ছোট্ট শিশুর গালে বা কপালে কালো কাজলের ছোট্ট একটা ফোঁটা। বাংলাদেশ-ভারতের লক্ষ লক্ষ ঘরে এই দৃশ্য সাধারণ ব্যাপার। বর্তমান প্রজন্মের দাদু-দাদি, নানু-নানার আমল থেকেই চলে আসছে এই রীতি। এখনো অনেকে যদি নিজের শৈশবের ছবি দেখে অনেকে ছবিতে নিজের কপালের উপর সেই কালো টিপ দেখতে পায়। উদ্দেশ্য একটাই । ছোট্ট শিশুর ওপর যাতে মানুষের নজর না খারাপ দৃষ্টি না পড়ে। এটার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও , এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে বহুল প্রচলিত শিশুর কপালে কালো টিপ দেওয়ার প্রথা।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর তথ্য। বাজারের অনেক কাজলে পাওয়া গেছে বিপদজ্জনক মাত্রার ভারী ধাতুর উপস্থিতি। এগুলো সহজেই শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
শিশুদের জন্য কাজল কেন বিপদজ্জনক হয়ে উঠলো?
শিশুদের ত্বক বড়দের ত্বকের চেয়ে অনেক বেশি কোমল। সহজেই যেকোনো রাসায়নিক উপাদান শুষে নিতে পারে। তাই এই স্পর্শকাতর সময়ে যদি কোনো ক্ষতিকর জিনিস নবজাতকের শরীরে ঢোকে, তার ফলটা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে অথবা সম্পূর্ণভাবে সেরে নাও উঠতে পারে । ভারতীয় উপমহাদেশে লাখ লাখ শিশুর কপালে প্রতিদিন এই কাজল দেওয়া হচ্ছে। অনেক নবজাতকের বাবা – মা ,অথবা দাদা – দাদি এ বিষয়ে এখনো অবগত না। তাদের বাজারের এই নতুন কাজলের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা এখন অত্যাবশ্যকীয়।
গবেষণাগুলো কী বলছে?
বিভিন্ন বিশ্বস্ত বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত একের পর এক গবেষণা বেশ ভয় ধরানোর মতো তথ্য দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বাজারে সহজে পাওয়া যায়, এমনকি যেগুলো প্রাকৃতিক, আয়ুর্বেদিক বা পুরনো নিয়মে তৈরি বলে দাবি করা হয়, সেইসব কাজল বা সুরমার নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছেন।
ফলাফল? উদ্বেগের মাত্রা অনেক বেশি। প্রায় সব গবেষণাতেই সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম সীসা(লেড)। ২০২২ সালে ‘সায়েন্স অফ দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট’-এ ছাপা ভারতের বাজারের নমুনা নিয়ে করা এক গবেষণার কথা ধরা যাক। গবেষণাটিতে দেখা যায়, অনেক কাজল পণ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বা আমেরিকার FDA-র বেঁধে দেওয়া নিরাপদ মাত্রার চেয়েও শত শত, এমনকি হাজার গুণ বেশি সীসা থাকতে পারে। বিষয়টা নিয়ে গবেষকরা স্পষ্টই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। টক্সিকোলজিস্ট ড. অনিতা গুপ্তা বলেছেন, “আমাদের গবেষণাটা রীতিমতো ভয়াবহ। শিশুদের জন্য তৈরি বলা কিছু কাজলে সীসার পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে বেশি। এটা শিশুদের ব্রেন ডেভেলপমেন্টের জন্য মারাত্মক হুমকি।”
সীসা কেন এত বিপদজ্জনক?
সীসা হলো এক ধরণের নিউরোটক্সিন। সহজ বাংলায়, মস্তিষ্কের জন্য বিষ। বিশেষজ্ঞদের মতে , বাড়ন্ত শিশুর মস্তিষ্কের জন্য সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা বলতে আসলে কিছু নেই। এই ধাতুটা শিশুর বুদ্ধিমত্তা (IQ) কমিয়ে দিতে পারে, স্থায়ীভাবে। পড়াশোনা শেখার ক্ষমতায় বাধা দিতে পারে। আচরণে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় সিসা ছাড়াও আরও কিছু বিপজ্জনক ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আছে আর্সেনিক (যা ক্যানসারের কারণ হতে পারে), ক্যাডমিয়াম (যা কিডনি আর হাড়ের বড় ক্ষতি করে), অ্যান্টিমনি (যা হার্ট আর ফুসফুসের সমস্যার সঙ্গে জড়িত), পারদ বা মার্কারি (যা স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে), আর নিকেল (যা ত্বকে মারাত্মক অ্যালার্জি, ফুসকুড়ি আর চুলকানি তৈরি করে)। কিছু গবেষণায় কাজলের নমুনায় ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াও (যেমন সিউডোমোনাস এরুজিনোসা, স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস) পাওয়া গেছে। এগুলো চোখে মারাত্মক ইনফেকশন (যেমন কনজাংটিভাইটিস বা চোখের মণিতে ঘা) বা ত্বকের ইনফেকশনের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
শিশুকে নজর লাগা থেকে বাঁচানো বা তার সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য গালে কাজল দেওয়ার প্রথা রীতিমতো বাঙালির সংস্কৃতির একটা অংশ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটাও এখন প্রায় স্পষ্ট, একাধিক বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা যা বলছে, তা হালকাভাবে নেওয়ার মতো নয়। বাজারে যেসব কাজল সহজলভ্য, তার একটা বড় অংশ শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে তাদের সেই মূল্যবান মস্তিষ্ক, যেটা ভবিষ্যতের ভিত্তি, তার বিকাশে বাধা দিতে পারে এসব কাজল। একটা জিনিস খুব পরিষ্কার: সীসার জন্য নিরাপদ মাত্রা বলে বিশেষ কিছু শিশুর শরীরের জন্য নেই। তাদের শরীর এতটাই কোমল, এতটাই সংবেদনশীল যে অল্পতেই ক্ষতি হতে পারে।
M.I. Tawhid

