর নির্ভর করে।
আমাদের আঙুলের যে রেখা আর উপত্যকা আছে, সেগুলো সেন্সরের উপরে চাপলে ছোট ছোট ক্যাপাসিটর বিভিন্ন পরিমাণে চার্জ জমায়— রেখার নিচে বেশি আর উপত্যকার নিচে কম। এই পার্থক্যের ভিত্তিতেই ফিঙ্গারপ্রিন্টের ছবি তৈরি হয়। কিন্তু মৃতদেহে যখন কোনো বৈদ্যুতিক সিগন্যাল থাকে না, তখন সেন্সরও কাজ করে না। তবে জীবিত মানুষের মতোই, সদ্য মৃত এবং ভালোভাবে সংরক্ষিত মৃতদেহ থেকেও সাধারণত নির্ভরযোগ্যভাবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্ত করা যায়।
মৃতদের ক্ষেত্রে অনেক সময় আঙুল শক্ত হয়ে যাওয়ায় তা জোর করে সোজা করতে হয়, আবার বিশেষ ধরনের বাঁকা যন্ত্র ব্যবহার করে আঙুল না ঘুরিয়েও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়া যায়। তবে বৈজ্ঞানিকদের ধারণা, মৃত্যুর ঠিক কতক্ষণ পর এই বৈদ্যুতিক সিগন্যাল পুরোপুরি থেমে যায়, তা স্পষ্টভাবে বলা যায় না। এমন গবেষণা চালাতে হলে অনেক মৃতদেহ নিয়ে, প্রতি ঘণ্টায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যান করতে হবে যা বাস্তবে করা খুব কঠিন।
তবে মৃতদেহ পচে গেলে, শুকিয়ে গেলে বা পানিতে ভিজে গেলে কাজটা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও, পুরোপুরি অসম্ভব নয়। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মৃতের হাত বা আঙুল বিচ্ছিন্ন করে পরীক্ষাগারে পাঠান, যেখানে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। যদি ত্বক খুব বেশি নষ্ট হয়ে যায়, তবে সিলিকন পুঁটিতে ছাপ নিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্টের বিস্তারিত নমুনা পাওয়া যায়, যেগুলো ছবি তুলে বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
এই কাজে বিজ্ঞানীরা এখন অনেকটাই দক্ষতা অর্জন করেছেন। ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, “থানাটোপ্র্যাকটিক প্রসেসিং” নামে একটি কৌশলের মাধ্যমে মৃতদেহের অন্য অংশ থেকে তরল বের করে আঙুলে প্রবেশ করিয়ে ফোলানো হয়, যাতে ছাপ তোলার মতো আঙুল উপযুক্ত হয়। এতে ৪০০টি মৃতদেহের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ফেডারেল আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেমে জমা দেয়ার মতো ছাপ পাওয়া গিয়েছে।
আরও ১১ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্তত সন্দেহভাজনদের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার মতো ছাপ পাওয়া গেছে। তবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট কতদিন পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য থাকে, সে বিষয়ে এখনো বেশি গবেষণা হয়নি। ২০১৬ সালে IEEE Xplore-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উষ্ণ আবহাওয়ায় মৃত্যুর চার দিন পর পর্যন্ত এবং শীতকালে প্রায় ৫০ দিন পর্যন্ত মৃতদেহ থেকে ব্যবহারযোগ্য বায়োমেট্রিক তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
লেখকঃ ইমাম হোসাইন আনজির
সূত্রঃ CNN, HowStuffWorks

