মহাকাশের বিশালতা আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বড়। এতটাই বড় যে, মাঝে মাঝে আমাদের নিজেদেরকেই ক্ষুদ্র মনে হয়। আর এই বিশাল মহাশূন্যে মানুষ প্রথম যে যন্ত্রটি পাঠিয়েছিল দূর আকাশে, সেটি এখন এক নতুন মাইলফলকের দ্বারপ্রান্তে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে, প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে চলতে থাকা ভয়েজার ১ নামের একটি মহাকাশযান প্রথমবারের মতো পৃথিবী থেকে এক লাইট-ডে দূরে পৌঁছাবে। লাইট-ডে বলতে বোঝায়, আলো এক দিনে যতদূর যেতে পারে, সেই দূরত্ব। আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার গতিতে চলে, ফলে এক দিনে এটি পাড়ি দেয় প্রায় ২৫.৯ বিলিয়ন কিলোমিটার। আর ভয়েজার ১ সেই দূরত্বই অতিক্রম করতে যাচ্ছে।

ভয়েজার ১-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। এটি নাসা কর্তৃক মহাকাশে পাঠানো হয় মূলত বৃহস্পতি এবং শনি গ্রহের ছবি ও তথ্য সংগ্রহের জন্য। কিন্তু এর পর এই যান থেমে থাকেনি। গ্রহের গণ্ডি পেরিয়ে, সূর্যের প্রভাব বলয়ের বাইরেও এটি চলে যায়। আজ এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬৬ অ্যাস্ট্রোনমিকাল ইউনিট (AU) দূরে অবস্থান করছে। একটি AU মানে হলো পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানের গড় দূরত্ব, অর্থাৎ প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার। সেই হিসাবে, ভয়েজার ১ এখন পৃথিবী থেকে ২৫ বিলিয়নেরও বেশি কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। আর এই দূরত্বেই পৌঁছাতে তার রেডিও সিগন্যাল এখন সময় নেয় ২৩ ঘণ্টারও বেশি।

বর্তমানে ভয়েজার ১ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬১,১৯৫ কিলোমিটার গতিতে এগিয়ে চলেছে। আপনি ভাবতেই পারেন, এই গতিতে তো অনেক দ্রুতই যাবে। কিন্তু মহাকাশের ক্ষেত্রে এ গতি তুলনামূলকভাবে অনেক ধীর। কারণ আলো এই একই দূরত্বে পৌঁছায় মাত্র ৮ মিনিটে, আর সেখানে ভয়েজার ১-এর লেগেছে প্রায় ৫০ বছর। আমরা যখন মহাকাশের কথা বলি, তখন সময় আর দূরত্ব দুটোই এক এক নতুন মাত্রা পায়। ভয়েজার ১ সেই বিস্তীর্ণ সময়-দূরত্বের এক জীবন্ত সাক্ষ্য।

২০২৬ সালের ১৫ নভেম্বর, পৃথিবী থেকে ভয়েজার ১-এর দূরত্ব হবে এতটাই যে, তার সংকেত পৃথিবীতে পৌঁছাতে ঠিক ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। এটিই হবে সেই প্রথম দিন, যেদিন কোনো মানব-নির্মিত বস্তু “এক লাইট-ডে” দূরত্বে পৌঁছাবে। আর সূর্য থেকে সেই একই দূরত্বে পৌঁছাবে ২০২৭ সালের ২৮ জানুয়ারি। তবে এই অর্জন শুধু একটি সংখ্যা বা গাণিতিক হিসাব নয়—এটি মানব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

ভয়েজার ১ শুধু একটি মহাকাশযান নয়, এটি বহন করছে মানব সভ্যতার বার্তাও। এর মধ্যে একটি সোনালী ডিস্ক রাখা হয়েছে যেটিকে বলা হয় Golden Record। এতে পৃথিবীর নানা ভাষায় অভিবাদন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, প্রকৃতির নানা শব্দ এবং মানুষের জীবনযাত্রার নানা ছবি সংরক্ষিত আছে। এই ডিস্ক বানানো হয়েছিল এই ভেবে, যদি ভবিষ্যতে কোনো বহির্জাগতিক প্রাণী বা সভ্যতা এর সন্ধান পায়, তারা যেন বুঝতে পারে আমাদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি এবং কল্পনার পরিধি।

২০১২ সালে ভয়েজার ১ সূর্যের প্রভাব বলয়—হেলিওস্ফিয়ার পেরিয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক অঞ্চলে প্রবেশ করে। এটি ছিল মানব ইতিহাসে প্রথম যন্ত্র যা এই সীমার বাইরে পা রাখে। তবে এখনো এটি সৌরজগত পুরোপুরি ছাড়িয়ে যায়নি। সৌরজগতের এক প্রান্ত, অর্থাৎ ওর্ট ক্লাউড (Oort Cloud), যা সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ বলের শেষ সীমা, সেখানে পৌঁছাতে আরও হাজার হাজার বছর লাগবে। এমনকি বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সৌরজগতের আসল প্রান্ত হতে পারে প্রোক্সিমা সেঞ্চুরি নামক নিকটতম নক্ষত্রের মাঝপথে যা প্রায় ২ আলোকবর্ষ দূরে। আর সেখানে পৌঁছাতে ভয়েজার ১-এর লাগবে প্রায় ৪০,০০০ বছর!

আমাদের অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, ভয়েজার ১ এখনো কি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে? উত্তর হলো, হ্যাঁ। যদিও সেটি পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, তারপরও এটি মাঝে মাঝে সংকেত পাঠায়। তবে এর শক্তি উৎস সীমিত। ভয়েজার ১ একটি রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর (RTG) ব্যবহার করে যা প্লুটোনিয়াম থেকে তাপ উৎপন্ন করে। এটি সময়ের সাথে সাথে শক্তি হারাচ্ছে, ফলে ২০২৫ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে এর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। আশা করা হচ্ছে, ২০৩০ এর আগেই এটি পুরোপুরি চুপ হয়ে যাবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত এটি থাকবে আমাদের মহাকাশের নিঃশব্দ পর্যবেক্ষক।

এই পুরো ঘটনাটি থেকে আমরা বুঝতে পারি, মহাকাশ কেবল বিজ্ঞানের একটি শাখা নয় বরং এটি আমাদের কল্পনা, সাহস এবং সংকল্পের প্রতীক। একটি ছোট্ট মহাকাশযান, যা একটি মানুষের চেয়েও ছোট, পঞ্চাশ বছর ধরে একা-একা চলেছে, পৃথিবীর সঙ্গে ক্রমশ দুরত্ব বাড়াচ্ছে যা আমাদের সভ্যতার অসাধারণ এক প্রতীক। এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে না কোনো হাই-স্পিড ট্রেন, কোনো বুলেট, এমনকি কোনো যুদ্ধবিমানও। কারণ এটি পৌঁছেছে সেখানে, যেখানে কেউ কোনোদিন পা রাখেনি।

যারা মহাকাশকে ভালোবাসেন, তারা জানেন যে সময় ও দূরত্ব এখানে এক অন্যরকম অনুভব তৈরি করে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এক ঘণ্টার যাত্রা অনেক বড় ব্যাপার মনে হতে পারে। কিন্তু ভয়েজার ১ যখন ২৪ ঘণ্টা সময় নিচ্ছে তার সংকেত পাঠাতে, তখন বুঝতে পারা যায়, আসলে আমাদের সূর্যপৃথিবী কতটা ক্ষুদ্র এক বিন্দু।

সাম্প্রতিক কিছু মহাকাশযান যেমন পার্কার সোলার প্রোব সূর্যের খুব কাছে গিয়ে দ্রুত গতি অর্জন করেছে, কিন্তু তা এখনো ভয়েজার ১-এর মত দূরত্ব পাড়ি দেয়নি। ভয়েজার ১ ধীরগতিতে হলেও প্রতিনিয়ত ইতিহাস তৈরি করছে।

সবশেষে বলতেই হয়, নভেম্বরে ২০২৬ সাল যখন আসবে, তখন আমাদের একটি ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ থাকবে। একটি যন্ত্র, যেটি আমরা পাঠিয়েছিলাম গ্রহ পর্যবেক্ষণে, সেটি একদিনে আলো যতদূর যেতে পারে, সেই দূরত্বে পৌঁছে যাবে। এটি শুধু বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব নয়, এটি একটি সময়ের দলিল, একটি বার্তা যে মানুষ তার সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : IFL Science

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Most Voted
Newest Oldest
Inline Feedbacks
View all comments